kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

হুইপ সামশুলের গ্রেপ্তার চাইলেন মুক্তিযোদ্ধারা (ভিডিওসহ)

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংসদ সদস্য পদ বাতিলে কঠোর হুঁশিয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ মে, ২০২১ ১৯:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হুইপ সামশুলের গ্রেপ্তার চাইলেন মুক্তিযোদ্ধারা (ভিডিওসহ)

এক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাকে লুঙ্গি খুলে পেটানোর হুমকি দেওয়ায় হুইপ সামশুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা না হলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা, সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশসহ কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, হুইপের সমালোচিত নানা কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, পটিয়া বাংলাদেশের অংশ নয়, এটি যেন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। মনে হয় এটি পাকিস্তানের একটি ভূখণ্ড। বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য দেশব্যাপী আলোচিত হুইপ সামশুল হক একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাকে যেভাবে হুমকি দিয়েছেন, তাতে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ব্যথিত। এক মুক্তিযোদ্ধার অপমানে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানি ঘটেছে। অবিলম্বে এই হুইপের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, পটিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের মূল্য নেই। সামশুল হক চৌধুরী যা করছেন তা মানুষ মেনে নেবে না। তিনি এমন কোনো দল নেই যে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হননি। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। আমরা গত কদিন আগে দেখেছি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বস্ত্র খুলে পেটানোর হুমকি দিয়েছেন। এ ছাড়াও সেখানে যত অপকর্ম আছে প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে সামশুল হকের নাম চলে আসে। মানুষকে আপনারা জিম্মি করে রেখেছেন। একদিন জনগণ আপনাদের জবাব দেবে।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুদ্দিন আহম্মদকে লুঙ্গি খুলে পেটানোর হুমকি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। শুধু তাই নয়, তাকে লুঙ্গি খুলে বাজারে ঘোরানোর হুমকিও দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হুইপ, তার ভাই এবং ছেলের অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় হুইপের আক্রমণাত্মক হুমকির মুখে পড়েছেন তিনি। গত ২৭ মে এ বিষয়ে নিয়ে কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশিত হলে সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। ক্ষোভে ফুঁসে উঠেন সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। মুক্তিযোদ্ধাকে লুঙ্গি খুলে পেটানোর হুমকির প্রতিবাদ এবং হুইপ সামশুল হকের বিচারের দাবিতে মুক্তিযোদ্ধারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

জীবনের শেষ সময়ে এসে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে, তা কখনো ভাবতেই পারেননি মুক্তিযোদ্ধা সামছুদ্দিন। হুইপ সামশুল হক ও ভাইসহ ক্যাডারদের এমন হুমকির পর থেকেই পুরো পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। সেই মুক্তিযোদ্ধা সামছুদ্দিন আহম্মদ বলেন, '১৯৬২ সাল থেকে আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। বঙ্গন্ধুর মৃত্যুর পর সবচাইতে বেশি নির্যাতিত হয়েছি আমরা। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের সময় কত নির্মম নির্যাতনের কবলে পড়েছি। তারপরও দলের আদর্শ ছাড়িনি। এখন শেষ বয়সে এসে আবার হুইপের নির্যাতনের কবলে পড়েছি। আওয়ামী লীগের লোক হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই নির্যাতন সহ্য করে চলতে হচ্ছে।

মানববন্ধনে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি দেখুন পটিয়াতে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধারা এবং সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আপনার এবং আপনার দলের যে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব, তাদের কাছেই মানুষ নিরাপত্তাহীন। শামসুল হকদের জন্য আপনার সকল অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। শামসুল হকের বিচারের দাবিতে আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমিন বলেন, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে হুইপ ঘোরতোর অপরাধ করেছিলেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার প্রশ্রয়ে পুত্র নাজমুল করিম শারুনও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের দুষ্কর্মের বিচার যদি আগেই করা হতো, এখন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে লাঞ্ছিত হতে হতো না। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে শুধু বস্ত্র খুলে ঘোরানো নয়, তাঁকে হত্যারও হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাদের এই দুঃসাহস কি করে হয়।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাস্কর রাশা বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায় না। একজন মুক্তিযোদ্ধা সাহস করে তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। ফলস্বরূপ তাকে অপমান-অপদস্ত হতে হলো।

হুইপ সামশুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিলের পাশাপাশি তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে রাশা বলেন, তিনি (হুইপ) সংবিধানবিরোধী যেসব কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন, এতে তিনি কোনোভাবেই জাতীয় সংসদের সদস্য থাকতে পারেন না। তিনি নিয়মিতভাবে অপরাধ করে যাচ্ছেন এবং ধৃষ্টতা দেখিয়ে বিচারের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। এর ফলে পটিয়ার সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।

মঞ্চের নেতারা বলেন, হুইপ সামশুল হকসহ তার ছেলে এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সারা বাংলাদেশে একযোগে কর্মসূচি দেওয়া হবে। আমাদের নেতাকর্মীদের একসঙ্গে নিয়ে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি আরও বেগবান করা হবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, তা বরদাশত করা যায় না। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে।

মানববন্ধনে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দলটি বর্তমানে দেশের ক্ষমতায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আসছেন। তাঁর শাসনকালে দেশের মুক্তিযোদ্ধারা এভাবে অপমানিত হবেন, এটি ভাবাই যায় না। প্রধানমন্ত্রীর সকল অর্জন ম্লান করার জন্য হুইপ সামশুলের মতো কিছু লোক বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে অবৈধ উপায়ে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। এসব অপকর্মের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে অপমানিত হতে হলো। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।

তারা আরো বলেন, আমরা সরকারকে বলতে চাই যদি আপনারা এসব দুর্নীতিবাজ কুলাঙ্গার মানবপাচারকারী এমপিদের শাস্তির আওতায় আনতে না পারেন, দেশের জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করবে। যারা জীবনবাজি রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন, তারাই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, সেটি কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

মানববন্ধনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটি, মহানরী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



সাতদিনের সেরা