kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

বাজেটে থাকছে না তেমন কিছু

মধ্যবিত্তদের রক্ষা না করলে সর্বনাশ

মাসুদ রুমী   

২ জুন, ২০২১ ০১:৫৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মধ্যবিত্তদের রক্ষা না করলে সর্বনাশ

অর্থনীতির চালিকাশক্তি দেশের মধ্যবিত্ত তথা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী। তারা করও দেয়। করোনা মহামারিতে তাদের আয় কমেছে। অনেকেই চাকরি হারিয়ে গ্রামে চলে গেছে। অতিমারির জেরে গত এক বছরে সঞ্চয় ভেঙে খেয়ে নিঃশেষ হতে হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করার সঞ্চয় তাদের নেই। তারা মানুষের কাছে হাত পাততে পারছে না। টিকে থাকার জন্য লড়ছে।

বাজেটে গরিব মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক নানা কর্মসূচি থাকলেও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য তেমন কিছুই থাকে না। কিন্তু অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরির নেপথ্যের এই কারিগরদের রক্ষা করা না গেলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সফল হবে না। মধ্যবিত্তরা সমাজকে টিকিয়ে রাখে। এই মাঝের স্তরটির অবক্ষয়ের অর্থ সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। আগামী বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের যে বাজেট উত্থাপিত হতে যাচ্ছে, তাতে মধ্যবিত্তের জন্য তেমন কোনো সুখবর নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্তদের রক্ষা না করলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে।

মধ্যবিত্ত কারা?

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা নির্ধারিত আয়ের মানুষ, মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কাজ করে, যাদের বেতনের বাইরে বাড়তি আয় নেই, উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে দারিদ্র্যসীমার ওপরে যাদের বসবাস, তারাই মধ্যবিত্ত; যার মাসিক আয় ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা, সে-ই মধ্যবিত্ত। এটা বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরে এর মধ্যে ২০ শতাংশ বা চার কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে।

কেন অর্থনীতি বাঁচাতে মধ্যবিত্তরা গুরুত্বপূর্ণ?

নানা টানাপড়েনে মধ্যবিত্ত সংকুচিত হয়ে আসছে এবং এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। করোনা মহামারিতে এই শ্রেণির অনেকেই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এক শ্রেণির হাতে প্রচুর অর্থ, আরেক শ্রেণি নিঃস্ব—এই বৈষম্য কমানোর তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থনীতিতে নিম্নমধ্যবিত্তরা বিশাল অবদান রাখছে। আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক সব খাতে তারা বড় ভূমিকা রাখছে। এসএমই খাতের মাধ্যমে আমাদের জিডিপির ২৫ শতাংশ তারাই অবদান রাখে। কিন্তু যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশাল এই জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত হয়। তারা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী নয়। বাজেট প্রণয়নের সময় তাই তাদের পক্ষে বলার কেউ নেই। যারা উচ্চবিত্ত, বড় ব্যবসায়ী, তারা দর-কষাকষি করতে পারে, এমনকি তারা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আছে। এখন পর্যন্ত আমরা যা জানতে পারছি, তাতে নতুন বাজেটে তেমন নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু থাকছে না।’   

করোনায় চাকরি-ব্যবসা হারিয়ে নাকাল

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে ৬২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে বলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আয় কমে যাওয়ায় ৫২ শতাংশ মানুষ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। আবার অনেকের ঋণ বেড়েছে। কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত একটি জরিপের তথ্য বলছে, মোট জনগোষ্ঠীর ৪২ শতাংশ এখন দরিদ্র। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) আরেকটি জরিপ অনুসারে, মহামারির প্রভাবে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। স্পষ্টতই মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ এর মধ্যে পড়েছে। নগরজীবনের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে কম খরচের বাসায় উঠেছে কিংবা স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালপের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনায় বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও বেকার থাকতে হয়েছে। আবার কাজ করলেও ৬৩ শতাংশই আয় কমার কথা জানিয়েছে।

নতুন বাজেটে মধ্যবিত্ত

বাজেট বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আত্মতুষ্টিতে নয়, বরং আগামী বাজেটে জীবন-জীবিকাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শুধু বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। করোনার কারণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দরকার। দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৈষম্য নিরসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শহরমুখী অনেক মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। এসব মানুষের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত ছিলেন, তাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এ মুহূর্তে তাঁদের অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দরকার। নতুন করে যাঁরা দরিদ্র হয়েছেন, বাজেটে তাঁদের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে। রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও এডিপিতে বড় বড় আর্থিক খরচ হচ্ছে। ফলে আমাদের এই সময় মানুষের জীবন ও জীবিকা বাঁচানো সম্ভব নয়। ফলে কিছু প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তথা সম্পদের সুষম বণ্টন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু এটি নিয়ে বাস্তব কোনো ধরনের প্রতিফলন দেখা যায় না। নতুন বাজেট থেকেই প্রপার্টি ট্যাক্স নিয়ে একটি দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিম্নমধ্যবিত্তদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হলে নগদ সহায়তার আওতায় আনতে হবে। সরকারের উচিত, তাদের প্রশাসনের মাধ্যমে দেখা প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির কী পরিমাণ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা চাকরি হারিয়েছে, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো পদ্ধতি করা যায় কি না দেখা যেতে পারে। এই নিম্নমধ্যবিত্তদের টান টান ব্যক্তিত্ব। তারা কোথাও হাত পাততে পারবে না। আর নিম্নমধ্যবিত্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলে তাদের পিকেএসএফ, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহায়তা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম, সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে আমরা শুধু কথাই বলছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কাজের কাজ হচ্ছে না।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মনজুর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের কিছু সময়ের জন্য সহায়তায় বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। দরিদ্র ৫০ লাখের তালিকা আরো বাড়িয়ে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, যাঁদের ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে—এমন ক্ষতিগ্রস্তদের এই তালিকায় রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচিগুলোর আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসূচিও নিতে হবে। এর মাধ্যমে যাঁরা গ্রামে চলে গেছেন, তাঁদের কর্মসংস্থানের আওতায় আনা যাবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজের পরিধি যদি বাড়ানো যায়, তাহলেও এসব কাজে স্থানীয় লোকজন সংযুক্ত হয়ে কিছু কর্ম পেতে পারে।’

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও বাঁচাতে হবে

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়েছে বলেই তাদের অবদান কম—এমনটা মনে করার কারণ নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ীও অর্থনীতিতে সিএসএমই খাতের ২৫ শতাংশ অবদান, নির্ভরশীল তিন কোটি মানুষ। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করার জন্যই বাজেটে তাদের সহযোগিতা দিতে হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরের লকডাউনে ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীরা পারিবারিক সঞ্চয় ভেঙে পরিবারের ভরণ-পোষণ করেছেন। এ বছরও যখন লকডাউনে আরো কষ্টে জীবন যাপন করছিলেন; এ সময় সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রণোদনা তাঁরা পাননি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছেন। তাঁদের সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রণোদনা ছাড়া বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা যাবে না। বাজেটে তৃণমূল অঞ্চলে কর্মসংস্থান তৈরিতে করছাড় দেওয়া যেতে পারে। যাঁরা শহর থেকে চাকরি হারিয়ে গ্রামে চলে গেছেন, তাঁদের সহায়তার জন্য কিছু নগদ সহায়তা দিতে হবে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। মধ্যবিত্তদের অনেকেই কারো কাছে হাত পাততে পারছে না। গার্মেন্টের প্রণোদনার সাফল্য আমরা অন্যান্য খাতেও কাজে লাগাতে পারি। পাদুকা, তথ্য-প্রযুক্তির মতো খাতে আমরা এটা করতে পারি।’

কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যক্তি খাতে আমরা চাঞ্চল্য দেখছি না। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহ ছাড়া কর্মসংস্থান আগের জায়গায় নেওয়া কঠিন হবে। অনেকে সার্ভিস সেক্টর থেকে অ্যাগ্রিকালচারে গেছেন। তাঁদের নিয়ে আসতে হবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে। সেখানেই আমাদের ফিসক্যাল পলিসি এবং যেসব উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হবে, সেগুলো এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে, যাতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উৎসাহিত করতে পারে।’



সাতদিনের সেরা