kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

সিপিডির সংলাপে বক্তারা

বাজেটে জীবন-জীবিকা গুরুত্ব পায়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জুন, ২০২১ ০৩:১৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাজেটে জীবন-জীবিকা গুরুত্ব পায়নি

করোনার কারণে জীবন-জীবিকা হুমকিতে। এ বছরের বাজেটটি ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকার বাজেট। কিন্তু বাজেটে জীবন-জীবিকা গুরুত্ব পায়নি। বাজেট নিয়ে এবার সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করোনায় দারিদ্র্য পরিস্থিতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতি নিয়ে পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা নেই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট নিয়ে ভার্চুয়াল সংলাপে গতকাল শনিবার বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সময় করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের খেলাপি না করার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। তাঁরা আরো বলেন, প্রস্তাবিত অগ্রিম আয়কর কার্যকর হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সিপিডির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান সাবের হোসেন চৌধুরী, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রাটা বড় নয়। তবে ব্যয় করার সক্ষমতা এবং গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বছরের সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। সিপিডি মনে করছে, বাস্তবে দুই লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হবে। অন্যদিকে এবার বিভিন্ন খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই করছাড় ইতিবাচক। এতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে। কিন্তু এই পরিমাণ করছাড়ের পর আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। এ ছাড়া এক লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫২.৮ শতাংশ অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের অনুমিতি দুর্বল। কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি তিনটি।

গার্মেন্ট, রেমিট্যান্স ও কৃষি। কিন্তু বাজেটে খাতগুলো তত গুরুত্ব পায়নি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদেশি উৎস নজর বাড়াতে অনেকে পরামর্শ দিচ্ছেন; কিন্তু বিদেশি উৎসর পক্ষে আমি নই। সব সময় দেশকে ভালোবেসেছি। দেশের সমস্যা দেশেই সমাধান করব। যদি দেশের সব উৎস ব্যবহারের পরও ঘাটতি থাকে, তবে কেবল বিদেশে নজর দেওয়া যেতে পারে। বিদেশি ঋণ সস্তার হলেও অনেক জটিলতা আছে।’

প্রবাসী আয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যারা রেমিট্যান্স পাঠায়, তাদের সবাইকে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে কার কী অবদান, সেটা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রবাসীদের সমস্যার ৮০ শতাংশই আমাদের আওতার বাইরে। প্রবাসীদের জন্য অনেক করেছি, এখনো করছি। এমনকি তাদের জন্য একটা মন্ত্রণালয়ও সৃষ্টি করা হয়েছে।’ বিবিএস বা বিআইডিএসের তথ্যবিভ্রাটের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন এবং পুরনো দরিদ্র নিয়ে গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যেও মিল নেই। একেক সংস্থা একেক তথ্য দিচ্ছে। সিপিডি বলছে, ৩৫ শতাংশ দরিদ্র। অন্য সংস্থাগুলো দিচ্ছে আবার ভিন্ন তথ্য। অর্থাৎ বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এর পরও বিবিএসকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে।

বাজেট নিয়ে সংসদীয় কমিটির পরামর্শ নেওয়া হয়নি মন্তব্য করে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট নিয়ে বাংলাদেশের সংসদে খুব বেশি আলোচনা হয় না। এর আগে বিষয়টি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হতো। আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি সংসদীয় কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আসতেন। এরপর আমাদের আলোচনাগুলো তিনি নিজে নোট করে নিতেন; কিন্তু এবার সেটিও হয়নি। অর্থাৎ বাজেটের বিষয়টি কোনো কমিটিতেই আলোচনায় আসেনি। যদি এভাবে হয়, সরকার যা বলবে সংসদ সদস্যরা সেটি পাস করে দেবেন, তাহলে সংসদে যাওয়ার মানে হয় না। বাজেট ঘোষণার পরপরই সরকারি দলও অভিনন্দন জানায় আর সংসদ সদস্যরাও নিয়ম রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। এ অবস্থা থেকে বেড়িয়ে এসে বাজেট নিয়ে সংসদে কার্যকর আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।’

বিরোধী দলের উদ্দেশে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, শুধু বিরোধিতার জন্য নয়, গঠনমূলক আলোচনা করুন। কারণ সব সময় আপনারা বিরোধী দলে থাকবেন না। সরকারের সমালোচনা করেন; কিন্তু রাষ্ট্রের সমালোচনা নয়। প্রয়োজনে আপনারা আলাদা বাজেট ঘোষণা করেন।

বাজেট পরিসংখ্যান নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজেট পরিসংখ্যানে সমস্যা রয়েছে। কারণ বাজেটে আমরা এক ধরনের পরিসংখ্যান দেখছি। আবার এখানে এসে দেখছি ভিন্ন চিত্র। বিবিএস ও বিআইডিএস ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান ব্যবহার করছে। কিন্তু ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান দিয়ে ২০২১ সাল চলবে না। এ জন্য দুটি সংস্থার দক্ষতা বাড়িয়ে পরিসংখ্যান হালনাগাদ করতে হবে। পরিসংখ্যান সঠিক না হলে সিদ্ধান্তও সঠিক হবে না।’

ড. রেহমান সোবহান বলেন, বাজেট নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয় না। এটি দুঃখজনক। বাজেট কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, এর গুণগত মান নিয়ে সঠিক মূল্যায়ন নেই। বাজেট বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স হতে পারে। করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তারা কাজ করবে।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, করোনার কারণে জীবন-জীবিকা হুমকিতে। তাই এ বছরের বাজেটটি ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকার বাজেট। কিন্তু বাজেটে জীবন-জীবিকা গুরুত্ব পায়নি। গত বছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৯ শতাংশ। এবারও বরাদ্দ একই রকম রয়েছে। করোনার টিকার জন্য কোথাও বরাদ্দের কথা বলা হয়নি। সামাজিক সুরক্ষায় এক লাখ সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে পেনশন ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাদ দিলে নিম্ন আয়ের মানুষ মাত্র সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা পাবে।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘করোনার প্রথম আঘাত এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কেউ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে খেলাপি করা যাবে না। এ সুবিধা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো উচিত। তিনি বলেন, বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের দাবি ছিল ব্যবসায়ীদের। অথচ বাজেটে সে হার তো প্রত্যাহার করা হয়ইনি, উল্টো সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত আরোপ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রস্তাবিত অগ্রিম আয়কর কার্যকর হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় বাড়বে বহুগুণ। তাই অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জন্য আবারও অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে ভ্যাটের আগাম কর ৪ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে, এটিও সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে শুল্ক ও কর কাঠামো সংস্কার করে একটি জনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং উৎপাদনশীল রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। দুর্নীতি-অপচয় বন্ধ করতে হবে। এ সব কিছুর প্রতিশ্রুতি প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। বাজেট যত বড়ই হোক, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও জবাবদিহি না থাকলে সে বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি নিহাদ কবির বলেন, বাজেটের সুফল পেতে হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটে বড় ব্যবসায়ীদের কিছু দেওয়া হয়নি, বরং তাঁদের থেকে যা নেওয়া হবে, তার থেকে কিছুটা কমানো হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিলে হবে না, নীতি প্রণোদনাও দিতে হবে। আয়করের আওতা বাড়াতে হবে। করপোরেট ট্যাক্স পর্যায়ক্রমে ২০ থেকে ২২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। কর প্রশাসনের সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে অটোমেশন করা খুবই জরুরি।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংগঠন নাসিবের প্রেসিডেন্ট মির্জা নুরুল গনি শোভন বলেন, ‘ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ৭২ শতাংশ বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও পেয়েছি মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। বাকি টাকা কোথায় গেল, তদন্ত হওয়া উচিত। ব্যাংকের পরিচালকরা ছোট উদ্যোক্তাবান্ধব নয়, তারা ঋণ দিতে চায় না। তাই পরিচালক নিয়োগে আলাদা কমিশন গঠন করতে হবে।’

বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে কর আদায় বাড়বে। এ ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে এ খাতে যারা বিনিয়োগ করবে, তাদের পাঁচ বছরের কর অব্যাহতি দেওয়া উচিত।



সাতদিনের সেরা