kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

কালান্তরের কড়চা

জাতীয় কবি এবং তাঁর জ্যোতির্ময় পুরুষ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী   

২৫ মে, ২০২১ ০৩:৫৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জাতীয় কবি এবং তাঁর জ্যোতির্ময় পুরুষ

আজ পঁচিশে মে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মবার্ষিকী। আমরা বলি বটে নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে তাঁর প্রভাব কতটা বর্তমান তা একটি বিতর্কের বিষয়। কবির জীবনদর্শন ছিল মানবতা এবং শান্তি। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা উপমহাদেশেই এই মানবতা ও শান্তি আজ অনুপস্থিত। শান্তি কথাটির সঙ্গে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক শান্তির কথাও আসে। কবি ছিলেন তখনকার শাসক শক্তি ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। কিন্তু সমাজে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপসহীন মানুষ। তাঁর ‘অগ্নিবীণার’ কবিতায় তিনি আগুন ঝরিয়েছেন। তা-ও সমাজে সাম্য ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য। তাঁর ‘সাম্যের গান’ কবিতার বইয়ে তিনি মার্কিন কবি হুইটম্যানের চেয়েও মানবতার দাবিতে উচ্চকণ্ঠ, তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত জীবনদর্শনের মূলকথা, ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

এই অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন বাঙালির আদিকালের। সেই আদিকালে চণ্ডীদাস বলেছেন, ‘শোনহে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ বাঙালিদের মধ্যে শ্রেণিভেদ, অচ্ছুত প্রথা ইত্যাদি বহিরাগত শাসকদের দ্বারা প্রবর্তিত হওয়া সত্ত্বেও আদি বাঙালি ও মধ্যযুগের বাঙালিদের মধ্যেও গোত্রভেদ ছিল, উঁচু-নিচু ভেদ ছিল না। মোগল-পাঠান রাজত্বের আগে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ‘আশরাফ-আতরাফ’ শ্রেণিভেদ ছিল না।

আজ সৌদি আরবে রামায়ণ ও মহাভারত স্কুল কলেজে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কয়েক শ বছর আগে সুবে বাংলায় হোসেন শাহি আমলে প্রথম রামায়ণ ও মহাভারত নবাবদের আনুকূল্যে বাংলায় অনুবাদ শুরু হয়। মোগল সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে শাহজাদা দারা উপনিষদ ফার্সিতে অনুবাদ করে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের কোপে পড়ে ছিলেন। ইংরেজ আমলে শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তন গান লিখে নজরুল মৌলবাদীদের কাছ থেকে ‘কাফের’ খেতাব পেয়েছিলেন। তাঁর জীবননাশের চেষ্টা হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি কতটা অসাম্প্রদায়িক ছিলেন তার প্রমাণ হিন্দু পরিবারের প্রমীলা দেবীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ।

মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের কাছে একটা গল্প শুনেছি। নজরুল রক্ষণশীল মওলানা আকরম খাঁ এবং তাঁর পত্রিকা মোহাম্মদী নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গ করলেও মওলানা সাহেবের স্ত্রীর কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। নজরুলের লেখা গান শুনতে তিনি ভালোবাসতেন। নজরুলকে নিয়ে তখন অবিভক্ত বাংলায় নিন্দার ঝড় বইছে। তিনি তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!’ এই লাইনটি লিখে তখনকার রক্ষণশীল হিন্দু এবং মুসলমান দুই সমাজেই নিন্দিত হচ্ছেন। রক্ষণশীল হিন্দুরা তাঁকে বলছে, নাস্তিক ম্লেচ্ছ এবং রক্ষণশীল মুসলমানরা তাঁকে গালি দিচ্ছে কাফের বলে।

এই সময় মওলানা আকরম খাঁর পত্নী একদিন কলকাতার সব জাঁদরেল মওলানাকে তাঁর কলকাতার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। বাড়ির বসার ঘরে একটা উঁচু মঞ্চের মতো তৈরি করে তা পর্দার আড়াল দিয়ে রাখা হলো। মওলানা সাহেবরা তাঁদের আসন গ্রহণ করলে পর্দার আড়াল থেকে দরাজ গলায় গজল ভেসে এলো—‘ইসলামেরই সওদা লয়ে এলো কে ওই সওদাগর।’ পরেই আরেকটি গজল, ‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে, যেন পূর্ণিমারই চাঁদ দোলে।’ গায়ক দরদি কণ্ঠে গাইলেন, ‘ফোরাতের পানিতে নেমে কাঁদে মাতা ফাতেমায়।’

গজল শেষ হলো। আমন্ত্রিত মওলানা সাহেবরা তখন ভাবাবেগে আপ্লুত। আকরম খাঁ সাহেবের পত্নী তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই গজল যিনি গাইলেন, তিনিই এগুলো লিখেছেন, তাঁর সম্পর্কে আপনাদের অভিমত কী? মওলানা সাহেবরা তখন ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘এই কবির জন্য জান্নাতুল ফিরদাউসের দরজা খোলা। তাঁর কোনো হিসাব-কিতাবের দরকার হবে না।’ মঞ্চের পর্দার আড়াল থেকে যুবা গায়ক বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখে মওলানা সাহেবদের চক্ষু চড়কগাছে। এ যে তাঁদের কথিত কাফের কবি নজরুল। তাঁদের মুখে তখন আর কথা নেই।

এ রকম আরেকটি ঘটনার কথা লিখছি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাটি জেনেছি। চল্লিশের দশকের গোড়ায় দেশ ছেড়ে জার্মানিতে চলে যাওয়ার আগে একবার কবি নজরুলকে সুভাষ বসু বললেন, ‘কাজী দা, আমার পরিবারের লোকজন আমার রোগ মুক্তির জন্য এবার ঘটা করে দুর্গাপূজা করতে চায় আমাদের বাড়িতে। পূজা সহ্য হয়, কিন্তু পূজার ওই উৎকট বাদ্যি আর গান আমার সহ্য হয় না। কী করি বলুন তো?’ নজরুল হেসে বললেন, ‘আপনি ভাববেন না, এবার পূজায় আপনার বাড়িতে গান গাইব আমি।’ সুভাষ বসু বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘পূজার গান গাইবেন আপনি?’ নজরুল বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার লেখা গান।’ কলকাতায় সুভাষ বসুর এলগিন রোডের বাসায় নজরুল গান গেয়েছিলেন, ‘রক্তাম্বর পরো মা এবার ছিড়ে ফেলো ঐ শ্বেতবসন/দেখি ঐ করে বাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন ঝন।’ গানটি শুনতে শুনতে নেতাজি সুভাষ বসু কাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।

বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক (রাজনীতিকও) আবুল মনসুর আহমদ নজরুলের একজন অনুরাগী বন্ধু ছিলেন। তিনি নজরুলকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, “বাঙালি হিন্দুর ঘরে আনন্দময়ীর আগমন-বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব ছিল রবীন্দ্রনাথের। (তাঁর গান ‘আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে’)। অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানের আকাশে রমজানের শেষে খুশির ঈদের চাঁদ ওঠানোর দায়িত্ব ছিল নজরুলের।”

আবুল মনসুরের এই বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে পঞ্চাশের দশকের বিখ্যাত প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘নবযুগের’ ঈদসংখ্যায় (১৯৪৫) লিখেছেন, “এক বাঙালির ঘরে আনন্দময়ীর গান এবং আরেক বাঙালির আকাশে ঈদের চাঁদ—এই দুয়ে মিলিয়ে বাঙালি জাতি। এই বৃহত্তর বাঙালি জাতির কবি নজরুল। রবীন্দ্রনাথের আনন্দময়ীর আগমনের গানের পাশে তাই নজরুলের গান—‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’।”

নজরুল দেশ ভাগ চাননি। বাংলা ভাগ তো নয়ই। গান্ধী ও জিন্নাহ এই দুই নেতা সম্পর্কেই তিনি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন, লিখেছিলেন, ‘এই স্যুট-প্যান্টধারী জিন্নাহ ভারতের মুসলমানদের নেতা, আর এই হাঁটুর ওপর ধুতি তোলা গান্ধী ভারতের হিন্দুদের নেতা—এ কথা ভাবতে দুঃখ লাগে। আমি এক জ্যোতির্ময় পুরুষের আগমনের অপেক্ষায় আছি, যিনি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কারো নয়, তিনি সকল ধর্মের বাইরে এক জ্যোতির্ময় মহানায়ক। আমি তাঁর আগমন বার্তা পাচ্ছি।’ (দৈনিক নবযুগ, উপসম্পাদকীয়, ২ নভেম্বর ১৯৪৩)।

নজরুলের এই কল্পিত জ্যোতির্ময় পুরুষ কে ছিলেন? নজরুল তা ভেঙে বলেননি। বলার সময় পাননি। বলার আগেই মানসিক অসুস্থতায় নির্বাক-নিশ্চল হয়ে যান। তাঁর ভক্তদের মধ্যে তখন কেউ কেউ অনুমান করেছেন, এই জ্যোতির্ময় পুরুষটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। গান্ধী-জিন্নাহর চেয়ে যাঁকে তিনি শ্রেষ্ঠ নেতা মনে করতেন। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের প্রথম স্ত্রী, কবি রাধারানী দেবী ও নরেন দেবের কন্যা কবি এবং পণ্ডিত নবনীতা দেবসেনের মতে, নজরুলের কল্পজগতের এই জ্যোতির্ময় পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যখন কলকাতায়, তখন আনন্দবাজার পত্রিকার এক সাংবাদিক আমাকে নবনীতা দেব সেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই পরিচয় কিছুদিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। প্রায়ই নবনীতা দেব সেনের বাসায় যেতাম। আরো দু-একজন আসতেন। চমৎকার আড্ডা জমত। এই আড্ডায় নবনীতা একদিন বললেন, ‘স্বাধীন বাংলার নেতা ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যে শেখ মুজিবের আবির্ভাব হতে যাচ্ছে, তিনিই কবি নজরুলের মানসলোকের জ্যোতির্ময় পুরুষ। নজরুল তাঁকে নেতা মুজিব হিসেবে দেখেননি। কিন্তু তাঁর কবি কল্পনায় শেখ মুজিব জ্যোতির্ময় পুরুষ হিসেবে দেখা দিয়েছেন। আপনারা দেখবেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যেদিন স্বাধীন দেশে ফিরবেন, সেদিন তিনি তাঁর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলবেন নজরুলের স্বপ্নাদর্শ ভিত্তি করে।’

বহুকাল আগে নবনীতা দেব সেন এ কথা কটি বলেছিলেন; কিন্তু আমার মনে হয় তিনি সঠিকভাবেই তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা, মিশ্র সংস্কৃতির ছবি ধরা পড়ে নজরুলের কাব্যে ও সাহিত্যে, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ যেন তার প্রকৃত প্রতিভূ। নজরুল লিখেছিলেন, “হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?/কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র?” হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে বাঙালি বহুবার মৃত্যুযজ্ঞে আহুতি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আহুতি হয়েছে দুবার। একবার ১৯৪৩ সালে গ্রেট ফেমিনে। আরেকবার ১৯৭১ সালে গ্রেট ওয়ার অব ইনডিপেনডেন্সে। নজরুল ১৯৪৩ সালে ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক রোগে নির্বাক হচ্ছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কলকাতায় পত্নী প্রমীলার সঙ্গে বসবাস করছেন। তিনি যে শুধু কবি নন, একজন শক্তিশালী গদ্য লেখক তার পরিচয় দিয়েছেন ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসের চরিত্রও তৈরি হয়েছে বাঙালি মুসলমান সমাজের বাস্তব অবস্থা দ্বারা।

কবির স্বপ্নের জ্যোতির্ময় পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সসম্মানে নিয়ে এসেছিলেন সরকারি তত্ত্বাবধানে ঢাকায় বসবাসের জন্য। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালে। তার এক বছর পর ১৯৭৬ সালে কবির মৃত্যু হয়। তৎকালীন সামরিক শাসক কবির মৃতদেহ দাফন করার ব্যাপারে কবির পরিবারের সঙ্গে যে অসম্মানজনক খেলা খেলেছিল তা লজ্জাকর। সে কাহিনি আজ নয়। আজ আমাদের জাতীয় কবির ১২২তম জন্মবার্ষিকী। তাঁকে হৃদয়ের সব শ্রদ্ধা, ভক্তি দিয়ে স্মরণ করি। সালাম জানাই। জয়তু নজরুল।

লন্ডন, রবিবার, ২৩ মে, ২০২১



সাতদিনের সেরা