kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

বিধি-নিষেধের বেড়াজালে নিস্তেজ ঈদ অর্থনীতি

ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে ফের ধাক্কা

মাসুদ রুমী   

১৭ মে, ২০২১ ০২:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিধি-নিষেধের বেড়াজালে নিস্তেজ ঈদ অর্থনীতি

করোনা মহামারিতে বিধি-নিষেধের কবলে পড়ে সংকটের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। দেশের খুচরা ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা মূলত উৎসবকেন্দ্রিক। গত বছর ঈদে লকডাউনে ব্যবসা হয়নি, বৈশাখেও সে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এবার ঈদে ক্ষতি পোষানোর যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে অর্থ লগ্নি করেছিলেন ব্যবসায়। তবে শেষ পর্যন্ত বেচাকেনা সন্তোষজনক হয়নি বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

গত ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লকডাউন বা কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল দোকানপাট ও শপিং মল খোলার সুযোগ দেয় সরকার। এতে ঈদবাজার কিছুটা সরগরম হতে শুরু করে। রাজধানীসহ সারা দেশের বিপণিবিতানগুলোতে ঈদের আগে চোখে পড়ার মতো ভিড় বাড়ে। শেষের দিকে বেচাকেনাও সন্তোষজনক হয়। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো রজমানে যে বেচাকেনা হয়, এবার তা হয়নি। একই সঙ্গে ঈদকেন্দ্রিক পর্যটন বন্ধ থাকায় হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট মালিকদের সংকট আরো বেড়েছে। 

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এবার ঈদে বিক্রি ভালো হয়নি। হারানো পুঁজির কিছুটা অংশ তোলার চেষ্টা করেছি। রোজার শেষের দিকে কিছুটা বেড়েছিল। তবে কী পরিমাণ বিক্রি হয়েছে সে হিসাব এখনো পাইনি। ঈদকেন্দ্রিক ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকার বাজার আছে। কিন্তু সেখানে আাামরা পুঁজির মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকা তুলে আনতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে সংক্রমণ কমে আসায় তাঁরা ভেবেছিলেন, এবার বৈশাখ-ঈদে ক্ষতি পোষানো যাবে। পর্যটন থেকে শুরু করে সবই খুলে দেওয়া হলো। সে কারণে গতবারের চেয়ে এবার ঈদ ব্যবসায় বিনিয়োগ ভালো হয়েছিল। কিন্তু এবারও সেই আশার গুড়ে বালি পড়ল।

দেশের শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলমও প্রায় একই কথা বললেন। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে আমরা তেমন কোনো ব্যবসা করতে পারিনি। বৈশাখেও সব বন্ধ থাকায় কোনো ব্যবসা হয়নি। ২০১৯ সালের তুলনায় এবার ঈদে ৭০ শতাংশের মতো বিক্রি করতে পেরেছি।’

জুতার বাজারে বিক্রির দিক দিয়ে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাটা জানায়, ঈদ সামনে রেখে তাদের নিজস্ব ৩১৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫০০ রকমের নতুন কালেকশনের জুতা-স্যান্ডেল আনা হয়েছিল। বাটার হেড অব মার্কেটিং ইফতেখার মল্লিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা গেল বছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত ভালো, তবে তা কোনোভাবেই ২০১৯ সালের মতো নয়।’ বৈশাখ ও ঈদের মতো বড় মৌসুমে ব্যবসার সুযোগ হারিয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে বলে দাবি বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি দিলীপ কুমার আগরওয়ালের। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়বারের মতো দেশের কোথাও কোনো জুয়েলারিতে হালখাতার অনুষ্ঠান হয়নি।’

তবে করোনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের ভ্রমণ ও পর্যটন খাত। লকডাউনে খাতটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, করোনার প্রথম ঢেউয়ে ২০২০ সালে তাঁদের ক্ষতির পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ঢেউ এ খাতের জন্য ‘কফিনের শেষ পেরেক’। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আট হাজার ৯০০ কোটি টাকা দাঁড়াবে বলে জানান তিনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মহামারিতে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় কেনাকাটায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। করোনা মহামারির অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে এক বছরে মোট জনসংখ্যার ১৪.৭৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। মহামারির কারণে অনেকের আয় কমে গেছে এবং জনসংখ্যার বড় একটি অংশ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বলে উঠে এসেছে দ্য পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপে। ফলে মানুষের হাতে কেনাকাটার মতো পর্যাপ্ত পয়সা নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, ঈদের বাজারের আকার কেউ বলেন ২০ হাজার, কেউ বলেন ৩০ হাজার কোটি টাকার। এই বাজারের সঠিক হিসাব করা মুশকিল। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মসলা থেকে শুরু করে জামাকাপড়, জুতা, জুয়েলারি, ইলেকট্রনিক, খেলনা থেকে শুরু করে গৃহসামগ্রী—সবই ঈদে বেশি বিক্রি হয়।

নাজনীন বলেন, ‘তবে মহামারিতে গত বছর যেখানে বেচাকেনা প্রায় শূন্যের ঘরে ছিল, সেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় এ বছরটি ক্ষতি পোষানোর বছর নয়, টিকে যাওয়ার বছর। ২০২০ সালে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে, এ বছর যদি একদম বেচাকেনা না হতো, অনেককে পুঁজি হারিয়ে বসে যেতে হতো। সেটি হয়তো ঠেকা দেওয়া গেছে।’

মানুষের আয় কমে যাওয়ায় কেনাকাটা কম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব কিছুই কম হওয়ায় অর্থনীতি থমকে আছে। এই সময়টাতে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিয়ে মানুষের জন্য বেশি ব্যয় করা দরকার। অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করার পক্ষে মত দেন তিনি।



সাতদিনের সেরা