kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

যেভাবে মা-বাবা-বোনকে হত্যা করেন মেহজবিন!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ জুন, ২০২১ ০৭:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যেভাবে মা-বাবা-বোনকে হত্যা করেন মেহজবিন!

ঘাতক মেহজাবিন মুন। ছবি : সংগৃহীত

পুরান ঢাকার কদমতলীতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মা-বাবা ও বোনকে হত্যা করেছেন বড় মেয়ে মেহজাবিন ইসলাম মুন। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন ঘাতকের স্বামী ও সন্তান। ঘটনার পর মেহজাবিনকে আটক করেছে কদমতলী থানা পুলিশ। শনিবার দুপুরে তাকে আটকের পর থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশের ভাষ্য, আটক মেহজাবিন নিহত দম্পতির মেয়ে। পারিবারিক বিরোধের জেরে বাবা, মা ও বোনকে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর শ্বাস রোধ করে মেহজাবিনই হত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। শুধু হত্যাই নয়, পরিবারের তিনজনকে হত্যার পর ৯৯৯-এ ফোন দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর খবরের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। অন্যথায় স্বামী ও সন্তানকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।  

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ১০টার দিকে কদমতলী থানা এলাকার মুরাদপুরের ২৮ নম্বর লালমিয়া সরকার রোডের ছয়তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে মেহজাবিনের মা মৌসুমী ইসলাম (৪০), বাবা মাসুদ রানা (৫০) এবং বোন জান্নাতুলের (২০) লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে নিহত মাসুদ-মৌসুমী দম্পতির আরেক মেয়ের জামাইকে।

কেন এই হত্যাকাণ্ড, জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনার পেছনে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তা বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে মেহজাবিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

পরিবার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যা বলছেন : আটক মেহজাবিনের চাচাতো বোন শিলা বলেন, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে মেহজাবিনের প্রথম বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর ফের মেহজাবিনের বিয়ে হয়। তাঁর পরের স্বামীরও আগে বিয়ে হিয়েছিল। সেই ঘরের এক সন্তান নিয়ে দুই দিন আগে স্বামীর সঙ্গে মায়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন মেহজাবিন। এসেই তাঁর ছোট বোন জান্নাতুলের সঙ্গে তাঁর স্বামীর পরকীয়া প্রেম রয়েছে বলে মা-বাবার কাছে অভিযোগ করেন। এ নিয়ে অনেক কথা-কাটাকাটি হয়। এমন আরো অনেক ঘটনার জেরেই হয়তো এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবারের সঙ্গে মেহজাবিনের বিরোধ চলছিল। বিশেষ করে জায়গা-সম্পত্তি নিয়েও পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ছিল তাঁর। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য মা-বাবাকে অনেক চাপ দিতেন তিনি। এ নিয়ে এর আগে সালিসও হয়েছে, তবে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। এক প্রতিবেশী পুলিশকে জানান, নানা কারণে মেহজাবিন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ছিলেন। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাঁর মানসিক দূরত্ব চলছিল।

এদিকে এই ঘটনায় সংকটাপন্ন অবস্থায় মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলামকে ঢাকা মেডিক্যাল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল বলেন, ‘আমার বাসা কদমতলীর বাগানবাড়িতে। শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। গত রাতে খাবার ও চা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। এতে আমার মেয়েও অচেতন হয়ে যায়। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেখি হাসপাতালে।’

তিনি বলেন, ‘শ্বশুরের পরিবারের সঙ্গে আমার স্ত্রী মেহজাবিনের বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। তারই জের ধরে এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে।’ সূত্র জানায়, মেহজাবিনের মা একটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। খুনের দায়ে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি হত্যা মামলায় পাঁচ বছর জেল খেটে জামিনে ছিলেন তিনি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, মা-বাবা ও বোনকে মেহজাবিনই হত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে মেহজাবিন পুলিশকে বলেছিলেন, ওই বাসায় দ্রুত না গেলে তিনি তাঁর স্বামী ও সন্তানকেও মেরে ফেলবেন। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনটি লাশ উদ্ধার করে। সেই সঙ্গে অন্যদের উদ্ধার করে। মেহজাবিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দীন মীর বলেন, ‘গৃহকর্তা মাসুদ রানা, তাঁর স্ত্রী মৌসুমী ও কন্যা জান্নাতুলকে আমরা বাসার ভেতর মৃত অবস্থায় পাই। তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘খুনের আগে রাতে মা-বাবা, বোনসহ পরিবারের সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান মেহজাবিন। সবাই অচেতন হয়ে পড়লে মা-বাবা ও বোনকে রশি দিয়ে বেঁধে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন। রাতে তাঁদের হত্যা করা হতে পারে। স্বামী ও শিশুসন্তানকেও ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। তারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা মরদেহগুলো হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পেয়েছি। সঠিক সময়ে ঘটনাস্থলে না গেলে দ্বিতীয় স্বামী শফিকুল ইসলাম এবং তাঁর আগের ঘরের মেয়ে তৃপ্তিয়াকে হয়তো মেরে ফেলতেন তিনি।’

ওসি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ঘুমের ওষুধের পাশাপাশি বিষ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আলামত সংগ্রহ করছি।’



সাতদিনের সেরা