kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

আমলাদের বাড়াবাড়িতে ক্ষুব্ধ আ. লীগ নেতারা

► প্রশাসনের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ ► আগুনে ঘি ঢালছেন আইসিটি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব

তৈমুর ফারুক তুষার ও বাহরাম খান   

২১ মে, ২০২১ ০২:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমলাদের বাড়াবাড়িতে ক্ষুব্ধ আ. লীগ নেতারা

সরকারি অনেক কর্মকর্তার নানা বিতর্কিত কাজ ও বাড়াবাড়ির ঘটনায় ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অনেক ভালো কাজ আমলাদের বাড়াবাড়ির কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে, সরকারকে সমালোচনায় পড়তে হচ্ছে। পেশাজীবীদের সঙ্গেও সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে ওই সব আমলার কর্মকাণ্ডে। গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠ’র কাছে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ক্ষোভ জানিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন।

সাবেক আমলাদের কয়েকজন কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, অযোগ্য, অদক্ষ কর্মকর্তাদের অতিমূল্যায়নের কারণে তাঁরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়ছেন।

গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তাঁরা অনেক আমলার বেপরোয়া আচরণ, দুর্নীতি, ক্ষমতার দম্ভ, বিতর্কিত নানা সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে প্ররোচিত করার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো কিছুতেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, দাম্ভিক আচরণ অথবা মানুষকে হয়রানি—এগুলো রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়। এটা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এটা এগিয়ে যাওয়ার পথে, উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃৃষ্টি করবে। এটা পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটা নষ্ট করে দেয়। এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না, সমর্থন করা যায় না।’

দলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমলাতন্ত্র ও পুলিশে জামায়াত-বিএনপির অনুপ্রবেশকারীরা নানা বিতর্কিত ঘটনা ঘটাচ্ছে। সামনের দিনে এগুলোর পরিমাণ আরো বাড়বে। সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য তারা কাজ করবে। এটা তাদের অ্যাসাইনমেন্ট। এখন জামায়াত-বিএনপি  রাস্তায় নেই। সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে তাদের অনুসারীরা সরকারকে বিতর্কিত করতে কাজ করছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক দিন আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটা নিয়ে পরিবেশবাদীদের মুখোমুখি সরকারকে দাঁড় করিয়ে দিল আমলারা। এর আগে ডাক্তারদের সঙ্গে ঝামেলা করল, এখন সাংবাদিকদের সঙ্গে করছে।

দলের সভাপতিমণ্ডলীর তিনজন সদস্যের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা আমলাদের বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁদের দুজন বলেছেন, আমলাদের কারণে বর্তমানে রাজনীতিবিদরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সরকারের সব সিদ্ধান্তে আমলাদের মতই প্রাধান্য পায়। কিন্তু ওই সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সমস্যা হলে সমালোচনার দায় এসে পড়ে সরকারের ঘাড়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষোভ জানাচ্ছেন। মঙ্গলবার দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ তাঁর ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে নয়, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে দেশ-জাতি উপকৃত হবে।’

সাবেক সংসদ সদস্য ও যুব মহিলা লীগ নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিন ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কখনো মঙ্গল বয়ে আনে না। একজন নারী সাংবাদিকের ওপর যে আচরণ হয়েছে তা লজ্জাজনক।’

প্রশাসনের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ

সরকারি চাকরিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অবস্থান সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বলে ধরা হয়। দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের বড় ভূমিকা থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসন ক্যাডারের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তাই অকল্পনীয় অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন, যা ওই ক্যাডারের ভালো কর্মকর্তাদেরও অবাক করছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন সচিবের দপ্তরে সাংবাদিককে কেন্দ্র করে একটি ঘটনার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে না পারা অনেক বড় ব্যর্থতা, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সচিবালয়ের মতো জায়গায় এভাবে একজন নারীকে আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসনে দক্ষতার অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কৌশলী হতে হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘটনায় তাঁরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আইনের লঙ্ঘন করলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু তাঁরা বিষয়টা সেভাবে হ্যান্ডল করতে পারেননি।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যেখানে সাংবাদিক নির্যাতন ও হেনস্তার জন্য অভিযুক্ত, তারা কিভাবে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে? একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি হতে পারে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে, সরকার ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত অবৈধ কমিটি বাতিল করা হোক।’

আগুনে ঘি ঢালছেন আইসিটি বিভাগের যুগ্ম সচিব

সাংবাদিককে জেলে পাঠানো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘সাহসী’ পদক্ষেপ অভিহিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সগর্বে পোস্ট দিয়েছেন আইসিটি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। গতকাল তাঁর ফেসবুকে আখতারুজ্জামান লিখেছেন, ‘ইদানীং সরকারি অফিসগুলোতে সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। কোনো কোনো অফিস আবার মাসোহারা দিয়ে সাংবাদিক রাখে।...আমি মনে করি, সব মন্ত্রণালয়ের এ রকম (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো) নজির স্থাপন করা উচিত। অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য এমন একটি সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য...’।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় যখন দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমলোচনা হচ্ছে, তখন একজন যুগ্ম সচিবের এমন মন্তব্য অনপ্রিভেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি কর্মচারী হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের যে নীতিমালা আছে, সেটা আখতারুজ্জামান লঙ্ঘন করেছেন।



সাতদিনের সেরা