kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া সহজ নয়

বাহরাম খান   

১৯ মে, ২০২১ ০২:৪৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া সহজ নয়

প্রতীকী ছবি

পুলিশকে সীমিত আকারে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার কথা চিন্তা করছে সরকার—সম্প্রতি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের এমন বক্তব্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, করোনা প্রতিরোধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এমন চিন্তা করছে সরকার।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে পুলিশের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার সুযোগ নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই বাহিনীকে সীমিত আকারে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে গেলে অন্তত দুটি আইনে সংশোধন আনতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের বাইরে শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সীমিত আকারে বিচারিক ক্ষমতা পান। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর ২০০৯ সালে প্রণীত মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী সীমিত সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এখন পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে গেলে উল্লিখিত দুটি আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪(ক) ধারায় বিচারিক ক্ষমতা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে শুধু জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দিতে গেলে ফৌজদারি কার্যবিধির এই ধারায় পরিবর্তনের সঙ্গে মোবাইল কোর্ট আইনেও পরিবর্তন আনতে হবে।

আইনজ্ঞরা বলছেন, সরকার চাইলে যে কাউকে বিচারিক ক্ষমতা দিতে পারে। এর জন্য উল্লিখিত দুটি আইন সংশোধন করতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার এখতিয়ার অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছেন। এমন অবস্থায় পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হলে সেটাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আইনজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পৃথকীকরণের অন্যতম মৌলিক নীতি হচ্ছে, যিনি অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করবেন তিনি বিচার করতে পারবেন না। আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বিক কার্যক্রমের ভারসাম্য রক্ষায় তিনটি অঙ্গ কাজ করে। আইন বিভাগ বা সংসদ আইন তৈরি করে। নির্বাহী বিভাগ বা প্রশাসন-পুলিশসহ অন্যরা সেই আইন প্রয়োগ করে। প্রণীত আইন ঠিকমতো প্রয়োগ হচ্ছে কি না তা বিচার করেন বিচার বিভাগ বা আদালত।

২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও নিম্ন আদালতের বিচারকাজের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত ছিলেন। বিখ্যাত মাসদার হোসেন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেন যে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা শুধু বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে থাকবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় ২০০৭ সালে। মাজদার হোসেন মামলার মূল বিষয় ছিল ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে না রেখে বিচার বিভাগের হাতে অর্পণ করা।

এ রায়ের কারণে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন, রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও নেমেছিলেন। ২০০ বছর ধরে ব্যবহার করে আসা সেই ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগ ছাড়তে রাজি ছিল না। যে কারণে ২০০০ সালে রায় হলেও কোনো রাজনৈতিক সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। সেই রায় বাস্তবায়ন করেছিল ওয়ান-ইলেভেনের সরকার। এরপর ২০০৯ সালে মোবাইল কোর্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে সীমিত ক্ষমতা রাখার ব্যবস্থা করে সরকার। ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা শুধু বিচার বিভাগের হাতে থাকবে—এই বিধান সংবিধানের ২২, ১১৬ ও ১১৬ (ক) নম্বর অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বঙ্গবন্ধু প্রণীত ’৭২-এর সংবিধানে আরো বেশি শক্তিশালী ছিল। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পরপরই ভারত ও পাকিস্তানেও ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

এখন পুলিশকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হবে কি না সেই প্রশ্ন বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ খানের মতে, সরকার চাইলে যে কাউকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে পারবে। এর জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি ও মোবাইল কোর্ট আইনে সংশোধন আনতে হবে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত আদালতে টিকবে না। এটা ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির সঙ্গে যায় না। এটা সংবিধানেরও পরিপন্থী।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পুলিশকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন না। গত সোমবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, (পুলিশকে) ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার সুযোগ তো দূরের বিষয়, এটার দরকারটা কী? এসংক্রান্ত কোনো বিষয় আমার কাছে আসেনি, আমি জানিও না।’

এই বিষয়ে বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অন্তত তিনজন অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তাঁরা বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তাঁরা কিছু বলবেন না। তবে এটি বাস্তবায়ন বড় ভুল সিদ্ধান্ত হবে। যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারই সংবিধানবিরোধী। চূড়ান্ত বিচারে ওটা টিকবে না। পুলিশকে এই জায়গায় চিন্তাও করা উচিত নয়।



সাতদিনের সেরা