kalerkantho

শনিবার । ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১২ জুন ২০২১। ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

তিমিরবিনাশী সেই প্রজ্ঞাময় দিন

আলী হাবিব   

১৭ মে, ২০২১ ০৪:০২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তিমিরবিনাশী সেই প্রজ্ঞাময় দিন

সে একসময় ছিল ঘোর তমসার। রাজনীতি নিতান্তই ঘরোয়া তখন। এবং রুদ্ধ ছিল বাকস্বাধীনতা। স্বপ্ন দেখাও যেন ছিল অপরাধ! লালচে আবির নয়, রক্ত মেখে রোজ সূর্য উঠত যেন সেই দুঃসময়ে। আমরা কি শুনেছি তখন পাখির কাকলি? তখন কি ফোটা ফুল গন্ধহীন ছিল? রক্তজবা ফুটেছিল কার রক্ত মেখে? দেখেছি কি কষ্টগুলো ফেনা হয়ে রোজ মিশে গেছে, ভেসে গেছে অথৈ সাগরে? দিশাহীন সময়ের চোরা ঘেরাটোপে পথ হারিয়েছে কত শত সম্ভাবনা। সেই অন্ধকার দিনে আলোক ছড়াতে, খুলে দিয়ে সব সম্ভাবনার দুয়ার, তিনি ফিরলেন এই দুঃখিনী বাংলায়। তাঁর ফিরে আসা যেন প্রাণ ফিরে পাওয়া। তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে সুর বেজে ওঠা। তাঁর ফিরে আসা মানে ধূসর জীবন ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছে ফের বাঁচার তাগিদে। যে তরুণ স্বপ্ন দেখে আসন্ন বিপ্লবে, সে যাবে সবার আগে, রাঙাবে জীবন। তিনি সেই তরুণের স্বপ্ন-সারথি। যে কৃষক স্বপ্ন বোনে মাঠের সবুজে, তিনি তার ফসলের সোনাঝরা হাসি।

১৭ মে ১৯৮১, বৈরী প্রকৃতির এই পিতৃহীন দেশে যখন এলেন তিনি, তখন কেমন ছিল সেই দৃশ্যপট? সুকান্তের ভাষায় বলি, ‘হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন/জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,/গত আকালের মৃত্যুকে মুছে/আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।’ স্বজনহীন দেশে তাঁর ফিরে আসা মানে দেশের মাটিতে ফের প্রাণের সঞ্চার। তাঁর ফিরে আসা মানে ম্লান মুখে হাসি। ফসলের মাঠও হাসে প্রাণের সবুজে। না, এখানেই কিন্তু শেষ নয়। তাঁর আগমনে ‘...সারা দেশ দিশাহারা/একবার মরে ভুলে গেছে আজ/মৃত্যুর ভয় তারা।’—এমনই এক পরিবেশের তৈরি হলো। সেদিন রাজধানীর সব পথ মিশে গিয়েছিল বিমানবন্দর ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে। শুধুই কি রাজধানীর সব পথ? ঢাকার বাইরে ছিল যাদের বাস, স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া সেই সব মানুষেরও দৃষ্টি ছিল এই পথেরই দিকে। কারণ তিনি আসছেন। আর তাঁর আসা মানেই তো নতুন স্বপ্ন দেখা। কী সেই স্বপ্ন? জীবনানন্দের ভাষায়, ‘এই পথে আলো জ্বেলে—এ-পথেই’ বাংলাদেশের ‘ক্রমমুক্তি হবে;/সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;/এ-বাতাস কি পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;/প্রায় তত দূর ভালো মানব-সমাজ।’ 

মানবসমাজের জন্য সেই ‘মনীষীর কাজ’টা কী? আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লিখছেন, “‘মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে’ ‘জয় প্রলয়ংকর’ বলে ‘ধূমকেতু’কে রথ করে আমার আজ নতুন পথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমি প্রথমে আমার যাত্রা-শুরুর আগে আমার সত্যকে সালাম জানাচ্ছি...। যে-পথ আমার সত্যের বিরোধী, সে-পথ ছাড়া আর কোনো পথই আমার বিপথ নয়! রাজভয়-লোকভয় কোনো ভয়ই আমায় বিপথে নিয়ে যাবে না। আমি যদি সত্যি করে আমার সত্যকে চিনে থাকি, যদি আমার অন্তরে মিথ্যার ভয় না থাকে, তাহলে বাইরের কোনো ভয়ই আমার কিছু করতে পারবে না। যার ভিতরে ভয়, সেই তার ভয় পায়। আমার বিশ্বাস, যে নিজেকে চেনে, তার আর কাউকে চিনতে বাকি থাকে না। অতএব যে মিথ্যাকে চেনে, সে মিছামিছি তাকে ভয়ও করে না। যার মনে মিথ্যা, সে-ই মিথ্যাকে ভয় করে। নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা-আপনি এত বড়ো একটা জোর আসে যে, সে আপন সত্য ছাড়া আর কারুকে কুর্নিশ করে না—অর্থাৎ কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত রাখতে পারে না।” 

আজ সেই দিন, যেদিন তাঁর নতুন পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেদিন থেকে রাজভয়-লোকভয় কোনো ভয়ই তাঁকে বিপথে নিয়ে যেতে পারেনি। সেদিন নিজেকে নতুন করে চিনেছিলেন তিনি। আর তাই কাউকে চিনতে বাকি ছিল না তাঁর। সত্যি করে তাঁর সত্যকে চিনেছিলেন বলেই তাঁর অন্তরে মিথ্যার ভয় ছিল না। ফলে বাইরের কোনো ভয়ই তাঁর কোনো অনিষ্ট করতে পারেনি। জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তির মতো তিনি ‘আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে’ তুলে দিয়েছেন এক অসাধারণ উজ্জ্বল বাংলাদেশ। আজ সেই দিন যেদিন তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু’। তৎকালীন শাসকদের জন্য কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘শনি মহাকাল ধূমকেতু’ হয়ে তাঁর আগমন ঘটেছিল। ‘...মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথাগুলোও প্রমাণিত হয়েছিল সেদিন। অপরাজিত বাংলাদেশের মানুষ সেদিন নতুন করে তার ‘মহৎ মর্যাদা’ ফিরে পেতে ‘জয়যাত্রার অভিযানে’ সব বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হওয়ারও শপথ নিয়েছিল। ‘প্রবল প্রতাপশালীরও ক্ষমতা মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে নিরাপদ নয়’, এই সত্য সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নতুন করে। এই যে সব বাধা অতিক্রম করে জয়যাত্রার অভিযান সূচিত হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় তিনি নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করল। ওই বছরের ২৩ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো শপথ নেন তিনি। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। তাঁর নেতৃত্বে একের পর এক সাফল্যের মাইলফলক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন তিনি। নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু গড়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেন। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদাহরণযোগ্য মডেল। 

বলছি চলতি শতাব্দীর এক অগ্রসর রাষ্ট্রনায়কের কথা, যিনি দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর শপথে অটল। বলছি এক স্বপ্নদ্রষ্টার কথা, যিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ নিয়ে। বাংলাদেশকে যিনি স্বপ্ন দেখান। বলছি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা। বলছি বঙ্গবন্ধুকন্যার কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘নীহারিকার মহাক্ষেত্রে যেখানে জ্যোতিষ্ক সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে মাঝে মাঝে এক-একটি তারা দেখা যায়; তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় সমস্ত নীহারিকার বিরাট অন্তরে সৃষ্টি-হোমহুতাশনের উদ্দীপনা।’ শেখ হাসিনা ‘নীহারিকার মহাক্ষেত্রে’ সেই জ্যোতিষ্ক, যিনি বাঙালির অন্তরে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছেন।  

সদ্যঃপ্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর নিজের সৃষ্টির আন্তঃসম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এমন কবিতা কমই লিখেছি যার মধ্যে—শব্দে বা প্রতিমায়—বাংলাদেশই প্রচ্ছন্ন হয়ে নেই।... এ তো সত্যি যে মুহুর্মুহু আমি বেঁচে থাকি বাংলাদেশের মধ্যেই।’ এই কথাগুলো যেন একেবারে সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে শেখ হাসিনার জীবনেও। তাঁর প্রতিটি কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপের প্রচ্ছন্নে আছে বাংলাদেশ। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মধ্যে। বাংলাদেশ তাঁকে নিয়ে গর্ব করে। ভবিষ্যতেও গর্ব করবে।

আজ সেই তিমিরবিনাশী প্রজ্ঞাময় দিন, ১৯৮১ সালে আজকের এই দিনে সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি ফিরে এসেছিলেন বলেই তো বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার
[email protected]



সাতদিনের সেরা