kalerkantho

শনিবার । ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১২ জুন ২০২১। ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

মোদি-মমতা একান্ত বৈঠক আশু প্রয়োজন

জয়ন্ত ঘোষাল   

৮ জুন, ২০২১ ০৪:২৪ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



মোদি-মমতা একান্ত বৈঠক আশু প্রয়োজন

অটল বিহারি বাজপেয়ী তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ছত্তিশগড়ের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজিত যোগী এসেছেন দিল্লিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে। কিন্তু অজিত যোগী বৈঠকের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাজ্যমন্ত্রী বিজয় গোয়েলকে বললেন, ‘আমি শুধু একা নই, আমার সঙ্গে সাত-আটজন বিধায়কও এসেছেন। তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন।’ বিজয় গোয়েল খুব খেপে গেলেন। বললেন, ‘এমনটা হয় না। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনি দেখা করছেন। প্রটোকল আছে, তাঁর কিছু নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন আছে। এসপিজির (স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ, যারা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা দেখভাল করে) ক্লিয়ারেন্স লাগে।’ অজিত যোগী তখন বললেন, ‘বেশ তবে! দেখা করতে যদি না-ই দেন, তাহলে আমরা কেউই দেখা করব না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ঘরের সামনে ধরনায় বসে যাব অনির্দিষ্টকালের জন্য।’ বিজয় গোয়েল তো অসন্তুষ্ট হয়ে আরো খেপে গেলেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব তখন শক্তি সিনহা, তাঁকে নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এ কেমন কথা! এটা কি শিষ্টাচার? এই কি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ঐতিহ্য? প্রধানমন্ত্রীকে অসম্মান করা হচ্ছে। বাজপেয়ী স্মিত হেসে তাঁদের বললেন, ‘আসতেই দাও না। কী আর সাংঘাতিক তফাত হবে যদি আরো ১০ জন আসে। অত্যন্ত ছোট একটা বিষয়কে অহেতুক বড় করে তোলা ঠিক না।’ তখন তাঁরা সবাই দেখা করলেন। রাজনৈতিক বিরোধে কোনো ইস্যু তৈরি হলো না।

আর আজ?

এখন আমরা করোনায় আক্রান্ত, ত্রস্ত, বিধ্বস্ত সময়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছি। মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে। এ রকম একটা অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিবাদ, মোদি ও মমতার বিবাদ কাঙ্ক্ষিত নয়।

কলাইকুণ্ডাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতার সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তুলকালাম হলো, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন বলির পাঁঠা। একজন সৎ, একনিষ্ঠ কর্মকর্তা যিনি, শুধু কৃতী ছাত্র নন, কৃতী সাংবাদিক, লেখক, আমলা। দীর্ঘ ক্যারিয়ার জীবনে তাঁর সম্পর্কে মানুষ কখনো কোনো অভিযোগের তর্জনী তুলতে পারেনি। কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আসেনি। এমনকি অন্য অনেক আমলার তুলনায় তিনি ঠিক স্তাবক বলেও পরিচিত ছিলেন না। তা সত্ত্বেও আমরা সবাই দেখলাম তাঁকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে কী কাণ্ড হলো।

আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘটনা হয়তো একদিন অতীত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি মনে করি কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ মিটে গেছে, তা নয়। বিজেপি বনাম তৃণমূলের যে রাজনৈতিক লড়াই, তা নবান্নে এসে আছড়ে পড়ছে। প্রশাসনিকতা ও রাজনীতি—এই দুটি ভিন্ন বিষয়। আমলাতন্ত্র প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিষয়। মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গেরও প্রধানমন্ত্রী। কাজেই রাজ্যের এই করুণ পরিস্থিতিতে বারবার মনে হচ্ছে, মোদি ও মমতার নির্বাচনী রাজনৈতিক বিরোধের হ্যাংওভার কেন আমরা কাটিয়ে উঠতে পারছি না।

আজ সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, মোদি ও মমতার একটি একান্ত বৈঠক। সেই বৈঠকে কোনো ইগোর প্রশ্ন থাকবে না। মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান দিচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীকে সম্মান দিচ্ছেন। ভোটের সময় কে কী বলেছেন সেগুলো যদি মনে রাখতে হয়, তাহলে দেশ চালানো যায় না। রবীন্দ্রনাথ ‘চারিত্র-পূজা’য় বলেছেন, ‘ঈশ্বর দয়া করিয়া আমাদের বিস্মরণ শক্তি দিয়াছেন।’ ভোটের ফলাফল বেরোনোর আগ পর্যন্ত যে রাজনীতি হয়েছে, সে রাজনীতি ভুলে আমাদের এগোতে হবে। চাণক্যর বিখ্যাত শ্লোক ‘শক্তু ক্ষমা শ্লাঘনীয়া’। শক্তিমান পুরুষের ক্ষমাগুণ প্রশংসার যোগ্য। অপমান, রাগ ও ক্ষতি সহনের অন্য নাম ক্ষমা। শক্তিমানের ক্ষমা প্রশংসার্হ, দুর্বলের ক্ষমা দুর্বলতার পরিচায়ক হতে পারে। ত্যাগী মহাপুরুষদের ক্ষমাই তো বল। ক্ষমাগুণে তাঁরা সবাইকে বশীভূত করতে পারেন। আর ক্ষমাশীল যিনি, চাণক্য বলেছেন, তিনি সব কার্যসাধনে সমর্থ হন। কারণ ক্ষমাশক্তি মানুষকে বিবাদ থেকে বিরত করে। অন্যের ক্ষতিসাধনে পরাঙ্মুখ করে। ধর্মে ক্ষমাশীলতা অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজও ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জনপ্রিয়তা এই করোনার সময় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। আমেরিকার সংস্থা এবং ভারতীয় বেশ কয়েকটি সংস্থার সমীক্ষা থেকে এই একই রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং এটি সর্বজনগ্রাহ্য, সবার দ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে এই মুহূর্তে মোদির সর্বভারতীয় স্তরে কোনো রাজনৈতিক বিকল্প নেই। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের কী অবস্থা সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। রাহুল গান্ধী রাজনীতিতে আছেন, না নেই, তিনি দলের সভাপতি, না সভাপতি নন, আজও সেটা স্পষ্ট নয়। এবং গান্ধী পরিবার এখনো সেটা স্পষ্ট করতে খুব উদ্যত বলে মনে হচ্ছে না।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ঐক্য কী হবে? তা এখন বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন। ভারতের রাজনীতিতে এখন পর্যন্ত কোয়ালিশন সরকারের অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার কোয়ালিশন হওয়া সত্ত্বেও অবশ্য ১০ বছর চলেছে। কিন্তু সেই ১০ বছরে শরিক দলের সমর্থন প্রত্যাহার, নীতি পঙ্গুতা, নানা ধরনের দুর্নীতি কিভাবে গ্রাস করেছিল তৎকালীন সে সরকারকে, তা-ও আমরা দেখেছি। সে কারণেই নরেন্দ্র মোদি নামের একটা বিশাল দোর্দণ্ড প্রতাপ রাজশক্তির উত্থান হলো এ দেশে।

তাই যাঁরা মনে করছেন পশ্চিমবঙ্গে ২০০ আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতে গেছেন বলে তিনি এক্ষুনি হৈহৈ করে দিল্লিতে এসে সর্বভারতীয় স্তরে নরেন্দ্র মোদিকে সরাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন, আমার মনে হচ্ছে তাঁরাও মমতার প্রতি অবিচার করছেন। মমতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এতটা কম নয়। এ ব্যাপারে বিজেপির একটা রাজনৈতিক প্যানিক লক্ষ করা যাচ্ছে। বিজেপি মমতার এই সর্বভারতীয় রাজনীতিকে আটকানোর জন্য যেন আরো বেশি করে মমতা-ভূত দেখতে শুরু করেছে। মমতার কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে কভিড মোকাবেলা। রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত করা। পশ্চিমবঙ্গে তার নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে আরো কনসোলিডেটেড করা। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু তিনি দিল্লিতে এসে দাপাদাপি করতেন না। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সফলতা তাঁকে গুজরাটের মাটিতে আরো শক্তপোক্ত করে এবং সেই শক্তির বলেই তিনি দিল্লিতে উপনীত হতে পারতেন ২০১৪ সালে। আরেকটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ছিল বিজেপির মতো একটা শক্তপোক্ত দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি প্রতিটি আসনও পান, তাহলেও কিন্তু তিনি ৪২টি আসনের নেত্রী। সুতরাং কোয়ালিশনের ভবিষ্যৎ আমরা এখনো জানি না। মমতাও অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গকে। তিনি সংবাদ সম্মেলনে সেদিন বলেছেন, তাঁর প্রথম থেকে শেষ অগ্রাধিকার কিন্তু বাংলাই। বাংলার জন্য তিনি সব কিছু করতে পারেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পা-ও ধরতে পারেন। আজকে মমতা যখন এ কথা বলছেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর ঔদার্য একান্ত কাম্য।

রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবক্ষয় হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের। এ কথা ঠিক যে দুই পক্ষেরই কিছু লোক আছে, যারা চায় না এই সংঘর্ষের বিরতি হোক। তারা চায় না এই বোঝাপড়াটা হোক। কিন্তু আজকে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য এই বোঝাপড়াটা জরুরি।

আমার মনে পড়ে, অটল বিহারি বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, এটা বর্বর ও অসভ্যদের সরকার। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন না, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এবং দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎকার হচ্ছিল না। এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনডিএ শরিক। তিনি রেলমন্ত্রী। তিনি পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমবিরোধী রাজনৈতিক অভিযানে ব্যস্ত। সেই সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জ্যোতি বসুর সিদ্ধান্ত বদল করাতে মস্ত বড় ভূমিকা নেন। তিনি দিল্লিতে লালকৃষ্ণ আদভানির কাছে জ্যোতি বসুকে নিয়ে আসেন। জ্যোতিবাবু বুদ্ধবাবুকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার এখনো সেই দিনটা মনে পড়ে। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। জ্যোতিবাবু বুদ্ধবাবুকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বুদ্ধ উপমুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন। সুতরাং উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধ নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন আপনার সঙ্গে।’ এবং এরপর আদভানি অটল বিহারি বাজপেয়ীর সঙ্গে জ্যোতিবাবুর বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন এবং বাজপেয়ীর সঙ্গে জ্যোতিবাবু বৈঠক করেন। জ্যোতিবাবুর সঙ্গে বাজপেয়ীর এর আগেও বৈঠক হয়েছিল। যখন ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বাম ও বিজেপি দুই পক্ষই বাইরে থেকে ভিপি সিংকে সমর্থন দিয়েছে। আমি লালকৃষ্ণ আদভানির কাছেই গল্প শুনেছিলাম, জ্যোতিবাবুর সঙ্গে বাজপেয়ী ও আদভানির একটা বৈঠকও হয়েছিল, যে বৈঠককে গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন জ্যোতিবাবু। এর কারণ কমিউনিস্টরা বিজেপির সঙ্গে বৈঠক করছে, তাতে ভুল বার্তা যেতে পারে রাজ্যে। সে কারণেই বাজপেয়ী বা আদভানির বাড়িতে জ্যোতিবাবু আসতে রাজি হননি। শিল্পপতি বীরেন শাহ জ্যোতিবাবুর বন্ধু ছিলেন। তিনি এই বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। একটি পাঁচতারা হোটেলের সুইটে এই বৈঠকটি হয়েছিল। আদভানি এই কথা তাঁর আত্মজীবনীতেও লিখেছেন। তিনি বারবার বলতেন, আমাদের দিক থেকে কিন্তু কোনো রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা নেই। আমাদের মতাদর্শগত মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু কারো সঙ্গে দেখা করব না বা সেটা গোপনে দেখা করতে হবে, এমনটা কিন্তু আমাদের পার্টিতে নেই। সেটা একটা সময় কমিউনিস্ট পার্টির সমস্যা ছিল। বুদ্ধবাবু সেই সমস্যাটা ঘুচিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কের মধ্যে একটা যোগাযোগের সেতু তৈরি করেছিলেন। মনে পড়ে, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল নিয়ে একটা বিবাদ তৈরি হয়েছিল কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে। বুদ্ধবাবুই সেটা আদভানিকে বলেন এবং আদভানি নর্থ ব্লকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘরে তৎকালীন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী রাম নায়েককে ডেকে পাঠান। বুদ্ধবাবুও সেই বৈঠকে থাকেন এবং আদভানির মধ্যস্থতায় সেই বিবাদের ভঞ্জন হয়েছিল। সেই বৈঠকের পর পেট্রোলিয়ামমন্ত্রীর কর্মকর্তা ও রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদেরও বৈঠকে যোগদান এবং তার এক মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়েছিল সেই হলদিয়ার জট ছাড়ানোর ক্ষেত্রে।

আজ এত দিন পর এই ঘটনাগুলো মনে পড়ছে তার একটাই কারণ, পশ্চিমবঙ্গের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে, বাংলার ভূমিপুত্র হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, বাংলার ভবিষ্যৎ এই কেন্দ্র ও রাজ্যের সুষ্ঠু সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। তার মানে এই নয় যে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংঘাত হবে না বা রাজনৈতিক লড়াই হবে না। রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকুক। ভবানীপুরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় উপনির্বাচন আসছে, সেখানে বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর চেষ্টা করুক। এমনকি ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যদি পরাস্ত করার চেষ্টা করে, সেটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু এই রাজনৈতিক লড়াইটা না লড়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিবাদকে বৃদ্ধি করা প্রশাসনকে পঙ্গু করে দিয়ে রাজনীতির ফায়দা তোলা কাম্য নয়। তিনটি আসন থেকে বিজেপি ৭৭টি আসন লাভ করেছে, কম কথা নয়। সেই বিজেপিকে সক্রিয় অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি না। দেখছি এনফোর্সমেন্ট। দেখছি সিবিআই। দেখছি রাজ্যপাল। দেখছি নর্থ ব্লক, দেখছি সাউথ ব্লক। বিজেপির এক নেতা আমাকে বলেছিলেন, বাজপেয়ীর কোয়ালিশন ছিল, তাই বাজপেয়ীকে মমতার বাড়িতে যেতে হয়েছিল। মমতার মাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন অটল বিহারি বাজপেয়ী। নরেন্দ্র মোদির সেই বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি কোয়ালিশনের প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি বিজেপির একচ্ছত্রপতি মহানায়ক। এই কথার প্রসঙ্গে সেই বন্ধু বিজেপি নেতাকে বললাম, হয়তো বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে; কিন্তু দেশটা এখনো কোয়ালিশনে আছে। ুংুএই সমাজ দেড় শ কোটি মানুষের, নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান। এই কোয়ালিশনকে বোধ হয় রাজর্ষি প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত। কৌটিল্য তো রাজাকে রাজর্ষি আখ্যা দিয়েছিলেন। আমরা শুধু কৌটিল্যের সাম-দান-দণ্ড-ভেদের কথা বলি। শুধু আমরা বলি যেনতেন প্রকারে কিভাবে ক্ষমতার রাজনীতি করা যায়। ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে কৌটিল্যকে একসঙ্গে বসাই পাশাপাশি। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলি আর কৌটিল্য কিন্তু এক নয়। কৌটিল্য তথা চাণক্যের নীতিশাস্ত্র আছে। এখানে রাজর্ষিকে অনেক নীতিশাস্ত্র মেনে চলতে হয়। এবং ‘সাম-দান-দণ্ড-ভেদ’ এই চার উপায়ের মাধ্যমে রাজা অর্থ লাভ করে। কিন্তু রাজার কর্তব্যকর্মে গণতন্ত্র সবচেয়ে বড় কথা।

কলাইকুণ্ডার ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টুইট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেন যে তিনি সংবিধানের অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। দেখা গেল রাজনাথ সিং, নীতীন গড়করির মতো মন্ত্রী, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো রাখেন, তাঁদেরও টুইট করতে দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। সাংবাদিকজীবনের প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, কেন্দ্রের দেশ শাসনের জন্য একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে সমবেতভাবে টুইট অভিযান বোধ হয় ভুল রণকৌশল। মন্ত্রিসভায় অন্তত কয়েকজন মন্ত্রী থাকা উচিত, যাঁরা রাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখবেন। এটাই আমাদের সাবেক রাজনীতিশাস্ত্রের গোড়ার কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন, নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী, তখন জ্যোতিবাবু কিন্তু নরসিমা রাও ও তাঁর একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় তো ছিলেনই। এমনকি রাজীব গান্ধীর সময়েও বুটা সিংয়ের বাড়িতে জ্যোতিবাবু নিয়মিত যেতেন। দার্জিলিংয়ের সুভাষ ঘিসিংয়ের সমস্যা মেটাতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি জ্যোতিবাবু করেছিলেন বুটা সিংয়ের সহায়তা নিয়ে। আবার নরসিমা রাওয়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস পি চৌহান সল্টলেকে জ্যোতিবাবুর বাড়িতে গিয়েও দেখা করেছিলেন। এ নিয়ে সেই সময়ে রাজ্যে কংগ্রেসের বিরোধীরা তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। কেন এস পি চৌহান জ্যোতিবাবুর বাড়িতে যাচ্ছেন? তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জ্যোতিবাবুর বাড়িটি মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি, সেটি একটি অফিস। এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যাওয়া সরকারি ব্যাপার, কেন্দ্র ও রাজ্যের ব্যাপার। এর সঙ্গে কংগ্রেস বনাম সিপিএমের রাজনৈতিকে যুক্ত করা ঠিক নয়। আজ তাই আমরা যখন করোনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছি, সেই সময় এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অক্ষুণ্ন্ন রাখা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এর উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি জরুরি। তাই উচিত কাজ হবে, প্রধানমন্ত্রী কাউকে তাঁর সচিবালয়ে নিযুক্ত করুন, যিনি রাজ্য সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখবেন। আবার মুখ্যমন্ত্রী অথবা মুখ্য সচিব যেকোনো একজন তাঁর মনোনীত ব্যক্তিকে কেন্দ্রের সঙ্গে প্রশাসনিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য দায়িত্ব দেন। এটা প্রত্যক্ষ, এমনকি ব্যাক চ্যানেল দুই রকমভাবেই হতে পারে।

যদি রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারি করা কেন্দ্রের লক্ষ্য হয়, রাজ্যপালের শাসন জারি করাই লক্ষ্য হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। আর যদি এটা কোনো পরিকল্পিত চিত্রনাট্য না হয়, তাহলে এই দুর্যোগের সময় দুই পক্ষেরই উচিত তাপমাত্রা কমিয়ে আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলা। সেটাই পাবলিক ইন্টারেস্ট।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা