kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাক যৌথ গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী

ভূমিকম্প সহনীয় দেশ করতে ৫০ বছর লাগবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জুন, ২০২১ ১৮:১৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভূমিকম্প সহনীয় দেশ করতে ৫০ বছর লাগবে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ জন্য সরকার দেশকে ভূমিকম্প সহনীয় করতে ৫০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জাপানে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষতি হয় না। আমরা জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। জাপান বলেছে, ভূমিকম্প সহনীয় দেশ করতে তাদের ৩০ বছর লেগেছে, আমাদের ৫০ বছর লাগবে। এ জন্য জাইকার সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে; তারা বিনা সুদে আর্থিক সহায়তা দেবে। 

আজ বুধবার কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাক যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 

ইডাব্লিউএমজিএল সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বৈঠক সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন। সূচনা বক্তব্য দেন ব্র্যাকের হিউম্যানিটেরিয়ান প্রগ্রামের পরিচালক সাজেদুল হাসান। 

আলোচনায় অংশ নেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, বুয়েটের পুরাকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তাহমীদ মালিক আল হুসাইনী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেল্থ সায়েন্সের রিপ্রোডাকটিভ অ্যান্ড চাইল্ড হেল্থ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রওশন আরা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. সাজ্জাদ হোসাইন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি খুরশিদ আলম, ইউএন উইমেনের প্রগ্রাম স্পেশালিস্ট দিলরুবা হায়দার, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উপপরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে লাখ লাখ লোক মারা যাবে। কতটা উদ্ধার আমরা করতে পারব জানি না, এ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকি। ক্ষয়-ক্ষতি এড়ানোর জন্য বিল্ডিং কোড আমাদের অনুসরণ করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রধানমন্ত্রী ২৩ শ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। ভূমিকম্পের সংকেত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে দেওয়া যায় সেই চেষ্টাও করা হচ্ছে।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, গত কয়েক বছর যাবৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মৃদু ভূকম্পন আমরা অনূভব করছি। যখনি এসব ছোট-খাটো ভূমিকম্প ঘটে তখনি আমাদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপর অনেক দিন ভূমিকম্প না হলে সেই আতঙ্ক মাথায় থাকে না। এই বিষয়ে আমাদের নিয়মিত সচেতনতামূলক কাজ করা উচিত। তিনি বলেন, যে কোনো দুর্যোগের বিষয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালের কণ্ঠ বরাবরই এসব বিষয় কাজ করে আসছে। ভবিষ্যতেও সরকারি-বেসকারি সব ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে থাকবে কালের কণ্ঠ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিল্ডিং কোর্ড তৈরি হয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ভূমিকম্প হলেও ইউটিলিটি সেবাগুলো যাতে অটোশাটডাউন হয়ে যায়, সে ব্যাপারেও চেষ্টা চলছে। 

অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ১৮৯৭ সালে এ অঞ্চলের একটি ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একটি ভূমিকম্পের পরদিন থেকেই আরেকটি ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে। সেই হিসেবে আরেকটি ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে আছি আমরা। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা শহর বেশি ঝুঁকিতে আছে। সে তুলনায় কম ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও ঢাকা শহরে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য আমাদের মাত্র ১১ হাজার কর্মী বাহিনী রয়েছে। এ জন্য আমরা ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবী তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। এ বছর ১৬-১৭ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭০ হাজার ভবন ধসে পড়বে। তখন ইউটিলিটি সেবার কী অবস্থা হবে আমরা জানি না। কারণ আমাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থা খুবই বিপজ্জনক। এ গুলোকে একটা সিস্টেমের মধ্যে আনা জরুরি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। তবে ভূমিকম্প হওয়ার পরবর্তী তথ্য আমরা সংরক্ষণ ও প্রদান করে থাকি। বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরে ১০টি ভূমিকম্প স্টেশন রয়েছে, যেগুলো রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এই স্টেশনগুলো থেকে একেবারে সঠিক সময়ে ভূমিকম্পের তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, বিল্ডিংয়ের যেখানে মৃত্যু হবে, সেখানে মানুষের মৃত্যু অবধারিত। ঝুঁকি শুধু শহরে নয়, গ্রামেও। কারণ গ্রামেও বিল্ডিং হচ্ছে। এগুলোর তদারকি দরকার। বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা দরকার। আর ভূমিকম্পের ধারাবাহিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সচেতনতার জন্য একটি দিবস ঘোষণা করা যেতে যাবে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল সেই দিনকে আমরা সচেতনা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি।  

ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি খুরশিদ আলম বলেন, ভূমিকম্প থেকে জীবন রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি বাঁচানোর দিকেও নজর দিতে হবে। অর্থনীতিকে ভূমিকম্প সহনশীল হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। বিপদের সময় প্রতিবেশীরাই প্রথম রক্ষাকারী হিসেবে আসে। এ কারণে প্রত্যেক ঘরে একজন স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে ব্র্যাকের হিউম্যানিটেরিয়ান প্রগ্রামের পরিচালক সাজেদুল হাসান বলেন, সম্প্রতি সিলেটে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার পর এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির ব্যাপারটি আবার সামনে এসেছে। ১৯৭২ সালে ব্র্যাক সৃষ্টির পর থেকেই বাংলাদেশের যত ধরনের মানবিক কার্যক্রম আছে, সেগুলোর প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্র্যাক যুক্ত আছে। এর মধ্যে ২০২০ সাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ বছর, যেখানে বাংলাদেশকে কমপক্ষে তিনটি বড় দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করোনা, সাইক্লোন এবং বন্যা। এই দুর্যোগগুলোর সময় সরকারের সহযোগিতায় আমরা সম্মিলিতভাবে একটি ভালো অবদান রাখতে পেরেছি। কিন্তু ভূমিকম্প হচ্ছে এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে আমাদের কিছু অগ্রগতি এবং প্রস্তুতি আছে, তবে  এখনো আরো অগ্রগতির দিকে আমাদের যেতে হবে।



সাতদিনের সেরা