kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন—পিডিবিএফ

দুর্নীতির মানিকজোড় আমিনুল-মনারুল!

সেরাজুল ইসলাম   

১৬ জুন, ২০২১ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুর্নীতির মানিকজোড় আমিনুল-মনারুল!

আমিনুল-মনারুল দুর্নীতিতে দুজন যেন মানিকজোড়! সাধারণ মানুষের কল্যাণে সরকার ‘পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)’ গড়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ পথে পদ পেয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের হীন স্বার্থে ব্যবহার করেন আমিনুল। তিনি নিজের ঠিকাদারি কম্পানিকে উচ্চদরে কাজ দেওয়াসহ নানা রকম দুর্নীতি করেছেন—যেখানে অন্যতম সহযোগী ছিলেন প্রকল্প পরিচালক মনারুল ইসলাম। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (সিএজি) পরিচালিত অডিট, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের  তদন্ত কমিটি, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাঁদের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এরপর তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, তারাও অনেক তথ্য পাওয়ায় কাজটি অনেক এগিয়ে রয়েছে। শিগগিরই মামলা দায়েরপূর্বক তাঁদের আটক করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের কেউ কেউ ওই দুই কর্মকর্তাকে রক্ষায় ব্যাপক তৎপর বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আমিনুল বর্তমানে পিডিবিএফের পরিচালক পদে আছেন। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত এমডি পদে থাকাকালে নিজের কম্পানি সানার্জি টেকনোলজিসকে কাজ দিয়েছেন

বিধিবহির্ভূতভাবে। এজি অডিটে উঠে এসেছে—শুধু একটি প্রকল্প থেকে সানার্জিকে ২৫ কার্যাদেশে তিন কোটি ২৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকার কাজ দিয়েছেন তিনি। সোলার হোমস সিস্টেম প্রকল্প থেকে সানার্জি ৩০ উপজেলায় ৩০ কার্যাদেশের মাধ্যমে চার কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকার কাজ পায়, যা পিপিআর রুলের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি স্ত্রীর নামেও আরেকটি কম্পানি (নাম এ্যাঙ্গিরা) খুলে সেই কম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা করেছেন দরপত্র ছাড়া। এজি অডিট টিমের কর্মকর্তা শর্মীলা নাজনীন (উপপরিচালক সেক্টর-২) গত ২৩ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বলা হয়, দর ও ক্রয় নীতিমালা উপেক্ষা করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে ১১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাপারে আপত্তি দেওয়া হয়েছে।

আরো অভিযোগ হচ্ছে, আমিনুল ইসলাম পদোন্নতি পাওয়ারই যোগ্য ছিলেন না। দুইজনকে ডিঙিয়ে পরিচালক পদে চড়ে বসেন! স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমিনুল ইসলামের পরিচালক নিয়োগটাই যথাযথ পদ্ধতিতে হয়নি। তাঁকেই আবার কৌশলে ভারপ্রাপ্ত এমডি করা হয়েছিল। এমনভাবে সিন্ডিকেট করে বসেছিল যে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরও তাঁকে সরাতে গিয়ে এক প্রকার যুদ্ধ করতে হয়েছে।’

চাকরিজীবনের শুরুতেই আমিনুল বিতর্কে জড়ান। ২০০৪ সালে দিনাজপুরে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা পদে থাকাকালে দুর্নীতি ধরা পড়ায় আমিনুল সাজাপ্রাপ্ত হন। এরপর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত এবং পদাবনতি করে সিনিয়র শাখা ম্যানেজার করা হয়। কয়েক বছর পর রহস্যজনকভাবে পরিস্থিতি অনুকূলে নিয়ে তরতর করে তিনি অনেক ওপরে উঠে যান। ২০১২ সালে তিনি উপপরিচালক পদে উত্তীর্ণ হন। পরের বছরই যুগ্ম পরিচালক এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালক পদে প্রমোশন পান।

অভিযোগ উঠেছে, ভারপ্রাপ্ত এমডি থাকাকালে পাঁচটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন আমিনুল। রাজধানীর মিরপুরের একটি ব্যাংক শাখার মাধ্যমে যথাক্রমে ১৮ কোটি ৫৪ লাখ ৬৪ এবং এক কোটি চার লাখ ৫৭ হাজার টাকা তিনি উত্তোলন করেন। একইভাবে দিনাজপুরে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে তুলেছেন যথাক্রমে ৫২ লাখ ২৭ হাজার ৮৮১, দুই কোটি ৫৩ লাখ ৯৭ হাজার এবং এক কোটি ২২ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

কথা ছিল হাজামাজা পুকুর পুনঃ খনন প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পাট পচানো ও মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হবে। আমিনুল প্রকল্প পরিচালক হিসেবে গাড়ি, মোটরবাইক, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মুদ্রণসামগ্রীসহ এক কোটি ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ৫২২ টাকার মালামাল ক্রয় করে আর্থিক সুবিধা নেন। এই আপত্তিকৃত টাকা পিডিবিএফ তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।

এসব বিষয়ে আমিনুলের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি।

দুর্নীতির মনারুল পর্ব : বর্তমানে পিডিবিএফের যুগ্ম পরিচালক (সংযুক্ত) মনারুল ইসলাম ৩৮৬ কোটি টাকার তিনটি প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। এগুলো হচ্ছে—পিডিবিএফ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আইসিটি কার্যক্রম ও ই-সেবা শক্তিশালীকরণ এবং প্রত্যন্ত এলাকায় সৌর শক্তির উন্নয়ন। প্রকল্প তিনটিতে শুধু প্রশিক্ষণ খাতেই প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এক কোটি টাকায় কেনা হয় মাইক্রোফিন ৩৬০ সফটওয়্যার। জানা যায়, নাটোরে তিনি পাঁচতলা বাড়ি করেছেন, জমি কিনেছেন ৩০ শতক। সিংড়া উপজেলায় নিজের ও স্ত্রীর নামে প্রায় ২০ একর জমি, ঢাকার সাভারের মজিদপুর মৌজায় ১৫ শতক জমিসহ ৯ তলা ভবন ও বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা এফডিআর ও জমার তথ্যও পেয়েছে ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের তত্কালীন অতিরিক্ত সচিব আফজাল হোসেনকে (বর্তমানে সচিব ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়) প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ছয়টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মনারুলের নিকটাত্মীয় ও পিডিবিএফ কর্মীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় কয়েক কোটি টাকা নেওয়ার তথ্য মেলে। কমিটি ছয়টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা গ্রহণের প্রমাণ পায়। এরপর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ৫ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠি দেয়। ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা ও হিসাব নম্বর উল্লেখ করে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়, নগদ ও ট্রান্সফারের মাধ্যমে পিডিবিএফের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দুদক ও সিআইডিকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কপি পাঠায়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মনারুল নাটোরে তাঁর খালাতো ভাই মুদি দোকানদার কে এম আসাদুজ্জামানের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে এক কোটি ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। পিডিবিএফের তিনটি প্রকল্প এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে বেশির ভাগ লেনদেন হয়েছে ট্রান্সফারের মাধ্যমে। তদন্ত কমিটি শনাক্ত করেছে, পিডিবিএফের ঠিকানা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে প্রেরিত হলেও জমা স্লিপগুলোর অনেকগুলোতেই মোবাইল নম্বর এবং স্বাক্ষর একই ব্যক্তির। মনারুল কোনো কোনোটিতে নিজের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে অর্থ প্রেরণ করেছেন। তিনি নিজের ব্যাংক হিসাবেও (০১২৩০৩৩০০৯১৩৪) পিডিবিএফের হিসাব থেকে অনেক টাকা জমা করেছেন। এর মধ্যে নিজ হাতে ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা জমা করেন।

জানা যায়, দুদক তদন্তের জন্য দুই কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে। মনারুলের তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন মৃধা। আমিনুলের তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী পরিচালক সুমিত্রা সেন। সুমিত্রা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হওয়ার পরপরই লকডাউন হয়ে যায়, সেভাবে কাজ শুরু করতে পারিনি। এখন অফিস খুলেছে কাজ শুরু করেছি, বলতে গেলে প্রাথমিক ধাপেই আছি।’

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মো. রেজাউল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর কমিটি করা হয়েছিল, তাদের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটি এখন বোর্ডে তোলা হবে। এত দুর্নীতির পরও কেন ব্যবস্থা নিতে দেরি হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আমরা বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছি; করোনার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।’

জানা যায়,  দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল আমিনুল ও মনারুলকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরের দিনই কোনো মহলের চাপে আদেশটি প্রত্যাহার করা হয়।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘আমিনুলকে সাবেক সচিব মালেক সাহেব পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উনি পিডিবিএফে পকেট কমিটি করে রেখে গেছেন। আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলে বোর্ডে তাঁরা বিরোধিতা করেন। তবে এখনকার সচিব এবং পিডিবিএফের বর্তমান এমডি ভালো মানুষ, আর পার পাবেন না। সামনে বোর্ডসভায় উঠবে, একটা ব্যবস্থা হবে। শুনেছি তাঁর লোকজন রক্ষার চেষ্টা করতে পারে, হয়তো সময় লাগতে পারে তবে ফেরার কোনো রাস্তা নেই।’



সাতদিনের সেরা