kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

টিভির লাইসেন্স ফি তোলার লোক নেই!

গচ্চা আট হাজার কোটি টাকা

এ খাত থেকে বছরে আদায় করা হচ্ছে মাত্র ১০ কোটি টাকা

জয়নাল আবেদীন   

২০ জুন, ২০২১ ০২:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গচ্চা আট হাজার কোটি টাকা

নিজের টাকায় কেনা টেলিভিশন ঘরে বসে দেখবেন, তার জন্যও লাইসেন্স? নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টি আজব মনে হতে পারে। তবে সত্যিই একসময় লাইসেন্স চেক করতে ঘরে ঘরে হানা দিত টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ। বিকল্প নানা মাধ্যম সহজলভ্য হওয়ায় টেলিভিশন লাইসেন্সের কথা ভুলতে বসেছেন প্রবীণরাও। কিন্তু আইন তো আর বাদ হয়ে যায়নি! লাইসেন্স ফি আদায়কারী কর্তৃপক্ষের স্থবিরতার মাসুল গুনছে সরকার। গত কয়েক বছরে এই খাত থেকে রাজস্ব হাতছাড়া হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৪ শতাংশ মানুষের ঘরে টেলিভিশন আছে। কেবল নেটওয়ার্ক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বর্তমানে তাদের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় চার কোটি। অর্থাৎ দেশে প্রায় চার কোটি টেলিভিশন রয়েছে। দ্য ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ আইন ১৯৩৩-এর যথাযথ প্রয়োগ হলে ব্যবহৃত সব টিভির লাইসেন্স ফি ওঠার কথা অন্তত আট হাজার কোটি টাকা।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বছরে মাত্র ১০ কোটি টাকা আদায় করতে পারছে সরকার। তাঁরা স্বীকার করছেন, আইন সচল থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। গ্রাহক পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে লাইসেন্স ফি আদায়ের ক্ষেত্রে জনবলসংকটের কথা বলছেন তাঁরা। তাই চিন্তাভাবনা চলছে ভবিষ্যতে টেলিভিশন বিক্রেতা পর্যায়ে মূল্য সংযোজন (মূসক) চালানের আদলে নতুন পদ্ধতিতে এককালীন ফি আদায়ের।

ইলেকট্রনিকসসামগ্রী উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জরিপের হিসাবে, বর্তমানে বছরে ১৭ থেকে ১৮ লাখ রঙিন টেলিভিশন বিক্রি হচ্ছে। আট বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১৪ থেকে ১৫ লাখ। তবে এই সংখ্যা বৈধ উপায়ে আমদানি করা এবং বিক্রীত টেলিভিশনের। এর বাইরে স্থানীয়ভাবে জোড়াতালি দিয়ে বানানো  এবং নামসর্বস্ব কম্পানির নিজস্ব উৎপাদিত বিপুলসংখ্যক টেলিভিশন অবৈধ উপায়ে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। সেই হিসাবে বছরে টেলিভিশন বিক্রির সংখ্যা ২০ লাখের বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের লাইসেন্স শাখার হিসাবে, প্রতিটি রঙিন টেলিভিশনের লাইসেন্স ফি আকারভেদে সর্বনিম্ন দেড় হাজার থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত। সে হিসাবে প্রতিবছর বিক্রীত টেলিভিশন থেকে লাইসেন্স ফি বাবদ সরকারের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা অন্তত ৩০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এখন প্রতি অর্থবছরে মাত্র ১০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান বিটিভির লাইসেন্স শাখার উপনিয়ন্ত্রক মো. মাশুক মিয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় মাসিক হারে টেলিভিশনের লাইসেন্স ফি আদায় করা হতো। তখন এ খাত থেকে প্রতি অর্থবছরে সংগ্রহ হতো প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এখন এটি এককালীন হিসেবে আদায় করা হচ্ছে।’ গ্রাহকও এখন ফি দিতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান বা ডিলার পর্যায়ে টেলিভিশন বিক্রি করার সময় মূসক চালানের মতো একটি নতুন ব্যবস্থাপনায় এই অর্থ আদায়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স ফি কিছুটা বৃদ্ধি করার সুপারিশও করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, কয়েক বছর ধরে সংসদীয় কমিটির প্রায় সব বৈঠকে টিভির লাইসেন্স ফি আদায়ের বিষয়টি উঠছে। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ফি আদায়ে মনিটরিংয়ে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে বলা হয়, বিক্রয়কেন্দ্রে টেলিভিশন সেটের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ের রসিদের মতো লাইসেন্স ফি আদায়ের রসিদ দেওয়া যায়। এরপর ফি সংশ্লিষ্ট খাতে জমার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।

ওই বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, রঙিন টেলিভিশনের জন্য লাইসেন্স ফি আকার অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত। একসঙ্গে পাঁচ বছরের লাইসেন্স ফি নিতে হবে। এ বিষয়ে প্রস্তাব তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, পুরো বিষয়টি এমনভাবে করতে হবে যেন জনগণের ওপর ট্যাক্সের বোঝা না পড়ে।

গতকাল শনিবার যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক সোহরাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে লাইসেন্স ফি সংগ্রহ করার মতো জনবল নেই। তবে টেলিভিশন বিক্রেতা বা ডিলারদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ আছে। তারা যেন টেলিভিশন বিক্রির সময় এককালীন ফি আদায় করে রাখে। এভাবে কিছু ফি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে ফাঁকি যে হচ্ছে না, তা নয়। লাইসেন্স ফি আগের চেয়ে সামান্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। লাইসেন্স শাখার নিয়ন্ত্রক জুলফিকার রহমান কোরাইশী বলেন, আইন চালু আছে, কিন্তু লাইসেন্স ফি সংগ্রহ নেই বললেই চলে। লাইসেন্স ফি আদায়ে শিথিলতা কেন, জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

জানা গেছে, দ্য ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ আইন, ১৯৩৩-এর অধীনে দ্য টেলিভিশন রিসিভিং অ্যাপারেটাস (পজেশন অ্যান্ড লাইসেন্সিং) রুলস, ১৯৭০ প্রণীত হয়। এ রুলসে আবাসিক টেলিভিশন লাইসেন্স এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত টেলিভিশনের জন্য বাণিজ্যিক টেলিভিশন লাইসেন্স গ্রহণের প্রথা এখনো বিদ্যমান। ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো টেলিভিশন, ভিসিআর ও স্যাটেলাইট টিভি রিসিভারের ফি নির্ধারণ করে তা আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়। পরে সরকার টিভি সেট কেনার সময়েই এই ফি এককালীন আদায়ের ব্যবস্থা চালু করে। তবে মনিটরিং না থাকায় বিষয়টি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে সরকার আরেক দফা লাইসেন্স ফি বাড়ায়। ওই সময় সরকার আবাসিক ভিত্তিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরন ও পরিমাপের টিভি সেটের পুনর্নির্ধারিত এককালীন আবাসিক টেলিভিশন লাইসেন্স ফি সাদাকালো টিভি ৬০০ টাকা, সাধারণ রঙিন টিভি ২১ ইঞ্চি পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ টাকা, সাধারণ রঙিন টিভি ২২ ইঞ্চি বা তদূর্ধ্ব এক হাজার ৮০০ টাকা, এলসিডি/এলইডি টিভি ২১ ইঞ্চি পর্যন্ত এক হাজার ৮০০ টাকা, এলসিডি/এলইডি টিভি ২২ থেকে ৩৬ ইঞ্চি পর্যন্ত দুই হাজার ৪০০ টাকা এবং এলসিডি/এলইডি টিভি ৩৭ ইঞ্চি বা তদূর্ধ্ব তিন হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ করে।



সাতদিনের সেরা