kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

প্রণোদনা নিয়েও কথা রাখেননি মালিকরা

জিয়াদুল ইসলাম   

২৫ মে, ২০২১ ০২:৩৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



প্রণোদনা নিয়েও কথা রাখেননি মালিকরা

অনেক কষ্টে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি জুটিয়েছিলেন শরিফুল ইসলাম। ছোট ভাইকে নিয়ে থাকতেন যাত্রাবাড়ীর দনিয়ায়। দেশে করোনার প্রথম ঝড় আসার পর সরকারঘোষিত টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির সময় সব কিছু বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর বেতনও আটকা পড়ে। পরে ছুটি শেষে প্রতিষ্ঠানটি যখন খোলে, তখন চাকরিটাও হারান শরিফুল। এরপর ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রামেই ফিরে যেতে হয় তাঁকে। শরিফুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টানা ছুটি শেষে ওই প্রতিষ্ঠান আবার চালু হলে আমি কাজে যোগ দিই। কিন্তু আমাকে এক দিনের নোটিশে চাকরি ছাড়তে বলা হয়। সেই থেকে আমি বেকার। এখন চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু পাচ্ছি না।’ শরিফুলের মতো এমন অনেকেই করোনার আঘাতে হারিয়েছেন কর্ম। যাঁরা হারিয়েছিলেন কর্ম, তাঁদের বেশির ভাগই এখনো বেকার।

দেশে করোনা সংক্রমণের পর সরকার বিভিন্ন খাতে প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার উদ্দেশ্যই ছিল ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া। যাতে চলতি মূলধন সংকটে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে না যায়, কর্মীদের যেন নিয়মিত বেতন হয়, কাউকে যেন ছাঁটাই করা না হয়। কিন্তু প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা নিয়েও কথা রাখেননি মালিকরা। তাঁরা এখনো ছাঁটাই করছেন কর্মী, দিচ্ছেন না নিয়মিত বেতন-ভাতাও। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক কর্মীদের বেতনও কমিয়ে দিয়েছেন।

বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে, করোনার পর থেকে তৈরি পোশাক খাতেই কয়েক লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া করোনার কারণে নতুন নিয়োগও প্রায় বন্ধ। করোনার বিষে দেশে কর্মহীন ও বিদেশফেরত লোকের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তারাও করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে যাঁরা নতুন চাকরির খোঁজে রয়েছেন তাঁরাও সংকটে পড়েছেন।

করোনার ক্ষতি পোষাতে গেল বছরের এপ্রিলের পর থেকে বিভিন্ন খাতে যে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ঘোষণা করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগ সুবিধাই নিয়েছে তৈরি পোশাক এবং বড় ও সেবা শিল্প খাত। অথচ শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশের জোগান দেওয়া কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে যে তহবিল বরাদ্দ ছিল তাও ঠিকমতো পৌঁছায়নি। ব্যাংকের অনাগ্রহে এই তহবিলের ৩০ শতাংশ টাকা এখনো পড়ে আছে।

গত ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মাত্র ১০ শতাংশ অবদান রেখে সরকারঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনার টাকার অর্ধেকের বেশি নিয়েছে তৈরি পোশাক খাত। শ্রমিকদের ছুতা দিয়ে এই প্রণোদনা নেওয়া হলেও বরাদ্দের মাত্র ১৬ শতাংশ পেয়েছেন শ্রমিকরা। এ ছাড়া পোশাক খাতের মোট ৩০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ৫৮ শতাংশ শ্রমিক প্রণোদনার টাকা পেলেও ৪২ শতাংশ শ্রমিক বঞ্চিত হয়েছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রণোদনা পেয়েও যদি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়, তাহলে প্রণোদনা দেওয়ার মানেটা কী? তারা প্রণোদনার টাকাও নিল, আবার শ্রমিক ছাঁটাইও করল। এটা তো একেবারেই অনৈতিক। তিনি বলেন, পোশাক খাতে প্রণোদনা দেওয়াই হয়েছিল শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য। কিন্তু এ খাতেই বেশি ছাঁটাই হয়েছে। এটা খুবই অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য। প্রণোদনা নেওয়ার পরও যেসব কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করেছে, তাদের সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার মাধ্যমে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন তিনি। এ ছাড়া আসন্ন বাজেটে সব খাতের চাকরিহারাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষেও মত দেন ড. তৌফিক আহমেদ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, করোনায় তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেলেও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে তারা তেমন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বরং প্রণোদনার ক্ষুদ্র অংশ পেয়েছেন শ্রমিকরা। এটি মাত্র ১৬ শতাংশ, তার ওপর বিতরণে হয়েছে বৈষম্য। এমনকি অনেক কারখানা লে-অফও করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনা সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার হয়েছেন। চাকরি করতেন এমন ১৩ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। চাকরি আছে কিন্তু বেতন নেই, এমন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। আর ২৫ শতাংশ চাকরিজীবীর বেতন কমেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের সুফল প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা একেবারেই পাচ্ছে না, এমনটি বলা ঠিক হবে না। তবে এটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা হওয়া উচিত। প্রণোদনা না দিলে কী হতো আর প্রণোদনা দেওয়ার ফলে কী হয়েছে, এই তুলনা করে গবেষণা করতে হবে। এ ছাড়া প্রণোদনা প্যাকেজ ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলো কি না, সেটারও গবেষণা করা উচিত। তাঁর মতে, আসন্ন বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিদ্যমান ব্যবসা ও চাকরির খাতগুলো টিকিয়ে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে চাকরিহারাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

করোনার প্রেক্ষাপটে সবার আগে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করে সরকার। গত ২ এপ্রিল ঘোষিত এই তহবিল থেকে এককালীন ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে এই ঋণ নিয়েছেন রপ্তানিকারকরা। এপ্রিল ও মে মাসের বেতনেই এই তহবিলের চার হাজার ৮২১ কোটি টাকা খরচ হয়। এরপর জুন ও জুলাইয়ের বেতন বড় ও সেবা শিল্প খাতের জন্য ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের আওতায় দেওয়া হয়। এর মধ্যে জুনে দেওয়া হয় দুই হাজার ২৬৩ কোটি ও জুলাই মাসে দুই হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চার মাসে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ ৯ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর থেকে এ খাতেই বেশি শ্রমিকের চাকরি গেছে। এখানেই শেষ নয়, যাঁদের চাকরি যায়নি তাঁদের মজুরি কাটা হয়েছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডাব্লিউএস) হিসাবে, মহামারির শুরু থেকে এই বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা অন্তত তিন লাখ। তাঁদের মধ্যে অনেকে তাঁদের বকেয়া বেতন বা ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। আর কাজে থাকা শ্রমিকদের মজুরি কাটা হয়েছে ব্যাপক হারে। মজুরি কাটার এই হার ৩৫ শতাংশ।

এ বছরের এপ্রিলের শেষদিকে প্রকাশিত দ্য উইকেস্ট লিংক ইন দ্য গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন : হাউ দ্য প্যানডেমিক ইজ অ্যাফেক্টিং বাংলাদেশ’জ গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক কারখানাগুলো গড়ে তাদের ১০ শতাংশ শ্রমিককে হয় ছাঁটাই করেছে, না হয় ছুটিতে পাঠিয়েছে। এ সময়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়া ৭২.৪ শতাংশ শ্রমিক তাঁদের বকেয়া মজুরি পাননি। একই ঘটনা ঘটেছে লে-অফের শিকার ৮০.৪ শতাংশ শ্রমিকের ক্ষেত্রেও।

তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘করোনার শুরুতে ৬০-৭০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁরা আবার কর্মস্থলে বা অন্য কোথাও যোগ দিয়েছেন। এখন আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

করোনায় রপ্তানিকারকরা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পান সে জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ৩.৫ বিলিয়ন থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। এর ফলে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হয়। এই তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ৪.৪০ বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।

করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু এ খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ চেয়েও পাচ্ছেন না। সরকারঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এই তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৭২.৭৫ শতাংশ। এর মানে এখনো প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল পড়ে আছে। তবে বড় ও সেবা শিল্প এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল খাতে বরাদ্দের টাকা খু্ব দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত ৪ মে পর্যন্ত বড় ও সেবা শিল্প খাতে বরাদ্দ ৩৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ৩১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৯৫.৪৭ শতাংশ। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের দিক থেকে এ তহবিলটিই এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মোটামুটিভাবে পুরো প্যাকেজটাই ছিল সমন্বিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ। এটা বাস্তবায়ন করা জরুরি ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার, বেশির ভাগ প্যাকেজ ঋণনির্ভর হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা যথাসময়ে তা বিতরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ চেয়েও পাননি।



সাতদিনের সেরা