kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

করোনা নিয়ে অনুসন্ধান : টিআইবির পুরস্কার পেলেন তিন সাংবাদিক

অনলাইন ডেস্ক   

২২ জুন, ২০২১ ১৭:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা নিয়ে অনুসন্ধান : টিআইবির পুরস্কার পেলেন তিন সাংবাদিক

করোনা নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য তিন ক্যাটাগরিতে দেশের তিন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. মো ইফতেখারুজ্জামান তাদের নাম ঘোষণা করেন।

মঙ্গলবার (২২ জুন) ‘করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ এক শীর্ষক আলোচনা এবং ‘কভিড-১৯ বিষয়ক বিশেষ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০২০ ঘোষণা’ উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন অনুষ্ঠানে পুরস্কারের নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করা হয়।

এ সময় আলোচনায় অংশ নিয়ে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন বলেছেন, সাংবাদিকতায় সব সময়ই চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংবাদিক সংগঠনগুলো সাংবাদিকের জন্য কী করছে? বিভিন্ন ব্যাপারে দোষারোপ করে সাংবাদিকতার সংকট দূর করা যাবে না। এ ব্যাপারে একাডেমিক আলোচনা প্রয়োজন।

এমআইডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, সাংবাদিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। যে প্রতিবেদনে কাঠামোগত দুর্বলতা আছে, সেখানেই প্রশ্ন করা হয়। তাই অনুসন্ধান যদি কাঠামোগতভাবে সঠিক হয়, তাহলে সাংবাদিক ও সম্পাদকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

একাত্তর টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ বলেন, মানুষের গল্প তুলে আনতে পারলে সেটাই সংবাদমাধ্যমকে এগিয়ে নিতে পারে। তবে সাংবাদিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকের সুরক্ষা এবং সম্পাদকের এখতিয়ার আইন ও বিধি দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে।

এশিয়ান টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান মানস ঘোষ সাংবাদিকের সুরক্ষায় আইনি বিধানের গুরুত্বারোপ করে বলেন, গণমাধ্যমকর্মী আইন মন্দের ভালো। তার পরও আরো অনেক কিছু দরকার আছে।

গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, আমরা যতই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা কিংবা ঐক্যের কথা বলি, নানা প্রতিবন্ধকতা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে রেখেছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে যারা কাজ করি, তাদের সমস্যা আরো প্রকট।

সাংবাদিকতায় প্রশাসনের মধ্যম বা উচ্চ স্তরের কর্মকর্তাসহ নানা জায়গা থেকে বিভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে মন্তব্য করে ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু বলেন, ক্লাব বা ইউনিয়ন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে আমাদের যেমন রাজপথে থাকা দরকার, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরেও থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বিভিন্ন চাপ মাথায় নিয়ে পাঠক-দর্শকের প্রত্যাশা পূরণে যা করা দরকার তার সবটা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি।

জিআইজিএনের বাংলা বিভাগের সম্পাদক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুর্নীতির পরিধি যেমন বৈশ্বিক হয়েছে, সাংবাদিকতার পরিসরও তেমন বৃদ্ধি পাওয়া দরকার।

আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ফল ঘোষণা ও সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জই বিদ্যমান। সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা সাংবাদিকতাকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমাদের জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে গণমাধ্যম কিভাবে শুদ্ধাচার বজায় রেখে কাজ করবে, তার কিছু দিকনির্দেশনা আছে। যদিও সেটি পর্যাপ্ত নয়, তবু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একক ও সামষ্টিকভাবে নৈতিকতার চর্চা করলে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। আর বহিরাগত চাপের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের ওপর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল বিষয় হলো ‘জিরো সাম গেম’- অর্থাৎ ‘জিততেই হবে বা ক্ষমতায় থাকতেই হবে’! এ জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে, তাঁকে ধরাশায়ী করতে হবে। আর এই কাজটা যখন সাফল্যের সঙ্গে বা তুলনামূলক সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয় তখন বাকি থাকে নাগরিক সমাজের একাংশ এবং গণমাধ্যমে যারা কথা বলে, যারা লেখে, যারা সরকারের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে চায়। সহায়ক ভূমিকা পালনের এই প্রয়াসকে সরকারের একাংশ শত্রু হিসেবে দেখে।

কোনো ধরনের সমালোচনা সইবার সৎসাহস বা দৃঢ়তার ঘাটতি থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি হয় মন্তব্য করে ড. জামান আরো বলেন, বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাংবিধানিক অধিকার ও দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। একদিক থেকে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে অনেক সাংবাদিক বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যাওয়ার চিন্তা করেন বা চলে যান। দ্বিতীয়ত, এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যাতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা সরকারের দোসর হয়ে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেটির প্রভাব হয় নেতিবাচক। তৃতীয়ত, এই প্রতিকূলতার মধ্যেও এক শ্রেণির সাংবাদিক থাকেন, যারা সততার সঙ্গে, দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে থাকতে চেষ্টা করেন। আর সে কারণেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখনো টিকে আছে। কিন্তু তাদেরকেও এক ধরনের সেলফ সেন্সরশিপের মধ্য দিয়েই টিকে থাকতে হয়। আমি মনে করি, সাংবাদিকতার আজকের পথচলার এটাই সার্বিক চিত্র; কভিড প্রেক্ষাপটে যা আরো বেশি প্রকটতর হয়েছে।

টিআইবির কভিড-১৯ বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০২০ ঘোষণাকালে জানানো হয়। এ বছর নিয়মিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারের বাইরে পৃথকভাবে কভিড-১৯ বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রকাশিত বা প্রচারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য টেলিভিশন এবং জাতীয় ও স্থানীয় প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়া- এই তিনটি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনটি বিভাগে বিজয়ী সাংবাদিকদের প্রত্যেককে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হবে।

প্রিন্ট মিডিয়া আঞ্চলিক ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার বিজয়ী হয়েছেন চট্টগ্রামের দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার আবু রায়হান তানিন। ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিন পত্রিকায় চট্টগ্রামে ‘করোনা রোগী আইসিইউ পায় না, ১২ হাসপাতালের গল্প পুরোটাই ফাঁকি!’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য তিনি এই পুরস্কার অর্জন করেন। সাংবাদিক আবু রায়হান তানিন তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে দেখান যে চট্টগ্রামের ১২টি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ বেড ব্যবহারের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ঘটা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তার পুরোটাই ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি! তার এই প্রতিবেদনে প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি সরেজমিনে অনুসন্ধান করে তিনি দেখান যে এই ১২টি হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা যেমন এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, আবার তাদের অনেকে এমনকি জানতেনও না যে কী করতে হবে! ফলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও অনেক রোগী এই ১২ হাসপাতালের কয়েকটি ঘুরেও আইসিউ সাপোর্ট না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া (জাতীয়) বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন সাংবাদিক সৈকত ভৌমিক। তিনি বর্তমানে অনলাইন পত্রিকা সারাবাংলা ডট নেট-এর সিনিয়র করেসপন্ডেট হিসেবে কর্মরত আছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও সহযোগিতায় জেকেজি হেলথকেয়ারের করোনার ভুয়া পরীক্ষা ও রিপোর্টের মাধ্যমে প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্যসংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য তিনি প্রিন্ট মিডিয়া (জাতীয়) বিভাগে এই পুরস্কারটি অর্জন করেন। সৈকত ভৌমিকের পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন- ‘করোনা পরীক্ষা নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রতারণার জাল’, ‘অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে কাজ করাত জেকেজি হেলথ কেয়ার’, ‘সরকারি খরচে বেসরকারি প্রতারণা জেকেজি হেলথ কেয়ারের’, ‘চিকিৎসকরা পেত না পিপিই, জেকেজির জন্য আনলিমিটেড’, এবং ‘সরকারি চাকরি করেও ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান’ শিরোনামে দৈনিক সারাবাংলা ডট নেট পত্রিকায় যথাক্রমে ১৬, ২৩, ২৪ ও ২৫ জুন ২০২০ তারিখে প্রকাশিত হয়।

ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন সাংবাদিক মুফতী পারভেজ নাদির রেজা। তিনি বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০২০ সালের ০৪ অক্টোবর ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজারে বিষাক্ত মিথানল’ শিরোনামে একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনের জন্য তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগে এই পুরস্কার অর্জন করেছেন। করোনা থেকে সুরক্ষায় ব্যবহৃত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে অনুমোদিত মাত্রায় আইসো প্রোপাইল অ্যালকোহল ও ইথানল ব্যবহারের বদলে সুপরিচিত এসিআই কম্পানির প্রস্তুতকৃত স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বাজারে প্রাপ্ত আরো অনেকগুলো ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ড হ্যান্ড স্যানিটাইজারে অননুমোদিত বিষাক্ত মিথানল মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে পারভেজ নাদির রেজার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। উল্লেখ্য, পারভেজ নাদির রেজা ২০১৭ সালে ‘অস্ত্রের হোম ডেলিভারি’ শিরোনামে প্রচারিত তার একটি প্রতিবেদনের জন্য টিআইবির নিয়মিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।



সাতদিনের সেরা