kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

ঈদের নাটক থেকে ঈদের তামাশা

মোস্তফা মামুন   

২০ মে, ২০২১ ০৩:৪৬ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ঈদের নাটক থেকে ঈদের তামাশা

ঈদ শেষ হয়ে গেল। এবারের ঈদেও বিস্তর নাটক-টেলিফিল্ম নিশ্চয়ই প্রচারিত হয়েছে। ধারণা করি, এর বেশির ভাগেই অপূর্ব অভিনয় করেছেন। বেশির ভাগেই মেহজাবিন তাঁর সঙ্গে কান্নাকাটিতে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু অসাধারণ কাজ নিশ্চয়ই হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা জানব পরের সপ্তাহে পত্রিকার বিনোদন পাতার রিভিউ দেখে।

নিজে কিছু দেখার চেষ্টা করেছিলাম। মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি। বিজ্ঞাপনের জ্বালা তো আছেই, সেই ফাঁক পেরিয়ে যখন নাটক আসে, তখন একেবারে জ্বলে যাওয়ার অবস্থা। এমন বদখত সব নাম, এমন হাস্যকর সব কাণ্ড, এমন ভাঁড়ামোতে ভরা অভিনয়, এমন অদ্ভুতুড়ে সব কাহিনি। দেখতে দেখতে মনে হয়, সেসব বোধ হয় অন্য জন্মের কথা, যখন ঈদ এলে এই কারণেও আমরা খুশি হতাম যে দারুণ কিছু অনুষ্ঠান দেখা যাবে। আনন্দমেলায় এবার উপস্থাপক কে হবেন সেটা ছিল প্রায় কোটি টাকার প্রশ্ন। এবারের ঈদের নাটক কে লিখছেন সেটা নিয়ে বাজি ধরাধরি চলত রীতিমতো।

কেন এমন হলো? এটা কয়েক কোটি টাকার প্রশ্ন। খুব সরল উত্তর নেই, আমি সেই বিশেষজ্ঞও নই; তবু কিছু পতনের পথটা দেখতে পেয়েছি বলে অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলি। টিভি নাটকের স্বর্ণযুগ আরো বিস্তৃত হলো যখন ইটিভি এলো। এর আগ পর্যন্তও মান প্রশংসনীয়ই ছিল; কিন্তু একটা মাত্র চ্যানেল হওয়ার কারণে কিছু মানুষ জেঁকে বসেছিলেন। ইটিভি আটকে থাকা সেই জানালাটা খুলে দিল। নতুন নির্মাতারা সুযোগ পেয়ে বদলের হাওয়া আনলেন। দারুণ কাজ হতে শুরু করল। সম্ভাবনা পরের প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করল নির্মাণের নেশা। কয়েক বছরের মধ্যে আরো সব দারুণ নির্মাতা। সাইদুল আনাম টুটুল, সেলিম, আহির আলম, আতিক ও ফারুকী। বাকিরা আনলেন গল্প বলায় পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া, গভীর বোধ, দৃষ্টিতে নতুনত্ব। ফারুকী আবার বলার ধরনটা বদলে সময়ের সঙ্গে এমন মেলালেন যে তিনিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এবং একভাবে দেখলে নির্মাণ বিষয়টাকে খুব সহজ একটা ব্যাপারে পরিণত করলেন। অভিনয়ে বাহুল্যের বদলে বাস্তবতা, ঘরোয়া ঢংয়ের উপস্থাপন, ভারী সংলাপের বদলে মুখের ভাষার (যদিও সেই ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে) ব্যবহার। সঙ্গে স্ক্রিপ্ট নিয়ে পুরো পড়ে না থেকে উপস্থিত দৃশ্য তৈরি—এসব দেখে হয়তো অনেকের মনে হলো আরে এটা তো খুব সহজ কাজ। কিন্তু সহজ কাজটা করা যায় না সহজে। ফল হলো, এক পক্ষ ফারুকীর অন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে সব কিছুকে এমন গোলমেলে করে ফেলল যে পুরো বিষয়টা প্রায় তামাশা। ওদের গল্প লাগে না, অভিনেতা লাগে না, চরিত্র লাগে না। ক্যামেরা ধরো, ঝগড়া করো, গালি দাও, চলে যাও—এই করতে করতে যা দাঁড়াল সেগুলোই আজকের নাটক। তাতেও প্রথম কয়েক বছর চলেছে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রায় সব নাটক একই রকম। একই মানুষ। একই সংলাপ। একই গল্প। আসলে গল্পহীন। যত দিন মানুষ বাধ্য ছিল দেখেছে আর যে-ই সুযোগ পেয়েছে ভেগেছে। নেটফ্লিক্স-অ্যামাজন প্রাইম এখন, এর আগে ওরা ঝুঁকেছে ভারতের চ্যানেলে। নির্মাণের দিক থেকে আরো নিম্নমানের নাটক ভারতীয় সিরিয়ালগুলো, বিশ্রী রকমের পারিবারিক নোংরামিই বেশির ভাগ; তবু খুব সম্ভব গল্প আছে বলে একটা আকর্ষণ আছে।

একবার এক পারিবারিক আয়োজনে সবাই মিলে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার সময় দেখি উত্তেজনা, সবাই একটা ভারতীয় সিরিয়াল দেখবে। কয়েকজন বুড়ো বয়সের এবং একেবারে যাকে বলে সুশীল শ্রেণিভুক্ত উচ্চশিক্ষিত। আছেন আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও। আবার অল্প বয়সের গৃহকর্মীরাও। বয়সের হিসাবে তিন প্রজন্ম, নানা অর্থনৈতিক শ্রেণিকে একীভূত করে প্রায় সাম্যের দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে একটা সিরিয়াল। বিটিভি যুগের বহুকাল পর এমন দৃশ্য। কৌতূহলে দেখতে বসলাম। খুব ভালো লাগল এমন নয়; কিন্তু দেখলাম ওরা সবাই খুব উপভোগ করছে। কেন? গল্প? সেটা খুব শক্তিশালী না হলেও আছে। কিন্তু মনে হলো, এর চেয়েও বড় কারণ সব রকমের মানুষের উপস্থিতি। আমাদের নাটক তত দিনে এত আধুনিক আর এত তারুণ্যময় হয়ে গেছে বাবা-চাচা-খালা-মামা এই জাতীয় চরিত্র নেই বললেই চলে। চরিত্রাভিনেতারা তাই বেকার হয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে অভিনয় জানা লোকেরা নানা ঝামেলা করে বলে নিজের চেনা একে-ওকে দিয়েও চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিনয় জানা লোকদেরও তাই কদর নেই। সত্যিকারের শিল্পীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেউ খেয়ালই করল না। তখন রমরমা দিন ছিল, দিনের আলোটাই সবাই দেখছিল, সন্ধ্যার পর যে অন্ধকার আসবে, তাদের খেয়াল হয়নি। অন্ধকার এলো। মানুষ মুখ ফেরাতে শুরু করার পরই আর স্পন্সর নেই। টাকা নেই। নাটকের বাজেট এমন হাস্যকর পর্যায়ে নেমে এলো যে ভালো পরিচালকরা আর নাটক বানাতে আগ্রহী হন না। যে বাজেট এখন তাতে এসব ফাজলামি ছাড়া আর কিছু করা যায় না। সোনালি দিনে খামখেয়ালিতে যে ফাঁদ নাটকের মানুষরা তৈরি করেছেন, এখন তাতেই নিজেরা দম বন্ধ হয়ে মরছেন।

এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল। ২০০৪-০৫ সালের দিকে নিজেও খানিকটা ঢুকে পড়লাম নাটকের জগতে। গল্পটল্প লিখি বলে কিছু পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ হলো, অনিমেষ আইচ কয়েকটা গল্প নিয়ে নাটক বানালেন। সেগুলো চটজলদি প্রচারিত হয়ে যাওয়া এবং প্রতিক্রিয়াতে বেশ উত্তেজিত বোধ করলাম। তা ছাড়া কাঁচা পয়সার ব্যাপারও ছিল। কোনো বিশেষ দিবস উপলক্ষে লেখা একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে এক পরিচালক ভীষণ উত্তেজিত। খুব করে বললেন, সেটে আসতেই হবে। তারকা-গ্ল্যামারের মানুষদের সঙ্গে খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করি না, তবু পরিচালকের উত্তেজনায় গেলাম। প্রথমেই দেখা এখনকার সময়ের খুব নামকরা একজনের সঙ্গে, যিনি পরিচয় পেয়েই খেপে উঠলেন, ‘কী লিখেছেন? একেবারে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা?’

নিজের রচিত নাটকের সেটে অনেক রকম বিপদের আশঙ্কা করেছি; কিন্তু এমন বিরূপ অভ্যর্থনা তো কল্পনাতীত। একটু ঠাণ্ডা হলে ওর আপত্তির কারণ জানা গেল। নাটকে তাঁর চরিত্রটা ছিল ন্যাড়া মাথার। তিনি বললেন, ‘ন্যাড়া মাথা...আপনার এক নাটক করতে গিয়ে ১০টা নাটক নষ্ট করি আর কি?’

অবাক হয়ে বললাম, ‘এক ঈদে ১০টা নাটক?’

তিনি হাসেন, ‘আরো অনেক বেশি ছিল। ২০টার মতো ছিল। কমিয়েছি। আমি আবার বেছে বেছে কাজ করি।’

তিনি গেলেন। এবার এলেন প্রধান ক্যামেরাম্যান। তিনি আরো যুদ্ধংদেহি। কঠিন গলায় বললেন, ‘আপনাকে একটা গালি দিয়েছি।’

‘বলেন কী? না এসেই গালি খেয়ে গেলাম।’

‘আরে একটা সিন রেখেছেন ১০টা ক্যারেক্টার একসঙ্গে। একটা ঘরে এটা সম্ভব? আমার জান বেরিয়ে গেছে। এর পর থেকে কোনোভাবেই একটা সিনে তিনজনের বেশি রাখবেন না।’

‘কিন্তু গল্পে যদি লাগে, এটা তো মৃত্যু দৃশ্য...’

‘মৃত্যু দৃশ্যফিশ্য বাদ দেন। ওগুলো মানুষ খায় না। কমেডি লেখেন আর রোমান্টিক।’

কমেডি আর রোমান্টিকই লিখব, মৃত্যুফিত্যু সব বাদ—প্রায় এ রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচলাম। যেতে যেতে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি করে মাথায় ঘুরল ওদের চিন্তাগুলো। এরা সব নিজের মতো তৈরি করে নিচ্ছে নাটকের সংজ্ঞা। সময়ে তো ভেঙেচুরে সব চুরমার করে দেবে।

পরের গল্পটা সেই মানুষদের পতনের। কয়েক বছর আগে এক দিন একটা চ্যানেলে টক শো ছিল, দেরি হয়ে গিয়েছিল, দৌড়ে লিফটে উঠতে যাচ্ছি। পেছন থেকে ডাক, ‘ভাই, আমাদের চিনতে পারছেন।’

পারলাম। এরা একসময় নাটক প্রযোজনায় নেমেছিল।

বললাম, ‘এখানে বসে কেন?’

‘ওপরে উঠতে দেয় না।’

‘মানে কী?’

‘অনেক টাকা পাই। একটা ২৬ পর্বের সিরিয়ালের টাকা। তাগাদায় এলে আগে রুমে ঢুকতে দিত। কিছুদিন পর সেটা বন্ধ হলো, তবু রুমের বাইরে অপেক্ষা করা যেত। এখন দারোয়ানকে বলে দিয়েছে, যেন ওপরে উঠতে না দেয়। তাই এখানে বসে থাকি। আর...ভাই, নিচে নামলে দৌড়ে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে টাকা চাই। নাটক করে ভিখারি হয়ে গেছি। নাটকের প্রায় সবাই এখন ভিখারি।’

তত দিনে জেনে গেছি, এখন এখানে শুধু টাকা মারামারির খেলা চলে। মানুষ দেখে না বলে সেভাবে বিজ্ঞাপন আসে না, তাই চ্যানেলের লাভ হয় না। ওরা চেষ্টা করে প্রযোজককে টাকা না দেওয়ার। প্রযোজক টাকা মারেন পরিচালকের। পরিচালক শিল্পীদের। সব মিলিয়ে যে যাকে ঠকাতে পারবে সে-ই টিকে থাকবে।

এই দিন যে আসবে—নিজের অভিজ্ঞতার সেই সব দিনেই জানতাম বলে খুব একটা অবাক হলাম না। তবু বদ্ধ লিফটে চলতে চলতে আফসোস হলো খুব। কী ছিল আর কী হলো!

ছিল চকচকে সোনা। আর এখন স্মৃতি তুমি বেদনা।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক



সাতদিনের সেরা