kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

স্বপ্নের যাত্রা দুঃস্বপ্নে শেষ

ফাতিমা তুজ জোহরা   

১১ জুন, ২০২১ ০২:০৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বপ্নের যাত্রা দুঃস্বপ্নে শেষ

কত শত বাধা অতিক্রম করে কত শত স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান এই দেশের নারী কর্মীরা। কিন্তু বেশির ভাগ নারীই দেশে ফেরেন দুঃস্বপ্নের ক্ষত নিয়ে। সেই ক্ষত শারীরিকও; মানসিকও। এই নির্যাতনের দায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যেমন আছে, তেমনি দায় এড়াতে পারে না নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও। গাছাড়া ভাব আছে বাংলাদেশ সরকারেরও।

সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নারী কর্মীদের একজন তানিয়া আক্তার (আসল নাম নয়)। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলত না। তাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০১৮ সালে এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব পাড়ি জমান তিনি। রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি তাঁকে পরিচারিকা হিসেবে একটি বাসায় নিয়ে যান। ওই বাসায় থাকা অবস্থায় তানিয়া স্বামী রাসেলকে ফোনে যৌন নির্যাতনের কথা জানান। বিষয়টি রাসেল পরে রিক্রুটিং এজেন্সিকে জানালেও কোনো লাভ হয়নি। তানিয়ার ওপর চলা যৌন নির্যাতনের একটি ফোন রেকর্ড রাসেল রেখে দেন। তানিয়া কাজ না করায় রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিও তাঁর ওপর নির্যাতন চালান। একপর্যায়ে তাঁরা তানিয়ার পা ভেঙে ফেলেন।

kalerkanthoবাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র (বিএনএসকে) জানায়, গত ২৩ মে সৌদি আরব থেকে তিন নারী কর্মী দেশে ফেরেন। তিনজনই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এপ্রিলে বিদেশফেরত ২৮ নারীর মধ্যে ২৫ জনই নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য, গত বছর ২১ দেশ থেকে ৪৯ হাজার ৯২৪ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন।

করোনাকালে বিদেশফেরত ৩০০ নারী কর্মীর ওপর একটি জরিপ চালায় বিএনএসকে। তাতে দেখা যায়, বিদেশফেরত ৬০ শতাংশ নারী কর্মী নির্ধারিত বেতন পাননি। নিপীড়নের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭০ শতাংশ নারী।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের বেশির ভাগই অভিযোগ করেছেন যে সেখানে তাঁরা নিয়োগ কর্তা এবং মকতবের (সৌদি আরবের রিক্রুটিং এজেন্সি) প্রতিনিধিদের দ্বারা নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া এবং চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়ার মতো বহু অভিযোগ তাঁরা করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহকর্মী নিয়োগের কথা বলে তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে যৌনকর্মী হিসেবে। তাঁরা সেখানে গিয়ে কী কাজ করছেন, কেমন আছেন, তার দেখভালও সরকার করে না। নিপীড়নের শিকার হলে স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে যোগাযোগ করার কথা কর্তৃপক্ষ বলছে। কিন্তু তাঁদের যেখানে মোবাইল ফোনই ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, সেখানে তাঁরা কিভাবে অভিযোগ করবেন? নির্যাতন সহ্য করে বন্দি জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাঁদের। যাঁরা ফিরে আসছেন, তাঁরা নিজেরাই এর সাক্ষী। অনেকে আরো খারাপ অবস্থায় আছেন। বিশেষ করে এজেন্সি থেকে সহযোগিতা না পেয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগও আছে।

১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৯ লাখ ২৪ হাজার ৪১৫ নারী কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৯ সালেই গেছেন এক লাখ চার হাজার ৭৮৬ জন। মূলত ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারীকর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হলে বিপুলসংখ্যক নারী বিদেশে যাওয়া শুরু করেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে গেছেন তিন লাখ ৫৩ হাজার ৭৫৫ জন নারী, যা মোট নারী অভিবাসনের ৩৮.২৭ শতাংশ। এ ছাড়া জর্ডানে এক লাখ ৬২ হাজার ২৮৭, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৭৫, লেবাননে এক লাখ সাত হাজার ২১৬, ওমানে ৯১ হাজার ২২০, কাতারে ৩৩ হাজার ৫৬৮, মরিশাসে ১৮ হাজার ৩৩৮, কুয়েতে ৯ হাজার ১২০, মালয়েশিয়ায় ছয় হাজার ৬৫২ এবং বাহরাইনে চার হাজার ২৯০ জন নারী কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন।

বিদেশে নারী নিপীড়নের বিষয়টি উঠে এসেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনেও। সৌদি আরবফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে কমিটি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট একটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এবং ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে একাধিক বাড়িতে কাজ করানো, ছুটি না দেওয়া কিংবা অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেওয়ার মতো কারণ রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেরত আসা নারীকর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন না। এ ছাড়া অন্তত ২৩ জনকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না।

বিএনএসকের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “যেসব কর্মী যাবেন, বিদেশে আছেন কিংবা ফিরে আসছেন, তাঁদের জন্য ‘সাপোর্ট সার্ভিসিং মেকানিজম’ (সেবা) শক্তিশালী করতে হবে। গত ২৩ মে জর্ডানফেরত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক নারীকর্মীকে বেতন না দিয়েই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। দেশে ফিরে আশা বাকিদের অবস্থাও করুণ। সব হারিয়ে দেশে ফিরে স্বামী দ্বারা নির্যাতন, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে তাঁদের।”

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাফরিজা শ্যামা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্যাতনের অভিযোগ পেলে আমরা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত নিয়ে আসার চেষ্টা করি। তবে অনেক সময় দেখা গেছে, বিদেশে গিয়ে তাঁদের ভালো লাগে না বা স্বামী জোর করেন ফিরে আসতে। তখন নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগও করেন অনেকে। এতে অনেক সময় সত্যিই যাঁরা নির্যাতিত হচ্ছেন, তাঁদের আনতে বেশি সময় লেগে যায়। নির্যাতিতদের আনতে রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রয়োজনে বারবার আমরা চাপ দিই। আর বেতন থেকে যাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁরা দেশে এসে আবেদন করলে টাকা ফিরে পাচ্ছেন। আমরা ৭০ শতাংশ বেতন পরিশোধ করে দিচ্ছি।’



সাতদিনের সেরা