kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা থাকছে

ফারজানা লাবনী   

৩১ মে, ২০২১ ০২:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা থাকছে

করোনাভাইরাস মহামারির এই সংকটকালে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা থাকছে আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) জাতীয় বাজেটে। দেশে উৎপাদিত এবং বেশি ব্যবহার হয় এমন বেশির ভাগ পণ্যের দাম নাগালে রাখতে দেশি শিল্পে ব্যাপক হারে রাজস্ব ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দেশে কম্পিউটারসহ কিছু পণ্যের উৎপাদন উৎসাহিত করতে সেসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। তবে শুল্ক ছাড় পাচ্ছে কৃষিযন্ত্র, স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য। এতে ওই সব পণ্যের দাম কমতে পারে। তবে আগের মতোই আসছে বাজেটেও বিড়ি, সিগারেটসহ তামাকজাতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের ঘোষণা আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী পরশু ২ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। ৩ জুন নতুন অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে বাড়বে না চাল, ডাল, চিনি, লবণ, দেশে উৎপাদিত পেস্ট, পাউরুটি, সাবান, বোতলজাত পানি, ফলের জুস, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের দাম।

কর অব্যাহতি-রেয়াতি সুবিধা এবং আমদানি করা সমজাতীয় পণ্যে শুল্ক আরোপ করায় বিদেশি খেলনার দাম বাড়লেও কমবে দেশি খেলনার দাম। আমদানি করা সম্পূর্ণ মোটরসাইকেলের চেয়ে দেশে সংযোজিত মোটরসাইকেল কম দামে পাওয়া যাবে। আমদানি করা কম্পিউটারের দাম বাড়তে পারে। কমতে পারে দেশে উৎপাদিত কম্পিউটারের দাম।

আসছে বাজেটে প্রযুক্তি খাতের বিকাশে বেশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছর থেকে কম্পিউটার ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক না থাকলেও আগামী অর্থবছরে তা ৩২ শতাংশ পর্যন্ত আরোপ হতে পারে। বাজেট প্রণয়নকালেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেশি কম্পিউটার শিল্পের বিকাশে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়ে বলা হয়েছে, দেশে কম্পিউটার ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন করলে রাজস্ব ছাড়ের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে হবে। এরপর কম্পিউটার সংযোজনকারী শিল্পে ৪-৫ শতাংশ এবং সম্পূর্ণ কম্পিউটারের পর ৩০-৩২ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়। আসছে বাজেটে এই কর আরোপ করা হলে আমদানি করা পিসি ও ল্যাপটপের দাম বাড়বে। তবে সুবিধা পাবে দেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া দেশে কারখানা করে বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসার কথা শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তারাও আসছে বাজেটে একই সুবিধা পাবে।

কর অব্যাহতি দেওয়ায় খরচ কমবে ক্লাডউ সার্ভিস, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক পাবলিকেশন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে। এ ছাড়া কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল থাকায় সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল এনিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট সার্ভিস, আইটি প্রসেস আউটসোর্সিং, ওয়েবসাইট হোস্টিং, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডাটা এন্ট্রি অ্যান্ড প্রসেসিং, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, সফটওয়্যার ল্যাব টেস্ট সার্ভিস, কল সেন্টার সার্ভিস, ওভারসিজ মেডিক্যাল ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস খাতে খরচ বাড়বে না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি শামীম আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সফটওয়্যার আমদানিতে বর্তমানে ২৫ থেকে ৫৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এতে খরচ বাড়ে। দেশের প্রযুক্তি খাতের বিকাশে ছাড় দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট খাত আরো এগিয়ে যাবে।’

আগামী অর্থবছরে অধিক ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামাদি আমদানিতে রাজস্ব মওকুফ সুবিধা দিয়ে দাম কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির উপাদান, মাস্ক, সুরক্ষা পোশাকসহ ৪৬ ধরনের পণ্য আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতেও ছাড় দিয়ে এ দুই খাতে খরচ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। করোনা পরীক্ষার দুই ধরনের কিট এবং রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি আমদানিতেও শুল্ক থাকছে না। এ ছাড়া তিন স্তরের সার্জিক্যাল মাস্ক, প্লাস্টি ফেস শিল্ডস, সার্জিক্যাল পোশাক, বিশেষ ওভেন স্যুট, মেডিক্যাল প্রটেকটিভ গিয়ার, সুরক্ষা চশমা, জীবাণুনাশক আমদানিতে রাজস্ব ছাড় দেওয়ায় এসব পণ্যের দাম কমবে।

আসছে বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতির দাম কমানো হয়েছে। নতুনভাবে গড়ে ওঠা শাকসবজি, ফল, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট খাতের পণ্যের দাম কমবে। গরু মুরগি মাছের খাবারের দাম কমবে। তবে খামারে চাষাবাদ করা ৩০ লাখ টাকার বেশি মাছ বিক্রিতে ১৫ শতাংশ বাড়তি কর আরোপ হওয়ায় আগামী বছর এসব মাছের দাম বাড়তে পারে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে যেসব খাতে শুল্ককর ও ভ্যাট অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে সেসব খাতের পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে নিত্যপণ্যের মধ্যে চাল, ডাল, চিনি, লবণ, দেশে তৈরি পেস্ট, পাউরুটি, সাবান, বোতলজাত পানি, ফলের জুস, গরুর দুধ, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য ও খেলনার দাম বাড়বে না। দেশীয় বুটিক ও ফ্যাশন হাউসের পণ্যের দাম বাড়বে না। তবে সমজাতীয় আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করায় দাম বাড়বে। প্রসাধনসামগ্রী আমদানিতে বেশি শুল্ক বহাল থাকায় বিউটি পার্লারের সেবার খরচ বাড়বে।

জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আগামীবার কমবে না মোবাইল ব্যবহারের খরচ। ভ্যাট আরোপ হওয়ায় আগামী অর্থবছরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে যাতায়াতে খরচ, গাড়ির নিবন্ধন খরচ, ফিটনেট ফি, ঠিকাদারি ফি, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর ব্যয় বাড়তে পারে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে হালকা প্রকৌশল শিল্পে কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশে উৎপাদিত এবং আমদানির বিকল্প যন্ত্রপাতির দাম কমবে। মোবাইল ফোনসেট, সিমেন্ট ও স্টিল শিল্পে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্পে করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় চলমান অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রপ্তানি প্রণোদনা, গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন আছে এমন প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়ে ১০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে উেস কর কর্তনের হার ০.৫ শতাংশ বহাল থাকছে। এতে তৈরি পেশাক উৎপাদনকারীদের খরচ বাড়বে না।

আগামী অর্থবছরে দেশি শিল্পও বেশ ছাড় পাচ্ছে। পুঁজিবাজারের তালিকাবহির্ভূত উৎপাদনশীল খাতের কম্পানির করহার কমানো হচ্ছে। দেশি শিল্প খাতে ব্যবহৃত বেশির ভাগ কাঁচামালের আমদানি শুল্কে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লোহার রড়, স্ক্র্যাপ, মোটরসাইকেল ও গাড়ির যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রী, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্প, দেশি টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, মোবাইল, ওষুধ ও অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এসব শিল্পের উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করেও (ভ্যাট) থাকছে রেয়াতি ও মওকুফ সুবিধা। সম্পূর্ণ আমদানি করা মোটরসাইকেলের চেয়ে দেশে সংযোজিত বা দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলশিল্পে বেশি সুবিধা থাকছে। বিশেষভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বর্তমান নিম্নহারের শুল্ক বহাল থাকছে। সুবিধা পাওয়া শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে কমবে। বিশেষভাবে আমদানি করা সম্পূর্ণ মোটরসাইকেলের চেয়ে দেশে সংযোজিত মোটরসাইকেলের দাম কম হবে।



সাতদিনের সেরা