kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

ভেজাল বিটুমিনে মৃত্যু বাড়ছে সড়কে

► আমদানিকারকদের লোভের মাসুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
►নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে রাস্তা নষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে : ইলিয়াস কাঞ্চন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ মে, ২০২১ ০২:৪১ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ভেজাল বিটুমিনে মৃত্যু বাড়ছে সড়কে

প্রতিদিনই রক্তে ভিজছে দেশের সড়ক ও মহাসড়ক। অকালে ঝরে পড়ছে প্রাণ। দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের বাড়ি বাড়ি পড়ছে কান্নার রোল। এমনও আছে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। নিম্নমানের বিটুমিন দিয়ে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কারণে দেশে এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। আর এভাবে গত তিন বছরে শুধু সড়কে প্রাণ গেছে ১৪ হাজার ৬৩৫ জন মানুষের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে অল্প সময়েই ভেঙে যায় সড়ক। আর এসব খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে চলতে গিয়ে হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে গড়ে সাড়ে চার হাজার। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর গড়ে প্রাণ হারায় পাঁচ হাজার মানুষ।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আন্ত নগর বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও গত ঈদের চেয়ে এবারের ঈদ যাতায়াতে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। ৬ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ১২ দিনে সারা দেশে সড়ক, মহাসড়ক ও পল্লী এলাকার সড়কে ২০৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত এবং ৩৮৫ জন আহত হয়েছে। গত মঙ্গলবার পরিবেশ ও নাগরিক অধিকারবিষয়ক দুটি সামাজিক সংগঠন গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশ (জিসিবি) এবং নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির এক যৌথ প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার ঈদ যাতায়াতে (১২ দিনে) দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৩৫ নারী, ২৯ শিশু, ২৩ পথচারী এবং চালকসহ ২৭ জন পরিবহন শ্রমিকও রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক-মহাসড়কে ভেজাল বিটুমিনে রাস্তায় বড় বড় খানাখন্দে পড়ে উচ্চগতির গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানো, যথাযথ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব, গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করা এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় একাধিক মৃত্যুর খবর আসছে। ২০১৯ সালে চার হাজার দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় পাঁচ হাজার ২২৭ জন এবং আহত হয় ছয় হাজার ৯৫৩ জন। ২০১৮ সালে তিন হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় চার হাজার ৪৩৯ জন। সেই সঙ্গে ওই বছর আহত হয় সাত হাজার ৪২৫ জন। নিসচার প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের পাশাপাশি সড়কে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে চার হাজার ৯৬৯ জন মানুষ। একই সঙ্গে আহত হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮ জন। সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে চার হাজার ৯২টি।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘বিটুমিনের কারণে রাস্তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে এটা সঠিক। আমাদের এখানে বলা হয় বিটুমিনের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে বৃষ্টি। ইংল্যান্ডে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়। সেখানে আবার বিটুমিন দিয়ে রাস্তাও নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু ওদের রাস্তা তো আমাদের মতো বছর ঘুরতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো এত দ্রুত রাস্তার কার্পেট উঠে যায় না ওখানে। এর কারণ হলো ইংল্যান্ডের রাস্তায় ব্যবহৃত বিটুমিনের মান অনেক ভালো। আর আমাদেরটার মান খুবই খারাপ।’

তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিটুমিনের কোয়ালিটি বাংলাদেশে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ এখানে রাস্তা যতবার ভাঙবে ততবার রিপেয়ার করার সুযোগসহ নতুন বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। এতে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। যারা বরাদ্দ দেবে তারাও লাভবান হলো, যে রিপেয়ার করবে সেও লাভবান হলো। এ জন্যই আমাদের এখানে ভালো মানের বিটুমিনের পরিবর্তে আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে। মাঝে সড়কে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। দেশজুড়ে বাড়ছে স্বজনদের আহাজারি।’

এমনও আছে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তান-সন্ততি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে পরিবার। তেমনই একজন ইব্রাহিম হোসেন। গত বছর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। তাঁর বাড়ি নোয়াখালী। ইব্রাহিম মারা যাওয়ার পর ভয়াবহ দৈন্যদশায় পড়েছে পরিবার। তাঁর স্ত্রী সোনিয়া আক্তার দুই সন্তান নিয়ে অভাব-অনটনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। সোনিয়া চান তাঁর মতো এমন যাতে আর কারো না হয়।

বগুড়ার শিবগঞ্জে আমেনা বেগমের পরিবারে একসঙ্গে তাঁর স্বামী ও দুই ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ২০০৭ সালে ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলে এ দুর্ঘটনায় ঘটে। উপার্জনক্ষম স্বামী-সন্তানদের হারিয়ে নিঃস্ব আমেনার গত ১৪ বছর দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে।

গেল মাসে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা একই পরিবারের সদস্য। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা দেশের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে। এ অবস্থার উত্তরণ করে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে মানসম্মত বিটুমিন ব্যবহার করে গুণগত মানের রাস্তা নির্মাণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার আমাদের থেকে যে হারে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করছে, ঠিক সে অনুপাতে মানসম্মত রাস্তা দিতে পারছে না। সড়ক নির্মাণের এ অব্যবস্থাপনার জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা গাড়ির মালিক ও সাধারণ যাত্রীরা। নষ্ট রাস্তার কারণে পরিবহনের খুব অল্প সময়ে ফিটনেস ও যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে যায়। এগুলো আমাদের প্রায় প্রতিবছরই ঠিক করতে হয়। অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীরা খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে নানা বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হন। একদিকে তাঁরা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে যেতে পারেন না। অন্যদিকে গাড়ির অতিরিক্ত ঝাঁকির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ রাস্তার খারাপ অবস্থা ও অব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশে বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা হয় মানসম্মত সড়ক নিশ্চিত না হওয়ার কারণে। বিশেষ করে সড়ক নির্মাণের পর যে পিচ ঢালাই দেওয়া হয় সেটা অত্যন্ত বাজে মানের। এসব কারণে হরহামেশাই সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে অকালে ঝরে যায় প্রাণ।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে মৃত্যু থামাতে মানসম্মত বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণের বিকল্প নেই। রাস্তা যত বেশি টেকসই হবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার ঘটনা ততই কমবে। আর দুর্ঘটনা যত কমবে মৃত্যুর সংখ্যাও তত কমে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আবহাওয়া বিবেচনায় সড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিনকে আদর্শ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই মানের বিটুমিন ব্যবহারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আন্তরিকতারও ঘাটতি নেই। তবু বন্ধ হয়নি মানহীন ভেজাল মেশানো আমদানীকৃত বিটুমিনের ব্যবহার। আমদানির বিটুমিন ব্যবহারের সুযোগ জিইয়ে রাখতে রীতিমতো শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটও গড়ে উঠেছে। ফলে ফায়দা লুটছে কতিপয় আমদানিকারক, আর মাসুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। কেউ জীবন দিয়ে, কেউবা বাড়তি অর্থ দিয়ে গুনছে মাসুল।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশ থেকে বিটুমিনের নামে মানহীন আলকাতরা আনছেন আমদানিকারকরা। অন্যদিকে পরিমাণ বাড়াতে বিটুমিনের সঙ্গে গিলসোনাইট নামের এক ধরনের কেমিক্যাল মেশান ঠিকাদাররা। এই কেমিক্যাল মেশানোর কারণে বিটুমিনের বন্ডিং (বিটুমিনের কংক্রিট ধারণ) ক্ষমতা কমে যায়। আর এ ধরনের বিটুমিনের প্রলেপ পড়া সড়কগুলো দ্রুতই ভেঙে যায় অথবা ঢেউয়ের আকৃতি ধারণ করে।

বিটুমিন বিশেষজ্ঞ আইইউটির সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুস সাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ রাস্তায় দেখা যায় বিটুমিন থেকে পাথর আলাদা হয়ে যায়। এর মূল কারণ বিটুমিনের সঙ্গে পাথরের লেগে থাকার যে প্রবণতা তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিম্নমানের বিটুমিনের কারণেই এটা হচ্ছে। আমদানি করা বিটুমিন প্রথমত অনেক দিন জাহাজে থাকে। উৎপাদন উৎস আমরা কেউ বলতে পারি না। ফলে এদের মান সব সময় আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয়।’

এদিকে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের ফলে বছর বছর লাফিয়ে বাড়ছে সড়কের নির্মাণ ব্যয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সওজের অধীনে থাকা সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, মেরামত ও প্রশস্তকরণে ৫৭ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সময় প্রশস্ত ও মজবুত করা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক। ১৪ হাজার ৯১৯ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন ধরনের মেরামত করা হয়েছে। 

সরেজমিন ঘুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভাঙাচোরা এবং দেবে যাওয়ার চিত্র চোখে পড়েছে। সম্প্রতি চার লেনে উন্নীত দেশের জাতীয় মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশ দ্রুত ভেঙে যাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন এ সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী চালক এবং যাত্রীরা। কাভার্ড ভ্যানচালক মো. আল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে মহাসড়কটি কিছুদিন আগেই চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন সড়ক কী করে এত দ্রুত ভেঙে যায়। ভাঙাচোরা কম দেখা গেলেও বেশির ভাগ অংশে দেবে গেছে। উঁচু-নিচু ঢেউয়ের আকৃতি ধারণ করায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ভয়ে থাকি।’

ঢাকায় অবস্থানরত চট্টগ্রামের এক অধিবাসী সাবউদ্দিন রাসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কটি যখন নির্মাণ হচ্ছিল তখন দীর্ঘ মেয়াদে দুর্ভোগের শিকার হয়েছিলাম। সেটিকে উন্নয়নের প্রসব বেদনা ভেবে মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছি সড়ক নির্মিত হয়ে গেলে দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। কিন্তু এখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েই গেল। বিশেষ করে বিটুমিন উঠে গিয়ে বেশির ভাগ জায়গায় গর্ত ও উঁচু-নিচু হয়ে ঢেউয়ের মতো হয়ে গেছে।’ 



সাতদিনের সেরা