kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

চার বছর পর সিআইডি বের করল হত্যারহস্য

মনজিল হত্যা : খুন করে নিহতের পোশাক পরে পালিয়ে যায় খুনিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জুন, ২০২১ ২০:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মনজিল হত্যা : খুন করে নিহতের পোশাক পরে পালিয়ে যায় খুনিরা

একেএম মনজিল হক

২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রাজধানীর আফতাবনগর এলাকায় খুন হন এ কে এম মনজিল হক (২৮) নামের এক যুবক।  খুনের পর তাঁর চাচা ফারুক মিয়া বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নামে মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে উঠে আসে, সম্পত্তির লোভে মনজিলকে খুন করা হয়। মনজিল হক হত্যাকাণ্ডের ‘মূল হোতা’ হলেন তাঁর সৎভাই ইয়াসিন হক (২৫) ও সৎমা লায়লা হাসান। ইয়াসিন হক ও ভাড়াটে খুনিরা হত্যা করান মনজিল হককে। গত শনিবার রাজধানীর জুরাইন এলাকা থেকে ভাড়াটে খুনি সীমান্ত হাসান তাকবীরকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।

সিআইডি সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এ খুনের বিষয়ে বিস্তারিত সাংবাদিকদের জানানো হয়। বলা হয়, খুনিরা ফুটপাত থেকে খুনের কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি ধারালো চাকু, পাটের রশি এবং এগুলো বহনের জন্য একটি রেকসিনের ব্যাগ কিনে আনে। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চাকু, রেকসিনের ব্যাগ ও রশি এবং খুনিদের ফেলে যাওয়া রক্তমাখা কাপড়-চোপড় সিআইডি ডিএনএ ল্যাবের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তাতে ৫ জন পুরুষ ব্যক্তির উপস্থিতি পাওয়া যায়। মনজিলকে খুন করার পর খুনি ইয়াসিন হক তার রক্তমাখা কাপড়-চোপড় আফতাবনগরের খালে ফেলে দেয়। ভাড়াটে খুনিরা তাদের রক্তমাখা কাপড়-চোপড় ঘটনাস্থলে ফেলে তারা মনজিল হকের ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় পরে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মনজিল হক ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর খুন হন। এর মাত্র ছয় মাস আগে তাঁর ব্যবসায়ী বাবা এ কে এম মইনুল হক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মনজিলের বয়স যখন তিন বছর, তখন তাঁর মা মারা যান। এরপর তাঁর বাবা আবার বিয়েও করেন। সেই ঘরে ইয়াসিন হকের জন্ম হয়।

২০১৮ সালের ২৪ মার্চ মামলাটি সিআইডি তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালে মামলার বাদী প্রথম থেকেই তদন্তে অসহযোগিতা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রভাবিত করে আসছিলেন। মনজিল হকের সৎ ভাই এ কে এম ইয়াছিন হক ঘটনার তারিখ সকাল হতে নিখোঁজ হন। এ বিষয়ে ইয়াছিন হকের মামা আবু ইউসুফ নয়ন ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। নিখোঁজ এ কে এম ইয়াসিন হকের সন্ধান না পাওয়ায় এ কে এম মনজিল হক খুন হওয়ার কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অজ্ঞাতনামা খুনিরা নিখোঁজ ইয়াছিন হক-কে অপহরণপূর্বক খুন করে লাশ গুম করেছে মর্মে বাদী মিথ্যা তথ্য দিয়ে সিআইডিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।

বিশ্বস্ত গুপ্তচরের মাধ্যমে জানা যায় যে, নিখোঁজ ইয়াছিন হক প্রকৃত নাম গোপন করে ছদ্মনাম ব্যবহার করে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় দৈনিক জাগরণী পত্রিকার জেলা রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছে। সে সূত্র ধরে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করে চট্টগ্রাম মহানগরীর শেরশাহ কলোনি এলাকা থেকে গত ১৩ মার্চ  গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে ভাড়াটে খুনি রবিউল ইসলাম সিয়াম-কে ঢাকার কোনাপাড়া এলাকা থেকে পরদিন গ্রেফতার করা হয়।

আসামি ইয়াসিন হক পৈতৃক সম্পত্তির লোভে ভাড়াটে ৩ খুনির সহযোগিতায় মনজিল হককে খুন করেছে বলে  আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ভাড়াটে খুনি রবিউল ইসলাম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর খুনি মাহফুজুল ইসলাম রাকিব-কে গত ৮ এপ্রিল ঢাকার ডেমরা এলাকা হতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে সিআইডি জানতে পারে আরেক খুনি সীমান্ত হাসান তাকবীরের নাম। গত শনিবার  রাতে জুরাইন রেলগেট এলাকা থেকে সীমান্ত হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সীমান্ত হাসান তাকবীর মনজিল হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল এবং নিজের দোষ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় বিজ্ঞ আদালতে জবানবন্দী প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তাকবীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, মনজিল হককে ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করে, পেটে স্ট্যাব করে এবং দুই হাতের রগ ও পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। ঘটনার আগের দিন ভাড়াটে ৩ খুনি ইয়াসিন হকের বনশ্রীর পৈত্রিক ফ্ল্যাটে রাতে থাকেন। ইয়াসিন হকের মা লায়লা ইয়াসমিন লিপি, মামলার বাদী ফারুক মিয়া ও ইয়াসিন হকের মামা আবু ইউসুফ নয়ন ভাড়াটে খুনীদের সরদার রবিউল ইসলাম সিয়াম-কে নিয়ে গোপন বৈঠক করেন এবং বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করে খুন করার পর ৫ লাখ টাকা প্রদানের প্রলোভন দেখান। ভাড়াটে খুনি রবিউল ইসলাম সিয়াম, মাহফুজুল ইসলাম রাকিব ও সীমান্ত হাসান তাকবির-দের সহযোগিতায় পৈত্রিক সম্পত্তির লোভে ইয়াসিন হক, তার মা লায়লা ইয়াসমিন লিপি, মামা আবু ইউসুফ নয়ন এবং মামলার বাদী ফারুক মিয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায় মনজিল হক-কে খুন করেছে বলে তদন্তকালে জানা যায়।

সিআইডি আরো জানায়, ঘটনার আগে ইয়াসিন হক তার মামা আবু ইউসুফ নয়নের সাথে মনজিল হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করলে আবু ইউসুফ নয়ন তাতে সম্মতি প্রকাশ করে এবং খুনের কাজে ব্যয় করার জন্য তাকে নগদ ২০ হাজার টাকা দেয়।  ওই টাকা দিয়ে ইয়াসিন ভাড়াটে খুনিদের সরদার রবিউল ইসলাম সিয়াম-কে নিয়ে ঘটনার ৮/১০ দিন আগে নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকে খুনের কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি ধারালো চাকু, পাটের রশি এবং এগুলো বহনের জন্য একটি রেকসিনের ব্যাগ কিনে আনে।



সাতদিনের সেরা