kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

৪০ শতাংশ ফলই বিফলে

তৌফিক মারুফ   

১৯ জুন, ২০২১ ০২:৫৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৪০ শতাংশ ফলই বিফলে

ফল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। তবে সেই অর্জনের প্রায় অর্ধেকই বিফলে যাচ্ছে। অর্থাৎ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদিত ফলের ৪০ শতাংশই নষ্ট হচ্ছে। রপ্তানিপ্রক্রিয়াতেও পিছিয়ে রয়েছে দেশ। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ভোক্তার বদলে ফল ভাগাড়ে জায়গা হওয়ায় এসবের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে উৎপাদক, ব্যবসায়ী, সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ ফল-ফসল উৎপাদনে যতটা পারদর্শিতা অর্জন করেছে, সেই অনুপাতে উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়া সামলাতে পারদর্শী হতে পারেনি। এ কারণে ফল রপ্তানি ও প্রক্রিয়াকরণে বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও দেশ পিছিয়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছে অত্যাধুনিক ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ভিএইচটিপি)। বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ফলের চাষ হওয়া এলাকাগুলোতে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য অনুসারে, নানামুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশে এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে দেশে বর্তমানে আনারস উৎপাদিত হচ্ছে সাড়ে চার লাখ টন। আর লিচু ফলছে প্রায় তিন লাখ টন। পেয়ারা উৎপাদনেও বিশ্বের অনেক দেশ থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ। এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। আরো তাৎপর্যের বিষয় হলো, দেশে কোনো কোনো ফল সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে।

উৎপাদিত বিভিন্ন ফলের মধ্যে আম ও পেয়ারার প্রায় ৪০ শতাংশ, আনারসের ৩৪ শতাংশ এবং লিচুর ৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় পোস্ট হার্ভেস্টের নানা পর্যায়ে। অন্যদিকে ফলের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদার দিক থেকে পিছিয়ে আছে দেশের মানুষ। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে দেড় শ গ্রাম ফল খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও খেতে পারছে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ গ্রাম করে। তা-ও সবার ক্ষেত্রে এতটুকু পুষ্টি মেলে না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বে নষ্ট ও অপচয় হওয়া খাদ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশই ফল ও সবজিজাতীয় খাদ্য। আর বাংলাদেশ ওই সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফল নষ্টকারী দেশের পর্যায়ে রয়েছে। ফল নিরাপদ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করতে না পারা, সংগ্রহের সময় জমিতে পড়ে থাকা, সংগ্রহের পর সংরক্ষণের জন্য নেওয়া কিংবা বাজার পর্যায়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগত কারণে পচে নষ্ট হয়। এ ছাড়া এখনো দেশে আমসহ অন্যান্য ফল প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আগে ঝুড়িতে ফল বহনে বেশি নষ্ট হতো। কয়েক বছর ধরে প্লাস্টিক ক্যারেটের প্রচলন হওয়ায় কিছুটা কম নষ্ট হচ্ছে। আবার তাপমাত্রাও সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। সংরক্ষণস্থলও উপযুক্ত থাকে না। এতে ফলের পুষ্টিগুণও নষ্ট হয়ে যায়।

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসব দিকে মানুষের তেমন নজর নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে ফল উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নজরদারি করা হয়। সেখানকার সাধারণ ভোক্তারাও এসব ক্ষেত্রে সচেতন। দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে সামান্য যেটুকু পদ্ধতি চালু হয়েছে তারও গতি খুব ধীর। তবে দেশে ফলসহ উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের উপায় নিয়ে এবারই প্রথম একটি বড় গবেষণা হয়েছে। এখন ফলাফল পর্যালোচনা চলছে। এ মাসের শেষের দিকে সেই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টিগুণ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হচ্ছে আম্রপালি জাতের আম। এরপর রয়েছে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, হাঁড়িভাঙ্গা ইত্যাদি। দেশের বেশির ভাগ এলাকায়ই এখন আম হয়। তবে বেশি হচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে। পাহাড়ি অঞ্চলেও বেশ কিছু আম হচ্ছে।

ড. মেহেদী মাসুদ আরো বলেন, সহনশীলতা কম থাকায় দেশি জাতের আমগুলো তুলনামূলক বেশি নষ্ট হয়। দেশি জাতের আম সংগ্রহের পর চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। অন্যদিকে বিদেশি জাতের আম ১০-১২ দিন পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে রাখা যায়। সরকারি উদ্যোগে এখন এলাকায় এলাকায় ভিএইচটিপি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রথমবারের মতো রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুরে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ভিএইচটিপি স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন। দ্রুতই এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো হবে।

ভিএইচটিপি সম্পর্কে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এই প্লান্টের আওতায় নিরাপদ পদ্ধতিতে যেকোনো ফল সংগ্রহ করে গ্রেডিং করে আয়োডাইজড পানিতে ধোয়া হবে। তারপর নির্দিষ্ট ফলের জন্য উপযুক্ত ও সহনীয় তাপমাত্রায় বাষ্পীয় প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে প্যাকেটজাত করে রাখা হবে কুলিং সিস্টেমে। এই প্রক্রিয়ায় ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকবে।



সাতদিনের সেরা