kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

কালো টাকা বৈধ করা

‘বিশেষ সুবিধা না থাকলে অর্থপাচার বাড়বে’

ফারজানা লাবনী   

২২ জুন, ২০২১ ০৩:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘বিশেষ সুবিধা না থাকলে অর্থপাচার বাড়বে’

অর্থপাচার ঠেকাতে সরকার চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। এতে গত ৪৯ বছরে যে পরিমাণ টাকা বৈধ বা সাদা হয়েছে, গত ১০ মাসেই তার অর্ধেক হয়েছে। কিন্তু আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেটে সে সুবিধা রাখা হয়নি। কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধা আগামী অর্থবছরে রাখা না হলে অর্থপাচার আরো বাড়ার আশঙ্কা থাকছে বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

তাঁরা বলছেন, করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে দেশের টাকা দেশে রাখা জরুরি। কারণ কালো টাকা সাদা করার সহজ সুযোগ না থাকলে অর্থপাচারের আশঙ্কা থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিতর্ক এড়িয়ে কালো টাকা বৈধ করার বিশেষ সুবিধা আবারও রাখা যায় কি না তা পর্যবেক্ষণ করছেন। অর্থ বিলে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও প্রজ্ঞাপন (এসআরও) জারি করে এই সুবিধা দেওয়া সম্ভব কি না তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) যাচাই করে দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বাধীনতার পর থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৬ বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি কালো টাকা বৈধ হয়েছে। প্রতিবারই কোনো না কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যিনি টাকা সাদা করেছেন তাঁকে এসব অর্থের উৎস সম্পর্কে জেরা করার বা তদন্ত করে শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়। আইনি প্যাঁচে আটকে যাওয়ার ভয়ে গত অর্থবছর পর্যন্ত কালো টাকা সাদা করতে খুব একটা উৎসাহ দেখা যায়নি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী অতীতের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ১০ শতাংশ কর ধার্য করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের পর এসব অর্থ কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হবে না—এমন অঙ্গীকার করায় অনেকে কালো টাকা সাদা করতে এগিয়ে আসে। গত ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ১১ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের আগ পর্যন্ত বৈধ হওয়া মোট অর্থের অর্ধেক।

বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশে একটি স্থায়ী ধারা (১৯ ধারা) রয়েছে, যেকোনো সময়ে নির্ধারিত করের পাশাপাশি জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা হবে। এ ধারা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে। করের পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ধার্য হয়। ওই ধারা অনুযায়ী সাদা করার পর এসব অর্থ কোথা থেকে আয় করা হয়েছে তা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে।

গত বছরের মার্চ থেকে দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। মহামারির প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রায় সব খাতেই মন্দা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘করোনাকালীন সংকট থেকে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিনা বাধায় কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সহজ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করা বা বিনিয়োগের সহজ সুযোগ রাখা হয়নি। অন্যদিকে অর্থপাচার রোধেও কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর আগে অর্থপাচার রোধে বিভিন্ন বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। অর্থপাচার রোধে বন্দরে স্ক্যানিং যন্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, এনবিআরের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল শক্তিশালীকরণ, বিদেশে রাজস্ব দপ্তর স্থাপনসহ কোনোটিই গতকাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার চাপে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর এ বিশেষ সুযোগ না রাখলেও দেশের ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ অব্যাহত রাখতে জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

করোনাকালীন মহাসংকট কাটিয়ে উঠতে কালো টাকা সাদা করার চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেওয়া বিশেষ সুযোগ আগামী অর্থবছরেও বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি বাজেটের বিশেষ সুযোগে আস্থা রেখেই কালো টাকা সাদা হয়েছে বেশি।’

আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি শামসুল আলামিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি বাজেটে করোনায় বিপর্যস্ত আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় কিছুটা সুবাতাস দেখা দিতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আগামীবার এ সুবিধা রাখা না হলে আবাসনসহ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল ১০০-এর বেশি শিল্প খাত বিপাকে পড়বে।’

এই বিষয়ে এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বা অর্থবিলে কালো টাকা সাদা করার চলতি বাজেটের বিশেষ সুযোগের বিষয়টি উল্লেখ নেই। অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী ধরে নিতে হবে আগামী ১ জুলাই থেকে এ সুযোগ আর থাকছে না। চলতিবারের বিশেষ সুযোগ নিয়ে এ যাবৎকালের মধ্যে এত অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা সাদা করা হয়েছে।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ কম। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার সহজ সুযোগ দেওয়ায় অনেকে দেশের টাকা দেশে রেখেছে, যা করোনায় গতি হারানো দেশের অর্থনীতি সচল করতে অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতেও এ বিধান রাখা প্রয়োজন। দেশে টাকা রাখার সুযোগ না থাকলে অর্থ পাচার হয়ে যাবে।’



সাতদিনের সেরা