kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

মৌসুমের প্রথম ভারি বর্ষণে থইথই

৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও নিতে পারেনি ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ জুন, ২০২১ ০২:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও নিতে পারেনি ঢাকা

জলাবদ্ধতা : টানা তিন ঘণ্টা ঝরে থামে বর্ষণ। ডুবে যায় রাজধানীর অলিগলিসহ সড়ক। জলদুর্ভোগে পড়ে ঢাকাবাসী।

সোমবার রাত থেকে রিমঝিম বৃষ্টি। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল বৃষ্টির মাত্রাও। ভোরের আলো চোখ মেলতেই শুরু ঝুম বৃষ্টি। রাজধানী ঢাকাকে ডুবিয়ে আকাশভাঙা বর্ষণ যখন থামে, ঘড়ির কাঁটা তখন ৯টার ঘরে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৮৫ মিলিমিটার। আর তাতেই রাজধানীর অলিগলিসহ প্রধান প্রধান সড়কে জলস্রোত দেখেছে ঢাকাবাসী।

কয়েক দিন আগেই ঢাকার দুই মেয়র এবারের বর্ষায় রাজধানী ডুববে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই আশার বাণী মৌসুমের প্রথম ভারি বৃষ্টিতেই বুমেরাং হয়েছে। গতকাল ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও ধারণ করতে পারেনি ঢাকা। ফলে রাজধানীবাসীকে সাতসকালেই পড়তে হয় চিরচেনা ভোগান্তিতে। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ সকালে রাস্তায় নেমে একরকম জলযুদ্ধের মুখ পড়ে।

কোনো কোনো সড়কে জমে বুক সমান পানি, এ সময় যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ সড়ক। সড়কে সড়কে বিকল হতে থাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার ও গ্যাসচালিত বাস। জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশার ভাড়া বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘর থেকেই বেরোতে পারেনি মিরপুরের কাজীপাড়া, সেনপাড়া, ইব্রাহিমপুর, ঝুটপট্টিসহ রূপনগর, দারুসসালাম, মিরপুর ৬ নম্বর এলাকার বাসিন্দারা। একই অবস্থা ছিল ডেমরা, দক্ষিণখান, উত্তর খান এলাকার বাসিন্দাদেরও। ওই সব এলাকায় প্রতিটি গলিতে পানি জমেছে, কোথাও কোথাও দুপুর ১২টা পর্যন্ত জলাবদ্ধতার নিরসন হয়নি।

এদিকে গতকাল রাজধানীর আজিমপুর, হাজারীবাগের কিছু অংশ, ঝিগাতলা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন গেট থেকে চানখাঁরপুল বঙ্গবাজার হয়ে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর সড়কের পানি কমতে থাকলেও আজিমপুর ও বঙ্গবাজার এলাকা দুপুরেও পানিতে ডুুবে ছিল। সকালের দিকে এই সড়কে হাঁটু সমান পানি থাকায় অনেক গাড়ি চলতে গিয়ে বিকল হয়ে যায়। ফলে বঙ্গবাজার থেকে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন থেকে মতিঝিল অফিসে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অফিসগামী যাত্রীদের। তাদের একজন মোবাশ্বের হোসেন একটি ব্যাংকের শাখা কর্মকর্তা, কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ চাবিগুলো তাঁর কাছে। মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সকাল ৯টায় বৃষ্টির মধ্যেই বাসা থেকে বের হয়েছি। বাস চলেনি। কয়েকবার রিকশায় যাওয়ার চেষ্টা করেছি। ৩৫০ টাকায় রিকশা ভাড়া করেছিলাম। ১০ নম্বর সেকশন থেকে সামান্য এগোনোর পর গর্তে পড়ে রিকশার সামনের অংশ ভেঙে যায়, রিকশাওয়ালাও আহত হন।’

সরেজমিনে দেখা যায়, গোড়ান চটবাড়ী এলাকায় সড়ক থেকে পানি সরছে না কয়েকটি কারণে। বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ড্রেনগুলো পানি ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। এর ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া মিরপুর এলাকার রূপনগর ও বাউনিয়া খাল দখল হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি গোড়ান চটবাড়ী এলাকায় যেতে পারে না। একই অবস্থা উত্তরা এলাকার খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন পাম্পের কাছে যেতে পারছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিচালনা করছে গোড়ান চটবাড়ীর পানি নিষ্কাশন পাম্পটি। পাউবোর প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা পাম্পের সামনে পানি এনে দিতে পারলে তারা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারবে। তবে দেখা যায়, পানি পাম্পের সামনে পৌঁছানোর আগেই জলাবদ্ধতায় রূপ নিচ্ছে।

লকডাউন শুরুর সময় সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, লকডাউনের সময় সড়ক মেরামত করা হবে। তবে দেখা গেছে, রাজধানী শহরে সড়ক বিভাগের প্রধান সড়কটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এই সড়কের এয়ারপোর্ট থেকে আবদুল্লাহপুর পার হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কটি গতকালের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। মূলত উন্নয়নকাজের জন্য এ সড়কে পানি জমে।

বৃষ্টিতে এবার রাজধানী ডুববে না ঘোষণা দেওয়ার পরও কেন জলাবদ্ধতা হচ্ছে এমন প্রশ্নে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই জলাবদ্ধতা আমাদের জন্য এ বছরের প্রথম শিক্ষা। আমরা দেখেছি বনানী, মিরপুর, এয়ারপোর্ট রোডে পানি জমেছে। এই পানি ছয়টি রিটেনশন পন্ডে (পানি জমা হওয়ার জায়গা) জমা হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা নেই, দখল হয়ে গেছে। কল্যাণপুর রিটেনশন পন্ডের ১৭১ একর জায়গার মধ্যে দখল হয়ে গেছে ১৭০ একর। সেটা দখলমুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু তিন যুগের সমস্যা তো আর তিন দিনে সমাধান করা সম্ভব না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি জায়গায় জলজট হলেও বিগত সময়ের চেয়ে তা অনেকাংশেই কম। গেল পাঁচ মাসে আমাদের কার্যক্রম এবং সকাল থেকে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠ পর্যায়ে তৎপরতার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমেছে। ডিএনডি বাঁধ, হাতিরঝিল প্রকল্প, মেট্রো রেলের কার্যক্রমের ফলে জলাবদ্ধতার সম্পূর্ণ সমাধান এখন দেওয়া সম্ভব না হলেও অতীতের মতো ঢাকাবাসীকে কোথাও কোমর পানি বা গলা পানিতে নাজেহাল হতে হয়নি।’

জলাবদ্ধতার ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ছিল বৃষ্টির দুই ঘণ্টার মধ্যে যাতে পানি নেমে যায়। আজ (গতকাল) বৃষ্টি হওয়ার পর আমাদের কুইক রেসপন্স টিম, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, বর্জ্য বিভাগ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং টিম সবাই মাঠে নেমেছিল। আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি, তবে অন্য সময়ের চেয়ে তিন বা চারটি জায়গা ছাড়া বাকি স্থানে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যবস্থা নিতে পেরেছি। আর বাকি তিন-চার জায়গার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।’



সাতদিনের সেরা