kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

স্মরণ

আমার বাবা

বিচারপতি বোরহানউদ্দিন   

২০ জুন, ২০২১ ০৪:২১ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



আমার বাবা

আমার বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সবুর আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন সারাজীবন। আমার জ্ঞান হওয়া অবদি দেখেছি বাবা আমাদের গুর্খা ডা. লেনের বাসার সামনের কামড়ায় বসে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন অথবা খুব মনোযোগ দিয়ে আইনের বই ঘাঁটাঘাঁটি করছেন, কাগজপত্র দেখছেন, লিখছেন। এটা চলত ভোর থেকে কোর্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। বাবা ভাত খেয়ে সকাল ১০টায় কোর্টে চলে যেতেন। রিকশায় যেতেন। বিকেলে কোর্ট থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় আবার চেম্বারে। ছোটবেলায় দেখতাম বাবার মুহুরি আনোয়ার সাহেব চেম্বারের পাশে লাগোয়া ডান দিকের কামড়ায় থাকতেন। খাওয়াদাওয়া আমাদের বাসায়। ষাটের দশকের ওই সময় অনেক আইনজীবীর মুহুরিরা আইনজীবীদের বাসায় থাকতেন। আমার নানা অ্যাডভোকেট এস এম মোফখ্খর সাহেবের ঢাকার বাসায়ও দেখেছি। বাবা সিভিল ল ইয়ার ছিলেন। দেওয়ানি আদালতে মামলা করতেন। ফৌজদারি মামলা তেমন একটা করতেন না। আমার দাদা আবদুল লতিফ সাহেব কলেজে পড়ার জন্য বাবাকে কলকাতায় পাঠান। বাবা ছিলেন দাদার প্রথম সন্তান। বাবা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। থাকতেন বেকার হোস্টেলে। আইন পেশা শুরু করেন চট্টগ্রাম জেলা বারে। আজীবন চট্টগ্রামেই ছিলেন। আমার নানা অ্যাডভোকেট এস এম মোফখ্খর সাহেব কলকাতায় প্র্যাকটিস করতেন। ৪৭-এর পর ঢাকায় থিতু হন। তিনি মেয়ে জামাইকে হাইকোর্টে আনার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাবা রাজি হননি। চট্টগ্রামের প্রতি বাবার আলাদা মুগ্ধতা ছিল।

আমার পরে মনে হয়েছিল, বাবার চট্টগ্রাম না ছাড়ার পেছনে আরেকটা কারণ ছিল রাজনীতি। আইন পেশা ছাড়া যে কাজটা বাবা খুব উত্সাহের সঙ্গে করতেন, সেটা রাজনীতি। আওয়ামী লীগ করতেন। বাবা বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ষাটের দশকে যখন আইয়ুব খানের দোর্দণ্ড প্রতাপ, তখনো দেখেছি ছুটির দিনগুলোর সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সভা হতো। আমার মামারা, একজন সিএসপি অফিসার অন্যজন পাকিস্তান আর্মিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল, বাসায় এলে গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়ার পর বাবা দুইজনের কাছেই দলের জন্য রসিদ কেটে ১০ টাকা চাঁদা চাইতেন। এ নিয়ে খুব হাসাহাসি হতো। পরে অবশ্য মামারা টাকাটা দিতেন। উনসত্তর, সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে ছুটির দিন ছাড়াও আমাদের বাসায় লোকজনের সমাগম হতো বেশি। রাজনীতির লোকজন। আসতেন আতাউর রহমান খান কায়সার, আমানিয়া হোটেলের জাকের মিয়া, মাহমুদুল হক সাহেব, মোখতার আহমদ, আনোয়ার মিয়া (বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি), মৌলভি সৈয়দ, দানেশ সাহেব (পরে লালবাহিনীর প্রধান), আরো অনেকে। বাবার চেম্বারের বাঁ দিকের কামড়া ছিল আমি এবং আমার বড় ভাইয়ের পড়ার জায়গা। চেম্বারে মিটিংয়ের হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে আমাদের পড়াশোনার ব্যাঘাতের কারণে আম্মা আমাদের ভেতরের কামড়ায় নিয়ে বসাতেন। প্রায় সময় চা-নাশতার ব্যবস্থা থাকত। অনেক সময় মুহুরি আনোয়ার সাহেবসহ আমাদের হাত লাগাতে হতো। কোনো কোনো সময় সভার পরদিন আম্মা আমাদের লেখাপড়ার ব্যাঘাতের অভিযোগ করতেন। বাবা নির্বিকার। রাজনীতি শুধু বাবার উৎসাহের জায়গা না, আদর্শের জায়গাও ছিল। এমনও দেখেছি সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে বাবা বাঁশখালীতে যাচ্ছেন। জনসভার কাজে। বিশেষ করে উনসত্তর, সত্তরের দিনগুলোতে এটা প্রায়ই ঘটত। বাবা প্রতি মাসে সাত-আট দিন বাঁশখালীতে। মুহুরি আনোয়ার সাহেব প্রায়ই অভিযোগ করতেন পেশার ক্ষতি হবে। বাবা নির্বিকার।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। বাবাসহ আমরা সবাই বাঁশখালীর খানখানবাদে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম। আমাদের গ্রামের দুইজনকে গুর্খা ডা. লেনের বাসার দায়িত্বে রেখে দেওয়া হলো। দুজনই শহরে রিকশা চালাত। বারিক কলোনিতে থাকত। গ্রামের বাড়িতে গেলেও বাবা আমাদের সঙ্গে রাতে থাকতেন না। রাতে তিনি থাকতেন নৌকায়। বাবা ওপারে মুক্তিযুদ্ধে যাননি। কিন্তু এপারে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন। দিনের বেলায় গ্রামের লোকজনদের নিয়ে বসতেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে যেতেন। আমরা যে কয় মাস বাড়িতে ছিলাম, বাবাকে খুব কম দেখতে পেতাম। দু-একবার প্রফেসর আসহাবউদ্দিন সাহেবকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি বাবার সঙ্গে কথা বলছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাস দুয়েক আগে আম্মাসহ আমরা ভাই-বোনেরা শহরের বাসায় চলে এলাম। আসতে বাধ্য হলাম। সে অন্য গল্প। চরম দুর্দিনেও কিছু মানুষের আচরণ অন্য মানুষকে বিপদের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। আমরা চলে এলাম কিন্তু বাবা এলেন না। তিনি গ্রামে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে থাকতেন। শহর তাঁর জন্য নিরাপদ ছিল না। আমার মা শহরে আমাদের নিয়ে থাকতেন। কায়ক্লেশে সংসার চালাতেন।

দেশ স্বাধীন হলো। বাবা ফিরলেন। তখন আমাদের বাসা আরো জমজমাট। প্রতি সন্ধ্যায় আসতেন আতাউর রহমান খান কায়সার। তিনি তখন সংসদ সদস্য। আসতেন আওয়ামী লীগের দক্ষিণ জেলার সেক্রেটারি আবদুল মান্নান। বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আনোয়ার সাহেব তো ছিলেনই। কোষাধ্যক্ষ মাহমুদুল হক সাহেব, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোখতার আহমদ (পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের হয়ে সংসদ সদস্য হন), মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভি সৈয়দ (যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন, ৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অস্ত্রধারণ করেন, শহীদ হন), লালবাহিনী প্রধান দানেশ সাহেব, আরো অনেকে। তাঁদের তত্ত্বাবধানে আমাদের বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হতো, সনদপত্রের ব্যবস্থা হতো।

আমরা তখন নেহাত ছোট ছিলাম না। আমি স্কুলের শেষ ক্লাসে, আমার দুই বছরের বড় ভাই কলেজে ভর্তি। কিন্তু কোনো সময় মনে আসেনি তালিকায় নিজের নাম লেখাব। কারণ আমার বাবা। বাবাকে চিনতাম। বাবা দেশেই ছিলেন। দেশে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। বাঁশখালীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু নিজেকে কখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেননি। বাবা মনে করতেন যাঁরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, তাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা। নীতির ব্যাপারে বাবা আপসহীন ছিলেন।

আমার মনে আছে, তখন ন্যায্যমূল্যের দোকান থেকে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিস স্বল্পমূল্যে বিক্রয় হতো। ন্যায্যমূল্যের দোকানের দেখভাল যে দুজন করতেন, তাঁদের মধ্যে একজন বাবার ভাই ছিলেন। বিক্রির হিসাবসংক্রান্ত গড়মিলের জন্য বাবা দুজনকেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দিলেন। সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সার বাবার মামাতো ভাই ছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁর অনুরোধও বাবা রাখেননি।

বাবা সরকারি উকিল ছিলেন ’৭২ থেকে ৭৫-এর আগস্ট পর্যন্ত। বাবা দক্ষিণ জেলা রেডক্রসের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। চেয়ারম্যান ছিলেন জেলা প্রশাসক। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাবা বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু আমাদের গুর্খা ডা. লেনের পাকিস্তান আমলের বাসার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই বেড়ার বাসা। বাবার সেই চেম্বার লাগোয়া মুহুরির থাকার ঘর, আমাদের পড়ার ঘর। বাবার কোর্টে আসা-যাওয়া রিকশায়। গুর্খা ডা. লেনের পঞ্চাশের দশকের জায়গাটি ছাড়া চট্টগ্রাম শহরে বাবার আর কোনো জায়গা ছিল না। আত্মীয়-স্বজন অভিযোগ করত, আমরাও। বাবা নির্বিকার।

আমরা জানতাম বাবা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠি ছিলেন। তত্কালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অনেকেই জানতেন। একবার চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির ব্যাপারে দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান সাহেব বাবাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কমিটির ব্যাপারে দেখা করার জন্য। বাবা নির্বিকার। ৭৩-এর দিকে বঙ্গবন্ধু একবার চট্টগ্রামে এলেন। রাতে ডিনার ছিল। বাবা ডিনারে আমন্ত্রিত ছিলেন। ডিনার থেকে ফিরে বাবা খুব উত্ফুল্ল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কলকাতার কলেজজীবনের কথা হয়েছে। খানে আলম খান (একসময় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন), কাজী গোলাম মাহবুবসহ আরো বন্ধুবান্ধবের কথা বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেছেন। আমার নির্বিকার বাবাকে ওই দিন আমি খুব খুশি দেখেছিলাম। আম্মাকে হেসে হেসে গল্প করছেন। যেন জীবনের পরম চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। দুই কন্যা ছাড়া ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হলেন। বাবা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ’৭৫-এর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামের তত্কালীন সরকারি উকিল (জিপি) আনোয়ারুজ্জামান সাহেবের নেতৃত্বে বাবাসহ প্রায় সব সরকারি উকিল একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সারা দেশে এটাই প্রথম সরব প্রতিবাদ। এই ঘটনা আমাকে বলেছেন প্রেস কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজউদ্দীন আহমদ। তিনি চট্টগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোজাফ্ফর খান সাহেবের চেম্বারে জুনিয়র হিসেবে যোগ দেন ’৭৫-এর ১৮ সেপ্টেম্বর। একই ভাষ্য আমি পাই চট্টগ্রামের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর জসীমউদ্দিন খানের কাছে। তিনি ’৭২-এ চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। শুধু আমার বাবা নন, ওই দিন যাঁরা একযোগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন তাঁরা সবাই নীতির প্রশ্নে সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করেছিলেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলেন। আওয়ামী লীগকে ভালোবেসেছিলেন। তাঁদের মতো লোকের কারণেই বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে আমি পেশাগত কারণে ঢাকায়। তখন খানে আলম খান সাহেব আইন পেশায়। অল্পস্বল্প রেভিনিউ মামলা করেন। একদিন আমার সঙ্গে সেগুনবাগিচা ১২তলা ভবনে দেখা। আমি নিজের পরিচয় দিলাম। বাবার কথা বললাম। তিনি খুব খুশি হলেন। কথায় কথায় বললেন, ‘কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে তোমার বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুব খাতির ছিল।’ কথাটা ওই দিনই আমি জানলাম। আগে জানতাম সহপাঠি ছিলেন। দুজনেই বেকার হোস্টেলে থাকতেন। একই কথা আমাকে ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট কাজী গোলাম মাহবুব সাহেব বলেছিলেন। কাজী গোলাম মাহবুবও বাবাদের সঙ্গে ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। বাবার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। তাঁর বড় মেয়ে আর আমার বোন (বোনদের মধ্যে বড়) দুজনেরই ডাকনাম ‘মহুয়া’।

আমাদের গুর্খা ডা. লেনের বাসাটা ’৯৮ ইংরেজি পর্যন্ত বেড়ারই ছিল। মেঝেটা পাকা ছিল। আমরা তিন ভাই যখন উপার্জনে, তখন হাউসবিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিয়ে ঘরটা পাঁচতলা বিল্ডিং করি। ২০০০ সাল থেকে আমরা বিল্ডিংয়ের তিনতলায় বসবাস শুরু করি। বাকিগুলো ভাড়া দিই। নিচের তলায় একপাশে চেম্বার করি। তখন আমার ছোটভাই জিয়াউদ্দীন আইনজীবী। (বর্তমানে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক)।

আমি হাইকোর্টের বিচারপতি হই। বাবা খুশি হলেন। বিচারপতি হওয়ার পর প্রথম সপরিবারে চট্টগ্রামে যাই। মা-বাবা দুজনেই নাতিদের পেয়ে খুশি। দ্বিতীয় দিন বাবা আমার স্ত্রীকে আমার সামনে বললেন, ‘উকিল থাকতে ওর আয়-রোজগার ভালো ছিল। তুমিও প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করতে পেরেছ। এখন তো বেতনের টাকা। চলতে পারবে তো? না পারলে ওকে আবার পেশায় চলে যেতে বলো। অনেক সময় বউদের কারণে সত্ থাকা যায় না।’ আমার স্ত্রী উত্তর দিল, ‘ইনশাআল্লাহ আমি চালিয়ে নিতে পারব।’

আমার বাবা কোনো সময়, এমনকি আমার ওকালতিজীবনেও আমার কাছে টাকা-পয়সা চাননি। কোনো ছেলে-মেয়ের কাছ থেকেই না। আমরা সব ভাই-বোন তখন পেশায়, চাকরিতে। আমরা দিতাম। আমাদের ভালো লাগত। এ কথা আমরা বলতাম। তিনি হাসতেন। একবার বলেছিলেন, ‘আমার একটা তৃপ্তি আছে। সব ছেলে-মেয়ের রোজগার আমি দেখেছি।’ 

বাবা মারা যান ২০০৯ সালে। মে মাসের এক সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন। বুকে সামান্য ব্যথা ছিল। পরদিন সন্ধ্যায় চলে গেলেন। হতভাগ্য আমি রাতে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখতে পাইনি। আমার বোন ডালিয়া পাশে ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। সে পরে বলেছিল, 'বিকাল থেকেই বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন বাবা।' হয়তো আমার প্রতীক্ষায় ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল ঢাকায় না থাকলে হয়তো শেষ দেখা দেখতাম।

২০১০ সাল। বিচারপতি হিসেবে আমার দুই বছর পূর্ণ হবে। স্থায়ী হব কী হব না জানি না। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার ১১ দিন আগে, আমার ঠিক মনে আছে ১১ দিন আগে, আমি কোর্টে। দুপুরে নামাজ পড়ে, খাওয়াদাওয়া করে আবার এজলাসে ওঠার আগে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। মোবাইল বেজে উঠল। কানে দিতেই ওপাশ থেকে বললেন, ‘আমি তোমার চাচা আক্তারুজ্জামান বাবু বলছি। আমি শফিক সাহেবের রুমে (ব্যারিস্টার শফিক আহমদ, তৎকালীন আইনমন্ত্রী)। আমি তাঁকে বলতে এসেছি বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে তিনজন লোককে তুমি বলতেন। একজন আজিজ মিয়া (এম এ আজিজ), একজন জহুর মিয়া (মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী), আরেকজন সবুর মিয়া (বাবা)। আমি মরে গেলে এ কথা বলার কেউ থাকবে না। বাবু চাচা ফোন রেখে দিলেন। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। আমি তো বাবু চাচাকে কিছু বলিনি। তিনি কী করে জানলেন আমার স্থায়ী হওয়ার সময় আর কিছুদিন পর। চোখ ভেসে যায় জলে।

লেখক : বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট



সাতদিনের সেরা