kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

বীরাঙ্গনার ঠিকানা শেখ হাসিনার ঘরে

বাহরাম খান, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে   

২১ জুন, ২০২১ ০২:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বীরাঙ্গনার ঠিকানা শেখ হাসিনার ঘরে

নিজের ঘরে ওঠার পর বীরাঙ্গনা শিলা গুহর মুখে রাজ্যজয়ের হাসি।

শিশু বয়স থেকেই যাত্রাদলের অভিনেত্রী ছিলেন বীরাঙ্গনা শিলা গুহ। জন্ম ১৯৫১ সালে। ১০ বছর বয়সে যুক্ত হন যাত্রাদলে। অভিনয়ের মাধ্যমে সুখ আর দুঃখের আবেগে ভাসাতেন মানুষকে। কিন্তু জীবনের ২০টি বছর পাড়ি না দিতেই নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। মুক্তিযুদ্ধের বছরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক নির্যাতন তাঁর জীবনের সব আনন্দ-আলো চিরতরে নিভিয়ে দেয়। এমন এক দুঃখের পাথর বুকে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, যা কাউকে বলতেও পারতেন না। পরিবারকে বলেছিলেন; কিন্তু জন্মদাতা বাবাও তাঁকে গ্রহণ করেননি। ঘর থেকে বিদায় করে দিয়ে বাবা বলেছিলেন, তুমি বাড়িতে থাকলে তোমার আর দুই বোনের বিয়ে হবে না।

ভাগ্যের অচেনা সুতায় ঘুরে ঘুরে শিলা গুহ আজ শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা। ৭০ বছর বয়সে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে একটি পাকা ঘর পেয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এত নির্যাতিত, নিপীড়িত হলাম। পরিবার গ্রহণ করেনি। বীরাঙ্গনা জানার পর স্বামীর ঘরে জায়গা হয়নি। এর পরও এই দেশে আমার পায়ের নিচে মাটি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত হয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তখন শেখ মুজিবের সরকার আমাকে খাইয়েছে। এইবার তাঁর মেয়ে আমাকে ঘর দিয়েছেন। এটাই আমার আনন্দ। নিজেদের দেশে, নিজের জমি ও ঘরের মধ্যে এখন মরতে পারব। জীবনে অনেক কিছু থেকেই তো বঞ্চিত হলাম। শেষ সময়ে এসে নিজের ঠিকানা পাওয়াটা অনেক বড় তৃপ্তির।’

সরকারপ্রধানের সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে গতকাল রবিবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারা দেশে ৫৩ হাজার ৩৪০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমির মালিকানাসহ ঘর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মাজডিহি গ্রাম থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন শিলা গুহ। শিলা গুহ তাঁর নতুন ঘরে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সবজি ‘সাতকড়া’ দিয়ে তরকারি রান্না করে খাওয়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দাওয়াত দেন। জবাবে সম্ভব হলে শিলা গুহের বাড়িতে যাবেন বলে আশ্বাস দেন সরকারপ্রধান।

মাজডিহি গ্রামে নতুন ঘর পাওয়া ব্যক্তিদের আরেকজন শতবর্ষী আবরু মিয়া। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি ঘর পাওয়ার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব আল্লাহ দিছে। শেখের বেটির কারণে ঘর পেয়েছি। এখন মরেও শান্তি পাব।’ পাশেই বসে ছিলেন আরেক উপকারভোগী রিকশাচালক ও কৃষি শ্রমিক বাবুল মিয়া। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইউএনও আর এসি ল্যান্ড হঠাৎ করেই আরো কয়েকটা বাড়ি দেখতে গিয়ে আমার ঘরটাও দেখেন। উনারা দেখতে পান যে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। তখন আমার নামেও একটা ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন। এইভাবে ঘর পাব জীবনেও ভাবিনি।’

সুমতি রানী সরকারের স্বামী মারা গেছেন ২০ বছর আগে। দুই মেয়ে নিয়ে অথই সাগরে পড়া এই বিধবার জীবন তখন দুর্গতিতে ভরা। মাথায় ঝাঁপি নিয়ে গ্রামে গ্রামে পণ্য ফেরি করা শুরু করেন। ভাঙ্গারির দোকানে কিছুদিন চাকরিও করেছেন। স্বামীর রেখে যাওয়া ১৫ হাজার টাকা ঋণ শোধ করেন নিজে আয় করে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে এখন থাকেন ভাতিজার বাড়িতে। নিজের ঘর নেই, ফেরি করার শক্তি-সামর্থ্যও নেই। ভাইপো তাঁর উপার্জন অনুযায়ী ভালোই রেখেছেন। কিন্তু নিজের ঘর-জমি না থাকার আক্ষেপ বুকে বড় বাজত। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ঘর পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুমতি বলেন, ‘নিজের ঘর তো নিজেরই। যার নেই সে বোঝে। ঠিকানা না থাকার যে কী কষ্ট আর বঞ্চনা, যার আছে সে বুঝবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এই উদ্যোগে এ পর্যন্ত চার লাখ ৪২ হাজার ৬০৮টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার নিজস্ব ঠিকানা পেয়েছে।

বর্তমানে ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’ নামে এই কাজটি চলছে। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি ৬৯ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে একটি করে ঘর দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গতকাল ঘর পেল আরো ৫৩ হাজার ৩৪০টি পরিবার। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ আরো এক লাখ পরিবারের হাতে ঘরের চাবি তুলে দিতে কাজ করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিনা মূল্যে এসব ঘর করে দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রকল্পের পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, অনগ্রসর ও সমাজে অবহেলিত বিভিন্ন সম্প্রদায়কেও মূলধারায় সংযুক্ত করার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা