kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

পাচার হয়ে দাসত্বের জীবনে রোহিঙ্গারা

জয়নাল আবেদীন    

২ জুন, ২০২১ ০২:০৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাচার হয়ে দাসত্বের জীবনে রোহিঙ্গারা

রোহিঙ্গা কিশোর সাহাব উল্যাহকে যখন নিরাপদে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সে ভেবেছিল এটাই তার হতাশাগ্রস্ত জীবন থেকে মুক্তির মোক্ষম সুযোগ। দালালচক্র তাকে নির্বিঘ্নে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মুক্তি মেলেনি। তাকে বরণ করতে হয় দাসত্বের জীবন, যেখান থেকে ছাড়া পায়নি এক বছরেও।

সাহাবের বাবা এনাম উল্যাহর কথায়, ১৬ বছর বয়সী সাহাব উল্যাহর একসময় সুন্দর জীবন ছিল। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এলাকায় দর্জির কাজ করত। ২০১৭ সালে সহিংস পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ঢলে শামিল হয়ে অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশে। সরকারি আশ্রয়শিবিরে গাদাগাদি অবস্থায় জীবন যাপন করতে গিয়ে এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। এমন সময় টোপ দেয় দালালচক্র। কোনোমতে মালয়েশিয়ায় পা রাখতে পারলেই বদলে যাবে জীবন—দালালের কথায় সরল বিশ্বাসে সাহাব পা রাখে অনিশ্চিত জীবনের পথে।

উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে সাহাব উল্যাহর মতো অনেক রোহিঙ্গাকে বরণ করে নিতে হয়েছে দাসত্বের জীবন। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারতসহ দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে দাসত্বের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে কক্সবাজারের শরণার্থীশিবির থেকে পাচারের শিকার হয়েছে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা। করোনাকালে আকাশপথে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় সাগরপথে বেড়েছে পাচারের ঘটনা। সরকার আন্তরিক হলেও নিত্যনতুন কৌশলে রোহিঙ্গাদের বের করে নৌকায় তুলে নিচ্ছে দালালচক্র।

এমনকি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নতুন আশ্রয়স্থল নোয়াখালীর ভাসানচর থেকেও পাচারের একাধিক চেষ্টা হয়েছে। যদিও প্রশাসনিক তৎপরতায় বেশ কয়েকটি পাচারের ঘটনা ব্যর্থ হয়েছে। কয়েকজন মানবপাচারকারী আটকও হয়েছে। তবে দালালচক্রের মূলোৎপাটন সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত সোমবার ১০ জন রোহিঙ্গাসহ তিন পাচারকারীকে আটক করেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার পুলিশ। ভাসানচর থেকে ওই রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর কথা বলে সাগর ঘুরিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় মিরসরাই উপকূলে।

মানবপাচার প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে দাতব্য সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)। সংস্থাটির মানবপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচির প্রধান যিশু বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য মালয়েশিয়া। আশ্রয়শিবিরে থাকতে গিয়ে নানা কারণে রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। মূলত এই শ্রেণির রোহিঙ্গারাই দালালের ফাঁদে পা দেন বেশি। উন্নত জীবনের টোপে ফেলে তাঁদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার পর বন্দি করা হয় দাসত্বের জীবনে। অথচ তাঁদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় দালালচক্র।

ইপসার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে দুই বছরে শুধু কক্সবাজার থেকেই পাচারের শিকার হয়েছে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা। এর মধ্যে তিন শতাধিক ব্যক্তি পাচার হয়েছে গত এক বছরে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পাচারের ঘটনা বাড়তে দেখা গেছে। সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আন্তরিক ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু জনবলসংকটসহ নানা কারণে পাচারের সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না।

যিশু বড়ুয়া বলেন, নৌকায় তুলে নেওয়ার পর নতুন নতুন ফন্দি আঁটতে থাকে দালালচক্র। রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারলেই শুরু হয় চরম নির্যাতন। অনেক সময় দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর যার হাতে তুলে দেওয়ার কথা, তার হাতে দেওয়া হয় না। শরণার্থীশিবিরে এমন অনেক পরিবার আছে, যারা জানে না তাদের সেই স্বজনরা বেঁচে আছে কি না।

মালয়েশিয়ায় দাসত্ব বরণে বাধ্য হওয়া সাহাবের মতো বহু করুণ কাহিনি আছে। এমনই একজন ভুক্তভোগীর নাম নূর হোসেন (৩০)। এই যুবক বেঁচে আছেন, নাকি মালয়েশিয়া পুলিশের হেফাজতে—কিছুই জানেন না তাঁর বৃদ্ধ বাবা নূর আহাম্মদ। তাঁর সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গত বছরের জানুয়ারির কোনো এক রাতে আরো কয়েকজনের সঙ্গে নৌকায় উঠেছিলেন ছেলে নূর হোসেন। নৌকাভাড়া বাবদ দালালের হাতে আগেই জমা দিতে হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা। কথা ছিল, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর সাত হাজার রিঙ্গিত (প্রায় দেড় লাখ টাকা) দিতে হবে দালালদের। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর দালালরা দাবি করে আড়াই লাখ টাকা। এই টাকা দিতে না পারায় নূর হোসেনের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। এর পর থেকে ছেলের আর কোনো খবর মেলেনি।

আরেক ভুক্তভোগী আবদুল আজিজের সঙ্গে (১৭) তার পরিবারের কথা হয় মাঝেমধ্যে। এটিও গত বছরের জানুয়ারির ঘটনা। কক্সবাজারের টেকনাফে সাগর উপকূলে যখন নৌকায় উঠে বসে আজিজ, তখন মালয়েশিয়ায় শুরু হয় ফরিদ হোসেনের অপেক্ষা। ফরিদ হলেন আজিজের মামা। চুক্তি অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর সাত হাজার রিঙ্গিতের বিনিময়ে আজিজকে তুলে দেওয়া হবে ফরিদের হাতে। কিন্তু মালয়েশিয়ায় ফরিদের অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি। তিনি পাননি তাঁর ভাগ্নেকে।

আজিজের বাবা করিম উল্যাহ উখিয়ার শরণার্থীশিবির থেকে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, ২৫ হাজার টাকা দিয়ে নৌকায় তুলে দিয়েছিলেন ছেলেকে। দালালের কথামতো মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত তাঁর শ্যালক ফরিদকে সাত হাজার রিঙ্গিত প্রস্তুত রাখতে বলেছিলেন। সব কিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর ফরিদের কাছে নয়, সেখানকার আরেকটি দালালচক্রের কাছে আজিজকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আজিজ এখন তাদের কাছে দাসত্বের জীবন যাপন করছে। গোপনে মাঝেমধ্যে ফোন করে আজিজ।

রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে কাজ করে, এমন একাধিক দাতব্য সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের পাচারের ক্ষেত্রে দুটি প্রস্তাব দিয়ে থাকে দালালচক্র। ছেলেদের ভালো চাকরি এবং মেয়েদের ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ের মতো লোভনীয় অফার দেওয়া হয়। সরল বিশ্বাসে এসব প্রস্তাব গ্রহণ করে ফাঁদে পড়ে রোহিঙ্গারা। কিন্তু সব রোহিঙ্গা নিরাপদে মালয়েশিয়া বা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। পথে পথে পুলিশি প্রহরাসহ নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।



সাতদিনের সেরা