kalerkantho

শনিবার । ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১২ জুন ২০২১। ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

মনোযোগ দরকার পিছিয়ে পড়া মানুষ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   

১২ জুন, ২০২১ ০৩:৫৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মনোযোগ দরকার পিছিয়ে পড়া মানুষ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে

সম্প্রতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটির বেশি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে। এটাকে এক অর্থে বিশাল বাজেট বলব না। বাজেটে দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বড় ঘাটতি রয়েছে, যা জিডিপির ৬.২ শতাংশ। এই ঘাটতি কোনো সমস্যা নয়; যদি ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থাগুলো ঠিকঠাকভাবে করা হয়। এবারের বাজেটের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা কেউ কেউ বাজেটকে খুব আশা-জাগানিয়া, কেউ খুব বাস্তবভিত্তিক বলেছেন। এমনকি অর্থমন্ত্রীও বলছেন, বাজেট ব্যবসা ও জনবান্ধব। আবার অনেক অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ রয়েছেন, যাঁদের কাছে প্রস্তাবিত বাজেটটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের বক্তব্য হলো, এই বাজেটে জীবন ও জীবিকার সমন্বয় নেই, জনবান্ধব ও দরিদ্রবান্ধব নয়। তাঁদের কারো কারো বক্তব্য, বাজেটে দরিদ্ররা আড়ালে চলে গেছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে আমলে নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ বাজেট সম্পর্কে একেবারে বিপরীতধর্মী বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে। এক ধরনের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বাজেটের সম্ভাবনার জায়গা বা সমস্যার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। অনেকেই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণযোগ্য অনেক সুপারিশ করেছেন।

অর্থমন্ত্রী এবার ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা অন্তত গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। বাজেটে তাঁর এই প্রচেষ্টা বা পদক্ষেপটা লক্ষণীয়। আবার এটাও মনে রাখা দরকার, বাজেট একটা সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবরণীয়ও বটে। ফলে রুটিনমাফিক কিছু গতানুতিক হিসাব এখানে থাকবেই। তবে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ কভিড-১৯ মহামারির কারণে যেভাবে পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সেই বিবেচনায় এবারের বাজেট আরেকটু ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ হওয়া দরকার ছিল।

একটি দেশের জাতীয় বাজেট কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাজেটের মতো নয়। সরকারি বাজেটে সরকারি নীতি, কৌশল ও বাস্তবায়নের বিষয়গুলো থাকতে হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এবারের বাজেটে নীতি, কৌশল ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাজেটে অনেক কথাবার্তা বলা আছে। পূর্ব ইতিহাস ও অর্জন—এসব আছে। কিন্তু একেবারে আসল যে তিনটা জিনিস থাকা দরকার সেদিকে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ নীতি, কৌশল ও বাস্তবায়ন, তা আরো স্পষ্ট করা দরকার ছিল। এ ছাড়া বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত ছিল। লোকজনের মতামত নিতে গিয়ে সরকার গুটিকয়েক গোষ্ঠীর সঙ্গে বসেছে। কিন্তু ব্যাপকভাবে তেমন আলোচনা হয়নি। যেটুকুই আলোচনা হয়েছে, তার প্রতিফলন বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ভেতরেও সম্ভাব্য বাজেট নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হতে এখনো শোনা যায়নি।

বাজেটে ইস্যুভিত্তিক গুরুত্ব যেমন দিতে হয়, তেমনি অঞ্চলভিত্তিক চাহিদার গুরুত্বটাও বিবেচনা করা উচিত। ঢাকায় সুউচ্চ টাওয়ারে বসে বাজেট প্রণয়ন করলেই হয়ে যায় না। জনগণ এবং তাদের অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন চাহিদার প্রতিও মনোযোগ দিতে হয়। এই মুহূর্তে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর যে চাহিদা, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর চাহিদা ভিন্ন। কোনো অঞ্চলে স্কুল বেশি দরকার, কোথাও কর্মসংস্থান বেশি দরকার, শিল্পায়ন বেশি দরকার, কোনো এলাকায় স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট—এ ধরনের অঞ্চলভিত্তিক চাহিদার প্রতিফলনগুলো বাজেটে অতীতে দেখা যায়নি, এবারও দেখা গেল না। দুঃখজনক বিষয় হলো, বাজেট প্রস্তাবের পর আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যে পরিমাণ পরিমার্জন বা সংশোধন আনা দরকার, সেটাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয় না। তাই আমি মনে করি, বাজেট প্রণয়ন, বাজেট পেশ ও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াগুলোতে অনেক দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশের মতো দেশে এটা হওয়া ঠিক নয়।

জাতীয় বাজেট সমতাভিত্তিক হতে হয়, জনবান্ধব হতে হয়, বিদ্যমান উন্নয়ননীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হয়। বাজেট অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নেরও একটা হাতিয়ার। এই আঙ্গিকে বিচার করলে এবারের বাজেট সমতাভিত্তিক হয়েছে কি না, অর্থনৈতিক ঝুঁকি দূর করা বা স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য কিছু করা হয়েছে কি না তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।

বাজেটকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করলে এটা মনে রাখতে হবে, এক বছরেই সব কিছু সম্ভব নয়। বাজেটে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন থাকবে, ভিশন-২০৪১, ডেল্টা পরিকল্পনা—এসব পরিকল্পনার প্রতিফলন বাজেটে থাকতে হয়। সংকলিত গ্রন্থে যেমন একটি প্রবন্ধের সঙ্গে আরেকটা প্রবন্ধের গভীর যোগসূত্র থাকতে হবে—বাজেটে এমনটা হলে চলে না। এক বছরে যেহেতু সব কিছু করা যায় না, তাই মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর প্রতিফলন বাজেটে থাকতে হয়। এ জন্য বাজেটের নীতি ও কৌশলগুলো তথ্য-উপাত্তভিত্তিক ও বিশ্লেষণভিত্তিক হতে হবে। এবারের বাজেটে চলমান বিশেষ পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে করা একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল, যেটা পূর্ণাঙ্গভাবে করা হয়নি।

আরেকটি বিষয় এবারের বাজেটে নেই। খাতওয়ারি যে বরাদ্দগুলো দেওয়া হয়েছে সেটা দক্ষতা ও পারফরম্যান্সভিত্তিক হয়েছে সেটাও বলার সুযোগ নেই। যেমন স্বাস্থ্য খাতের বিষয়টি দেখুন। এখানে ৩২ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিদায়ি অর্থবছরেও স্বাস্থ্য খাত তার বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি খরচ করতে পারেনি। এবারও ১০০ কোটি টাকা স্বাস্থ্য গবেষণার জন্য দেওয়া হয়েছে। বিদায়ি অর্থবছরেও তারা এই টাকা খরচ করতে পারেনি। শিক্ষা ও কৃষিতেও একই উদাহরণ দেওয়া যায়। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষতা ও সক্ষমতাটা বৃদ্ধি। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। সক্ষমতা বলতে আমি সরকারি আমলা ও প্রতিষ্ঠান, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার কথা বলছি। এই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। না হলে কিন্তু বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

এবারের বাজেটকে বিচার করা উচিত কভিড-১৯ উত্তরণের ব্যাপারে এতে সুনির্দিষ্টভাবে কী বলা আছে। স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে আছে, ছোট শিল্প ও ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান—এসবের জন্য কী করা হলো সেসব দেখা দরকার। এসব খুবই বাস্তবভিত্তিক ইস্যু এবং এগুলো মানুষকে খুব স্পর্শ করে। স্বাস্থ্য খাতকে কিভাবে উন্নত করব, স্বাস্থ্য খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করে আরো কিভাবে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা যায়—এগুলো নিয়ে দিকনির্দেশনা থাকা দরকার ছিল।

দেশে দুই কোটির বেশি লোক দরিদ্র হয়ে গেছে। সম্প্রতি দেখলাম কিছু ব্যক্তি বলছেন, ‘এই দারিদ্র্যের হার এমনিতেই কমে যাবে, তাদের নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু নেই, তারা জানে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়, ওরা নিজেরা খুবই কর্মঠ। অন্তত আরো দুই দশক অপেক্ষা করুন, প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি হলে দারিদ্র্য আস্তে আস্তে চলে যাবে।’ এসব কথা বলে অদ্ভুত সব যুক্তি খাড়া করেন কিছু ব্যক্তি। এটা কী রকম দর্শন? আমি অবাক কয়েকজনের এ রকম যুক্তি দেখে। তাঁরা প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গে বলেন, এখনই প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বণ্টনের সময় আসেনি। অর্থাৎ সেই পুরনো ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব (ট্রিকেল ডাউন ফর্মুলা)’ নিয়েই তাঁরা থাকতে চান। এই তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এবারের বাজেট গ্রোথ ওরিয়েন্টেড (প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক) হয়েছে। এতে বড় শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটবে। মানে সব কিছুই হবে গ্রোথ ওরিয়েন্টেড। অর্থাৎ সুষম বণ্টন বা ইকোয়ালিটি আনার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হলেই হলো, সুষম বণ্টনের সময় এখন না।

এবারের বাজেটে কর্মসংস্থানের জন্য কী করা হলো? কর্মসংস্থানের জন্য বড় শিল্পের দিকেই ঝোঁকটা দেখা গেল। কিন্তু এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। এসব শিল্পকে একেবারে শ্রমঘন বলা যাবে না। আমাদের শ্রমনিবিড় শিল্প হলো ছোট শিল্প, কুটির শিল্প, মাঝারি শিল্প বা কৃষি। এগুলোর একটি বড় অংশই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাত। এ খাত নিয়ে কিছুই বলা হয়নি বাজেটে। ফুটপাতে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ছোট ছোট ওয়ার্কশপ—এসব অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের ৮০-৮৫ শতাংশ লোক জড়িত। এসব খাতের জন্য বাজেটে কোনো বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি। এটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হয়েছে আমার কাছে। কারণ অর্থনীতিতে তাদেরও বিরাট অবদান রয়েছে।

পরিশেষে একটা প্রশ্ন রাখব, অর্থনৈতিক উন্নয়নই কি সব? অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক উন্নয়ন, সুশাসন, স্বাধীনতা—এসব ব্যাপারেও যথেষ্ট প্রয়াস দরকার। এগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ক্ষেত্রে মানুষের অংশগ্রহণ, তাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে এটা উপলব্ধি করতে হবে। আমরা একই সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছি কি না সেটা প্রশ্ন। কভিড যখন চূড়ায় ওঠে, তখন ‘ট্রাইয়েজ ফর্মুলা’র কথা বেশ বলা হয়েছিল—যাতে খুব সিরিয়াস রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা দেওয়া যায়। এই ফর্মুলা ধার করে আমরা যদি পিছিয়ে পড়া মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখি, তাহলে ভালো কিছু পাব না। আর শেষ কথা হলো, বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আমলাদের কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করতে হবে। জীবন ও জীবিকার সমন্বয়কে আরো সুসংহত করতে হবে। এ জন্য জনবান্ধব ও সমতাভিত্তিক বাজেট উন্নয়নের শর্ত।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা