kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে হবে

এ কে এম আতিকুর রহমান   

২০ জুন, ২০২১ ০৪:২৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে হবে

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বরের অধিবেশনে উত্থাপিত প্রস্তাব নং-৫৫/৭৬ অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে মোতাবেক ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্বের সব দেশই দিবসটি পালন করে আসছে। আমরা জানি, দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, শরণার্থীদের সম্পর্কে প্রতিটি দেশের জনসাধারণকে সচেতন করে গড়ে তোলা এবং নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে আসা ওই মানুষগুলোর দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করা।

গত বছরের মতোই এ বছর করোনা মহামারির কারণে দিবসটি ব্যাপকভাবে আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করা সম্ভব হবে না। সীমিত আকারের আয়োজনের মধ্যেই এ বছর আমাদের দিবসটি পালন করতে হবে। কভিড-১৯ অধিভুক্ত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশকেও যথেষ্ট বিধি-নিষেধের বেড়াজালের মধ্য থেকেই এই দিবসের যাবতীয় অনুষ্ঠানসূচি সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জাতিসংঘের স্থানীয় অঙ্গ সংস্থাগুলো ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবতাবাদী সংগঠনগুলো সীমিত আকারে হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটির তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে।   

এ বছর বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে—আমরা একসঙ্গে উপশম করি, শিখি এবং দীপ্তিময় হই (টুগেদার উই হিল, লার্ন অ্যান্ড শাইন)। অর্থাৎ শরণার্থীদের সুস্থ রাখার জন্য চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এ জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) ও জাতিসংঘের শরণার্থী এজেন্সিকে, তাদের অন্য অংশীদারদের এবং আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জনগণের সঙ্গে একত্র হয়ে ভিটামাটি ছেড়ে আসা এই লোকগুলো যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় তার ব্যবস্থা করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যথাযথ শিক্ষা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারে। সে কারণে শরণার্থী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, খেলাধুলা মানুষের শরীর ও মনকে সতেজ রাখে এবং আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ়তর করতে সাহায্য করে। খেলাধুলার মাধ্যমে একজন আরেকজনকে জানার সুযোগ পায়, পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধ তৈরি করে। আর এভাবেই সৃষ্টি হতে পারে বন্ধুত্ব এবং এক সর্বজনীন সুন্দর পরিবেশের। তাই এ লক্ষ্যে বিশ্ববাসীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নিঃসন্দেহে কভিড-১৯ মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে এবারের শরণার্থী দিবস পালনের প্রতিপাদ্য বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের এই দিকগুলোর ওপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবছর এই দিনে আমরা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করি, তাদের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হওয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানাই। তবে এ ক্ষেত্রেও যে অনেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটকৌশল প্রয়োগ করছে না তেমনটি কিন্তু নয়। নানা সুযোগ-সুবিধা লাভ বা আধিপত্য দেখানোর উদ্দেশ্যে অনেকেই এসব সমস্যার মূলে যেতে চায় না, অর্থাৎ সমস্যাকে জিইয়ে রাখতে চেষ্টা করে। তাই এ মিশ্র বিশ্বরাজনীতির ফলে ঐক্যের মাধ্যমে সমস্যার কোনো টেকসই সমাধানে পৌঁছতে পারে না। বছরের পর বছর চলে যায়, শরণার্থীদের আর তাদের ভিটামাটিতে ফেরা হয়ে ওঠে না। যে শরণার্থীদের জীবনে নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষীণ আশার আলোটিও আর দেখা যায় না, তাদের যে চরম হতাশা ও মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয় তা কোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পরগাছার মতো বেঁচে থাকার এ সীমাহীন কষ্ট একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে। তাহলে এই দিনে এই যে আমরা এত ভালো কথা আর অঙ্গীকারের কথা বলছি, এর সবই কি অর্থহীন?

শরণার্থীদের জীবন কাটে বিভিন্ন দেশের আশ্রয়শিবিরে। তারা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। সামনে ঝুলে থাকে এক অনিশ্চিত জীবন। স্বদেশের মাটিতে কবে ফিরে যেতে পারবে তার কিছুই জানা নেই। তাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে যুদ্ধের বিভীষিকা, সহিংসতা, দাঙ্গা, ক্ষুধা, রোগ, হতাশা ইত্যাদির ভয়াবহ চিত্র। তারা শুধু নিজেদের ভিটামাটি, জীবিকা, এমনকি আপনজনদের, হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী বা উদ্বাস্তুর খাতায় নাম লেখে না, একই সঙ্গে তাদের ভবিষ্যেকও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। কোনো দিন উজ্জ্বল সূর্যালোকে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার স্বপ্নও তারা কল্পনা করতে পারে না। আমাদের তাদের পাশে সহমর্মিতার উপঢৌকন নিয়ে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের প্রত্যাবাসন বা পুনর্বাসনের অব্যাহত প্রচেষ্টাকে সফল করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, বর্তমানে প্রায় ৮০ মিলিয়ন উদ্বাস্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে প্রায় ২৬ মিলিয়ন হলো শরণার্থী এবং বাকিদের কেউ রাষ্ট্রহীন, কেউ আশ্রয়প্রার্থী, কেউ বা আবার অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। শরণার্থীদের ৬৬ শতাংশ হচ্ছে সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো থেকে আগত এবং অবশিষ্ট শরণার্থী সাহেল, সোমালিয়া, বুরুন্ডি, ইরাক, ইথিওপিয়া, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশের নাগরিক। তুরস্ক সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের বেশির ভাগই সিরিয়া থেকে আসা। এ ছাড়া শরণার্থী রয়েছে কলম্বিয়া, পাকিস্তান, উগান্ডা, জার্মানি, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশের আশ্রয়শিবিরে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের দেখভাল করে থাকে জাতিসংঘের আরেকটি সংস্থা ইউএনআরডাব্লিউএ, যেটি গাজা অংশ, পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর, জর্দান, লেবানন ও সিরিয়ায় অবস্থানরত ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের পরিষেবা দিয়ে থাকে।

আমাদের দেশেও প্রায় চার বছর ধরে অবস্থান করছে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা, যারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও কতিপয় উগ্রবাদী ধর্মীয় লোকের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে ভিটামাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তাদের উদ্বাস্তু বা শরণার্থী যা-ই বলি না কেন, আমাদের শত সমস্যা আর টানাপড়েনের মধ্যেও তাদের আমরা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিইনি। আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে তাদের সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান করোনা মহামারিতেও তাদের সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজের ভিটামাটিতে নিরাপদ ও সম্মানজনক পুনর্বাসনের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে।

দেখা গেছে, শরণার্থীদের ৮৫ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে আশ্রয় পেয়েছে। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে এসব দেশের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত চাপ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, নিরাপত্তা, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপেরও সম্মুখীন হতে হয়। এটা সত্য যে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দেশ ও সংস্থা নানা সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে এদের কাছে ছুটে আসে। কিন্তু আশ্রয়দানকারী দেশের জন্য এটি যে কত বড় একটি বোঝা হতে পারে তা বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেরই ধারণা রয়েছে। আর ওই শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন করতে যদি বছরের পর বছর লেগে যায় তাহলে তো কথাই নেয়। শরণার্থীরা যে দেশের নাগরিক সে দেশে যদি তাদের কখনো ফেরত পাঠানো না যায়, তাহলে তাদের বোঝা কে বহন করবে? তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থারই বা কী হবে? এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য জাতিসংঘকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শরণার্থীদের মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববাসী এড়াতে পারে না। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে ভবিষ্যতে যেমন কোনো দেশই আর শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে না, তেমনি শরণার্থীরাও তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

আজকের এই দিনে একটি কথা না বললেই নয়, শরণার্থীদের পাশে শুধু দাঁড়ানো, সহায়তা করা বা সমবেদনা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এতে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ানো থামানো যাবে না। কেউ যাতে স্থায়ীভাবে শরণার্থী না হয় সে ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে কাজ করতে হবে। একজন মানুষ কেন শরণার্থী হচ্ছে? সে কারণটি কি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক না ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত বৈষম্য? মূল কারণটি উদঘাটন করে তা প্রশমনের ব্যবস্থা নিতে হবে বিশ্বসম্প্রদায়কেই। প্রতিটি ক্ষেত্রের সার্বিক অবস্থার বিচার-বিশ্লেষণ করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে তারা যাতে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে জাতিসংঘকেই। তবে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে।

আসুন, আমাদের এ বছরের প্রতিজ্ঞা হোক শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে একটি নিরাপদ সমাধানে উপনীত হওয়ার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করি। আর একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এসংক্রান্ত একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করে তা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। ওই সিদ্ধান্ত অবশ্যই হবে জাতিসংঘের সব সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা রহিত করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, এ সিদ্ধান্ত শুধু শরণার্থীদের একটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনই ফিরিয়ে দেবে না, সারা বিশ্বে শান্তি স্থাপনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



সাতদিনের সেরা