kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

করতেন পোল্ট্রি ফিড ব্যবসা, পরে হয়ে যান বিজ্ঞানী; অতঃপর ধরা

অনলাইন ডেস্ক   

১৬ জুন, ২০২১ ২১:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করতেন পোল্ট্রি ফিড ব্যবসা, পরে হয়ে যান বিজ্ঞানী; অতঃপর ধরা

আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানীর ভুয়া পরিচয়ে স্ব-উদ্ভাবিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-প্রতিকার, পাওয়ার প্লান্ট প্রজেক্ট, করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা ও জমি আত্মসাৎকারী চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞানী সাইফুল ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুলসহ ১৬ জনকে ঢাকা ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বুধবার বিকেলে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয় সাংবাদিকদের। 

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রতিকার বিশ্বব্যাপী একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই তথ্যকে পুঁজি করে একটি চক্র ভুয়া বিজ্ঞানী পরিচয়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছে বলে র‌্যাবের গোয়েন্দারা জানতে পারেন। বিজ্ঞানীর ভুয়া পরিচয়ে জ্বালানিবিহীন জেনারেটর তৈরি ও পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গবেষণা ও প্রভাব প্রতিকার প্রজেক্ট এবং এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে করোনাকে পুঁজি করে করোনা প্রতিরোধক কয়েল উদ্ভাবনসহ অন্যান্য অভিনব আবিষ্কারের ভুয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে প্রতারণা করছে। চক্রটি দেশি-বিদেশি সংস্থা ও নেতারা সহায়তা ও ফান্ডপ্রাপ্তির কথা বলে; দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জনসাধারণকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ পায় র‌্যাব। অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব ছায়াতদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।

গত মঙ্গলবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১-এর সদস্যরা রাজধানীর উত্তরা এলাকার প্রতারক সংগঠন ‘রাজা-বাদশা’ গ্রুপের নতুন কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে প্রতারক চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞানী সাইফুল ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুলকে (৫৪) গ্রেপ্তার করে। তার সহযোগী বকুলি ইয়াসমিন (৪৬), ইমরান রাজা (২৫), কাকুলী আক্তার (১৯), রোমান বাদশা (১৮), আনিসুজ্জামান সিদ্দিকী (৫৩), নাজমুল হক (৩০), তারেক আজিজ (৪০), বেল্লাল হোসেন (৬১), আব্দুল মান্নান (৫০), শিমুল মিয়া (২৪), নুরনবী (৪৫), আবুল হাশেম (৪২), আলী হোসেন (৩৮), শওকত আলী (৫০) ও  রোকনুজ্জামানকে (৫০) গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে একটি  বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড গুলি, দুই বোতল বিদেশি মদ, ৬টি সিল, নগদ ৪৫ হাজার ৪৬০ টাকা, ২০টি মোবাইল ফোন, ১৪টি চেকবই, ১২টি ভিজিটিং কার্ড, ৬টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চিঠি, বিভিন্ন মূল্যের ১২১টি জাল স্ট্যাম্প, ৩টি চুক্তিনামা দলিল, ৩টি বই এবং ৯টি স্বাক্ষরিত চেক ও বিদেশি নেতাদের সঙ্গে পত্রালাপের ভুয়া কপি উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত সাইফুল ইসলাম এই চক্রের মূল হোতা। তিনি ‘রাজা-বাদশা গ্রুপ’ নামে একটি ভুয়া সংগঠন তৈরি করে ২০১১ সাল থেকে প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি এ গ্রুপের চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেন। এই চক্রের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার মধ্যে তার স্ত্রী বকুলী ইয়াসমিন, ছেলে ইমরান রাজা, রোমান বাদশা, পুত্রবধূ কাকুলী আক্তার ভুয়া সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে বলে জানা যায়।

গ্রেপ্তারকৃত সাইফুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি পাস। তিনি প্রথমে টিউশনি ও পরে পোল্ট্রি ফিড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ ১০-১১ বছর ধরে তিনি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তার নামে বিভিন্ন থানায় ৫টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। তিনি নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিকটিমদের প্রলুব্ধ করতেন। তিনি উল্লেখ করতেন যে, বিদেশে তার বিভিন্ন আবিষ্কার ও গবেষণা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এ ছাড়া তার প্রতিষ্ঠান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রতিকার ও জ্বালানিবিহীন জেনারেটর দ্বারা পরিচালিত পাওয়ার প্লান্ট ও করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন। তিনি ভুক্তভোগীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতেন। তিনি বলতেন, করোনা প্রতিরোধে তার কয়েল টেকনিক পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী করোনা প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরো উল্লেখ করতেন, তার প্রজেক্টসমূহের বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের বিভিন্ন ভুয়া পত্রালাপ তিনি তাদের সামনে উপস্থাপন করতেন, তার সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক ও নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করতেন। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে সম্মত রয়েছেন বলে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করতেন সাইফুল। ভিকটিমদের বিশ্বাসযোগ্যাতা অর্জন করাতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িফ এরদোয়ান ছাড়া সৌদি আরবের তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাস, জাপানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উদ্ধৃত করতেন। এ ছাড়া ইরাকের এক আইনজীবী তার উদ্ভাবিত প্রজেক্টে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন এমন তথ্য দিতেন। এভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারিত করতেন তিনি।

প্রতারক সংগঠনের মূল কার্যালয় উত্তরায় অবস্থিত (নবস্থাপিত)। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ব্যাপারীপাড়ায় একটি শাখা রয়েছে। অফিসের ১৫ জন সহযোগী কর্মরত; এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে আরো ৩০ জনের অধিক নিয়োগপ্রাপ্ত লোক রয়েছে। মাঠপর্যায়ের এজেন্টরা প্রাথমিক আলোচনা করে টার্গেট নির্ধারণ করতেন। এরপর  গ্রুপ বা কম্পানি চেয়ারম্যান সাইফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতেন। পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তারকৃত সাইফুল ভিকটিমদের বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে ফেলতেন।  তিনি জানাতেন, প্রজেক্টগুলোর ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে অধিক টাকা পাবেন। স্বল্পশিক্ষিত ও ধনী ব্যবসায়ী ও জমিজমা সম্পত্তির মালিকদের টার্গেট করতেন চক্রের সদস্যরা। 

র‌্যাব জানায়, এরই মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রজেক্টের আওতায় নোয়াখালীতে প্রায় ৪৫০ বিঘা জমি ছাড়া লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংয়ের ভালুকায় আরো সহস্রাধিক বিঘা জমি প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকায়ও জমি জালিয়াতি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে সাইফুর র‌্যাবকে জানান। কয়েক শ ভুক্তভোগী তার মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



সাতদিনের সেরা