kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

নানা ঘটনায় প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ

পর পর দুটি অদ্ভুত জরিমানায় দক্ষতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে সন্দেহ

বাহরাম খান   

২৯ মে, ২০২১ ০২:৪৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নানা ঘটনায় প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ

ফুলগাছের পাতা খাওয়ার অভিযোগে ছাগল আটকে মালিকের অনুপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা করা, নসিমনচালককে আটকে রাখা, সাংবাদিককে সচিব দপ্তরে আটকে হেনস্তা করা—এসব নানা অভিযোগ প্রশাসনের শীর্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠছে। এতে প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সহনশীলতার অভাব লক্ষণীয়। আইন থাকলেও সেসব মেনে চলার ক্ষেত্রে এক ধরনের অবহেলাও রয়েছে। এতে প্রশাসনে আগের মতো শৃঙ্খলাও আর দেখা যায় না।

এ বিষয়ে সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, শাসন বিভাগে সার্বিক সংস্কার না আনলে ভবিষ্যতে এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো ক্যাডারেরই বিশেষ কোনো কৌলীন্য ছিল না। এগুলো কথার কথা। আমাদের সময় দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রথমত, জীবন ধারণের জন্য চাকরিটা আমার প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, চাকরি টিকিয়ে রাখতে ও পদোন্নতি পেতে হলে মানুষকে সেবা দিতে হবে এবং অন্যান্য নিয়ম-কানুন মানতে হবে। এগুলো করলে চাকরি নিরাপদ, পদোন্নতিতেও সমস্যা নেই।’ তিনি বলেন, “বর্তমানে সেই প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। এখন বেতনের ওপর নির্ভর করতে হয় না। বেশির ভাগেরই ‘অন্য’ আয় আছে। পদোন্নতি দলীয়, আত্মীয় ও অনুসারী হিসেবে দেওয়া হয়। সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগ ওঠে, শাস্তি হয় কয়টার? অর্থাৎ কোনো না কোনো পর্যায়ে তাঁরা ছাড় পান। চাকরিও যায় না। এ কারণে দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে।”

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সীমা শারমিন উপজেলা পরিষদ চত্বরে ফুলগাছের পাতা খাওয়ার অভিযোগে গত ১৭ মে একটি ছাগল আটক করেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন। ছাগলের মালিকের অনুপস্থিতিতে জরিমানা করা হয়। পরে ছাগলের মালিক ইউএনওর কাছে গেলে তিনি জরিমানার টাকা দিয়ে ছাগল নিয়ে যেতে বলেন। পরে ছাগল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে ১০ দিন পর গত বৃহস্পতিবার ইউএনও নিজে জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে মালিককে ছাগল ফিরিয়ে দেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থা খোঁয়াড় থাকা সত্ত্বেও মালিকের অনুপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা করা আইনসিদ্ধ কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সচিবালয়ে হাস্যরস হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চরম ক্ষুব্ধ।

ভোলার চরফ্যাশনের ইউএনও রুহুল আমিন এক নসিমনচালককে আটক করে সম্প্রতি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন। গত ৩ মে ইউএনওর গাড়িতে নসিমনের ধাক্কা লাগায় তিনি চালক আরিফকে প্রথমে থানায় দেন। যখন জানলেন প্রচলিত আইনে তাঁর ক্ষতি হওয়া গাড়ির পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব নয়, তখন থানা থেকে আরিফকে নিজের অফিসের একটি কক্ষে এনে আটকে রেখে টাকার জন্য চাপ দেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর দ্রুত চালককে ছেড়ে দেন ইউএনও।

একইভাবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সদরের ইউএনও একজন ইউপি সদস্যের তথ্যের ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা চাওয়া অভাবগ্রস্ত একজন বৃদ্ধকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেন। এই বিষয়টিও গণমাধ্যমে আসার কারণে প্রকৃত ঘটনা মানুষ জানতে পেরেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করেই একজন ইউএনও কিভাবে একজন নাগরিককে জরিমানা করলেন সেই প্রশ্নও উঠেছে। এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এর আগেও এমন আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে মানুষ জানতে পারছে। সম্প্রতি ‘লকডাউন’ চলার সময় রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক ও পুলিশের বাহাস ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক সচিব শেখ ইউসুফ হারুন গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঠ প্রশাসন একটি বিরাট সংগঠন। এখন উপজেলা আছে ৪৯২টি। এর মধ্যে দু-একটি জায়গায় সমস্যা হলে পুরো প্রশাসনকে দায়ী করা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না।’ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ ঠিকভাবেই দেওয়া হচ্ছে।’

শুধু মাঠ প্রশাসন নয়। প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরেও সহনশীলতার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি পত্রিকার সাংবাদিককে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করার ঘটনায় প্রশাসনের অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তাও অবাক হয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সহকারী সচিব নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, সাংবাদিক অপরাধ করতেই পারেন, তিনিও তো মানুষ। আর সচিবের দপ্তরে এমন ঘটনা সামাল দিতে না পারা শুধু ব্যর্থতাই নয়, অনেক বড় অপরাধের অভিযোগ তোলার মতো ঘটনা।

কিছুদিন আগে বদলি হওয়া স্বাস্থ্যসচিব আব্দুল মান্নান গত ফেব্রুয়ারি মাসে কিশোরগঞ্জে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। নিজ এলাকায় একটি কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে সেখানে সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনাও ঘটেছে। পেশাদার আমলারা এমন ঘটনার জন্ম হতে দেন না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সচিব পর্যায়ে তো চিন্তাই করা যায় না।

সাংবাদিককে হেনস্তা করার ঘটনায় আমলাদের বাড়াবাড়ি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও মন্ত্রী প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, মাঠ প্রশাসনে কাজের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকতে হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখন প্রায়ই কোনো না কোনো নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক সময় ছিল কর্মকর্তাদের তিন জায়গা থেকে নজরদারি করা হতো। প্রথমত, প্রশাসনের ভেতর থেকে; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ থেকে এবং তৃতীয়ত, আদালতের বিষয়েও সতর্ক থাকতেন কর্মকর্তারা। কিন্তু এখন বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যর্থতায় সেই শৃঙ্খলাটা নেই। ফলে এসব ঘটনা ঘটছে।

সাবেক সচিব ফাওজুল কবির খানের মতে, ‘সরকারি কর্মচারীদের সার্বিক কার্যক্রমে সংস্কারের বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে সংস্কারটা কে করবেন? যাঁরা করবেন তাঁরাই তো ঠিক নেই। তাই এই সমস্যা সমাধানে কোনো ওষুধ নেই। যখন সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিস্থিতি খারাপ হওয়া থেকে ভালোর পথে আনার চেষ্টা না করা হয়, তখন সময়ই ঠিক করে দেয় কখন কী হবে। আমাদের হয়তো সেই অপেক্ষায় থাকার বিকল্প নেই।’

মন্তব্য জানতে চাইলে জনপ্রশাসন আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-কানুন ভালোই আছে। কিন্তু সেগুলো মেনে চলার প্রবণতা অনেক অফিসারের মধ্যে থাকে না। যাঁরা আইন বাস্তবায়ন করবেন তাঁদের মধ্যেই যদি এমন অবহেলা থাকে তাহলে সেটা লজ্জার।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের যে পর্যায়ের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে সেই পর্যায়ের সেবা দৃশ্যমান হচ্ছে না।’



সাতদিনের সেরা