kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

বাঙালির রাজনৈতিক বাতিঘর

আলী হাবিব   

২৩ জুন, ২০২১ ০৪:৩১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাঙালির রাজনৈতিক বাতিঘর

সেই রাজনৈতিক দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, যে দলটি একটি জাতির অগ্রযাত্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে একই সমান্তরালে পথ হেঁটেছে। নেতৃত্ব দিয়েছে সব আন্দোলন-সংগ্রামে। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন, বাঙালিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে দলটি। সংগঠিত করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কঠিন লড়াইয়েও বাঙালির ঐক্য ধরে রাখার কাজটি করেছে এই দল। অর্জন করেছে জনমানুষের আস্থা।

প্রতিষ্ঠানতুল্য দলটির জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। সে হিসাবে আজ ৭২ বছর পূর্ণ করে ৭৩তম বর্ষে পা দিচ্ছে দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যে রাজনৈতিক দলের বয়স ৭২ পূর্ণ হয়েছে, সে দলটি তো সব দিক থেকেই প্রতিষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বারবার প্রতিষ্ঠানের কথাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “...কোথায়ও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেন বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।...সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।...আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে।” (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, পৃষ্ঠা ১২১ ও ১২২)। বাঙালির নিজস্ব রাজনৈতিক তথা পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবেই আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা পায়।

 ‘...সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে...।’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুর এই কথাগুলোই বলে দেয় শুরু থেকেই দলটি অসাম্প্রদায়িক। জন্মলগ্নেই সংস্কারে বিশ্বাসী। অভিধান মতে, সংস্কার হচ্ছে উৎকর্ষ সাধন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আজ শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে দলটি পরিশীলিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছে আধুনিক।

শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রতিষ্ঠা পেলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চের সিনিয়র ফেলো শ্যামলী ঘোষ লিখেছেন, “১৯৫৫ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের জন্য দলের সদস্য পদ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথম বিষয়টি উত্থাপিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভাসানী কর্তৃক জনমত যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে।...যুক্ত নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের যে দাবি ছিল তারই অনুসরণে দলের ধর্মনিরপেক্ষতাকরণে বিষয়টি ছিল একটি পদক্ষেপ।” (‘আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১’ : শ্যামলী ঘোষ, পৃষ্ঠা ২২)। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীকালে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে রূপান্তর করা হয়। তখন এটি নিঃসন্দেহে ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের নতুন যাত্রা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক উত্তরণ। 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি হচ্ছে—‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি।’ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে—১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সমুন্নত রাখা। ২. প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা। ৩. রাষ্ট্রের সব নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা। ৪. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ৫. বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে তুলে ধরা। 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সত্তরের নির্বাচনের পর এ দেশের মানুষ একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন বছর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে শিখেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাঁর রাষ্ট্রভাবনায় পরিবর্তন ঘটান এবং শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে মিলিয়ে একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করেন। নাম দেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। তার রাজনৈতিক চরিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি ও লক্ষ্যও পাল্টে যায়। এবার তার কর্মসূচি ছিল শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ পৌঁছতে পারলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি শক্তিশালী সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটত বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। সময়ের প্রয়োজনে এটিও এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল হিসেবে। আর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি মডার্ন ও সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক পার্টি। যেকোনো সংকটে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আছে এবং নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় নতুন নেতা তৈরির সক্ষমতা আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর চরম নেতৃত্বহীন অবস্থায়ও দলটি নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। হাসিনা-নেতৃত্ব উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে যখনই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে, তখনই বাংলাদেশের মানুষ লাভবান হয়েছে। গত ১২ বছরে অভূতপূর্ব আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে একটি উন্নয়নের রোল মডেল।

২০২১ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েছেন। দিয়েছেন শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখন উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য পূরণের পথে পা রেখেছে।

বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। সেই অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই। দুটি কারণও তুলে ধরা যেতে পারে। একটি অর্থনৈতিক, অন্যটি রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ১০টি মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো তৈরি হলে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি আয় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অতীতে এমন উন্নয়ন সাফল্য কোনো সরকার দেখাতে পারেনি।

রাজনৈতিক কারণটি হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশে বাম ধারার রাজনীতি গণমুখী কর্মসূচি নিয়ে সাধারণের কাছে যেতে পারেনি। তাদের তত্ত্বনির্ভর রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক তত্ত্ব মানুষকে আকৃষ্ট করেছে বলে মনে হয় না। পাকিস্তানি মতাদর্শে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তত্ত্ব নিয়ে এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা বিএনপি শেষ পর্যন্ত হাত মিলিয়েছে যুদ্ধাপরাধী শক্তির সঙ্গে। ধর্মাশ্রয়ী, সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থীদের পৃষ্ঠপোষক হতে গিয়ে দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালির রাজনৈতিক বাতিঘর। বাতিঘর বা লাইটহাউস বিশেষ ব্যবস্থায় আলো ফেলে সমুদ্রের জাহাজের নাবিককে দিকনির্দেশনা দেয়। সমুদ্রের অগভীর অঞ্চল সম্পর্কে নাবিককে সচেতন করে। বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথে ইতিবাচক আলো ফেলেছে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি। পথের বাধা সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করেছে। পাশে থেকেছে। আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়তে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক আদর্শে প্রাণিত গণমুখী ইতিবাচক রাজনীতি আজ একান্তই অনিবার্য।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার
[email protected]



সাতদিনের সেরা