kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

ভেজাল বিটুমিনে ১০ বছরে গচ্চা তিন লাখ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০২১ ০২:৪২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভেজাল বিটুমিনে ১০ বছরে গচ্চা তিন লাখ কোটি টাকা

প্রতিবছর দেশে ঢুকছে শত শত কোটি টাকার ভেজাল বিটুমিন। দেশের সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন। আর এই ভেজাল বিটুমিন ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। নিম্নমানের বিটুমিনে শুধু সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, দেশের পরিবহন মালিকরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন শত শত কোটি টাকার। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নতুন গাড়ি হয়ে যায় লক্কড়ঝক্কড়। রাস্তার কারণে নষ্ট হওয়া গাড়ি মেরামত বাবদ বছরে মালিকদের গুনতে হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে বছরে গড়ে অপচয় হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এভাবে ১০ বছরে সরকার প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।

আমদানি করা বিটুমিনের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ও উন্নত বিশ্বের রাস্তায় যে বিটুমিন ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে গুণগত মানের পার্থক্য রয়েছে। অবশ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমনই হয়। এমনিতেই বৃষ্টির সঙ্গে বিটুমিনের একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা আছে। তার ওপর যদি নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হয় তাহলে তো সড়ক টিকবেই না।

সড়ক-মহাসড়কের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে জাহিদ হোসেন আরো বলেন, ‘উন্নয়নের চালকের আসনে বাংলাদেশ। আমাদের দেশের শহর-গ্রামে অনেক সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু চলাচলে যোগ্য সড়ক চোখে পড়ে না। একদিন সকালে দেখা গেল কার্পেটিং করা চকচকে সড়ক। চার-পাঁচ দিন পর একই সড়কে গেলে আর চেনা যায় না। রাস্তার কার্পেটিংই খুঁজে পাওয়া যায় না। এর কারণ নিম্নমানের বিটুমিন। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদার ও আমদানিকারকদের এখানে কতখানি মনিটর নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমি বলব, এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিচের দিকেই আছে।’

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নতুন রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। এর আগের বছরও এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এভাবে গেল ১০ বছরে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া টাকার পুরোটাই খরচ হয়েছে সড়ক সংস্কার ও নির্মাণে। কিন্তু বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা এসব সড়ক বেশি দিন টিকছে না। বছর ঘুরতেই আবার চলাচলে অনুপযোগী হয়ে যায়। এর কারণ আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়, অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনা ও মানুষের কর্মঘণ্টার ক্ষতিসহ নানা অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভেজাল ও মানহীন বিটুমিন দিয়ে যেভাবে এসব রাস্তার কার্পেটিং করা হচ্ছে তাতে দ্রুতই নষ্ট হবে রাস্তাগুলো। আবার এসব রাস্তা সংস্কারের জন্য নেওয়া হবে বাড়তি বরাদ্দ। একইভাবে পুনরায় সংস্কারের জন্য দেওয়া হবে বরাদ্দ। এভাবে সংস্কারকাজে প্রতিবছর দেওয়া হবে বরাদ্দ। এর কারণ নিম্নমানের বিটুমিন। একই চিত্র সারা দেশে স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্মিত রাস্তাগুলোরও।

এদিকে বিদেশ থেকে আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন সড়ক ও মহাসড়কে ব্যবহারের কারণে দেশের পরিবহন মালিকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বছরে তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি। কারণ নির্মাণের অল্প সময়েই নষ্ট হচ্ছে সড়ক ও মহাসড়ক। খানাখন্দ ও উঁচু-নিচু এসব সড়কে চলতে গিয়ে অল্প সময়েই নষ্ট হচ্ছে গাড়ির ফিটনেস ও যন্ত্রাংশ। নষ্ট হওয়া এসব যন্ত্রাংশ ঠিক করতেই পরিবহন মালিকদের বছরপ্রতি এ বিপুল অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে।

বিটুমিন গবেষক অধ্যাপক নাজমুস সাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের পরপরই তা সংস্কারের জন্য সরকারকে ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হয়েছে। এটা শুধু নিম্নমানের বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কারণে হয়েছে। যে বিটুমিন বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় তা একেবারেই মানহীন এবং এ ধরনের বিটুমিন ব্যবহার করে রাস্তা ব্যবহার উপযোগী করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার আমাদের থেকে যে হারে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করছে, ঠিক সে অনুপাতে মানসম্মত রাস্তা দিতে পারছে না। ভ্যাট ট্যাক্স যেহেতু সরকার আদায় করছে, সেহেতু মানসম্মত সড়ক আমাদের জন্য নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ১৭০ ড্রাম বিটুমিন ব্যবহার করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের সময় সর্বোচ্চ ১১০ ড্রাম বিটুমিন ব্যবহার করা হয়। সেটাও আবার খুবই নিম্নমানের।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু ভেজাল বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণের ফলে আমাদের প্রতিটি গাড়িতে বছর ঘুরতেই এক লাখ টাকারও বেশি যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। সারা দেশে ৯০ হাজার গাড়ির সার্ভিসিং বাবদ বছরে ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে ট্রাক, লরি ও ভারী মালপত্র পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন মিলে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার টাকার বাড়তি যন্ত্রাংশ ক্রয় করতে হয়। সে হিসাবে ১০ বছরে নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে পরিবহন মালিকদের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান দিতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি কিলোমিটার রাস্তা কনস্ট্রাকশন ব্যয় এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সর্বোচ্চ, যা পাশের দেশ ভারতের চেয়েও অনেক বেশি। সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নে সরকারের সরাসরি এ বরাদ্দ কোনো কাজে আসছে না তো বটেই, উল্টো এসব সড়ক থেকে যে সুবিধা পাওয়ার কথা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ জন্য নিম্নমানের বিটুমিনের দায় এড়ানো যায় না।’



সাতদিনের সেরা