kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

কষ্টের যাত্রা তবু মুখে হাসি

♦ শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক
♦ চালকরা যাত্রীদের পকেট কাটছেন ইচ্ছামতো
♦ কোথাও কোথাও সরাসরি দূরপাল্লার বাসও চলছে
♦ বৈরী আবহাওয়ায় যাত্রী ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১২ মে, ২০২১ ০২:৫০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কষ্টের যাত্রা তবু মুখে হাসি

আকাশে আজ চাঁদের মুখ দেখা গেলেই কাল বৃহস্পতিবার ঈদ। তবে করোনা মহামারি সব কিছু করে দিয়েছে এলোমেলো। গেলবারের মতো এবারের রোজার ঈদটাও কিছুটা বিবর্ণ, পানসে। কঠোর বিধি-নিষেধের ছাপ পড়েছে উৎসবে। তাই এবারও ছন্দহীন ঈদ। ঈদ রং হারালেও গ্রামমুখী মানুষের অদম্য যাত্রা থেমে নেই। যেন চলছে বাড়ি ফেরার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। শুধু আকাশপথে উড়োজাহাজ ছাড়া রেলপথে ট্রেন, নৌপথে লঞ্চ ও সড়কপথে দূরপাল্লার গাড়ি চলতে বারণ। এর পরও মানবস্রোত ঘরমুখো। স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। ঠেলাঠেলি-গাদাগাদির এক অনিশ্চিত যাত্রা। গন্তব্য আপন নীড়। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারে চড়ে মানুষ ছুটছেই। কারো কাঁধে ব্যাগ, কেউ বস্তা তুলেছে মাথায়। সঙ্গে পরিবার-পরিজন। হাঁটছে মাইলের পর মাইল। গেল কয়েক দিনের মতো গতকাল মঙ্গলবারও ছিল একই ছবি।

শেষ সময়ে এসে ঢাকার সীমানা পার হলে কোথাও কোথাও সরাসরি দূরপাল্লার বাসও চলছে। কেউ মানতে চাইছে না বাস চলাচলের জেলার সীমানা। এক জেলার বাস ঢুকছে আরেক জেলায়।  শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে গতকাল স্বাভাবিক নিয়মে চলাচল করেছে সব কয়টি ফেরি। পাটুরিয়া ঘাট থেকেও দৌলতদিয়ার পথে ছেড়েছে একের পর এক ফেরি। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘরমুখো মানুষকে পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকার সুযোগে বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা যাত্রীদের পকেট কাটছেন ইচ্ছামতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ গুণ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

আব্দুল্লাহপুর : রাজধানীর আব্দুল্লাহপুরে গিয়ে দেখা যায়, আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড থেকেই কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলগামী বাস ছেড়ে যাচ্ছে। বাসে যেমন স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, তেমনি নির্দিষ্ট ভাড়াও নেই। বাসে ওঠার আগেই বাসের হেলপার ও স্ট্যান্ডে থাকা দালালরা ভাড়া মিটিয়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে যাত্রীদের বাসে তুলছেন। কিশোরগঞ্জগামী একটি বাসে উঠে দেখা যায়, প্রতি আসনেই নেওয়া হয়েছে যাত্রী, আছে দাঁড়ানো যাত্রীও।

কিশোরগঞ্জের যাত্রী খাদিজা বেগম জানান, তিন সন্তানসহ তিনি ভাড়া গুনেছেন এক হাজার ১০০ টাকা। আরেক যাত্রী আব্দুল্লাহ মিয়া জানান, তাঁর একার ভাড়া নেওয়া হয়েছে ৫০০ টাকা। বাসে দেখা যায়, পরিবহনের নামটি চুন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে এবং সরাসরি জেলার সীমানা অমান্য করে বাস চলাচল কেন করা হচ্ছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আপনি তো সাংবাদিক, যারা বাস চালানো বন্ধ করতে পারে, তাদের মুখ বন্ধ করেই আমরা বাস চালাচ্ছি।’ আব্দুল্লাহপুর থেকে সরাসরি বগুড়া-বগুড়া বলেও যাত্রী তোলা হচ্ছে বাসে, একইভাবে চলতে দেখা যায় টাঙ্গাইলের বাসও। এ ছাড়া ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস তো রয়েছেই।

গাবতলী : গাবতলী টার্মিনালে দাঁড়ালেই দেখা যায়, ব্যাগ হাতে আমিনবাজারমুখী হাঁটা মানুষের স্রোত। সবার গন্তব্য আমিনবাজার। আমিনবাজারে শ্রমিকদের হাঁকডাঁক—‘সরাসরি ঘাট ৩০০ টাকা, সরাসরি পাটুরিয়া ৩০০ টাকা।’ সরাসরি কিভাবে যাচ্ছেন, জানতে চাইলে নাসির নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘সাভার ও মানিকগঞ্জ জেলার বাস মালিকরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা সরাসরি বাস চালাবেন।’ যশোরের মণিরামপুর এলাকার যাত্রী কামাল হোসেন বলেন, ‘এখন আর ঝামেলা নেই, শুনেছি দৌলতদিয়া ঘাট থেকে সরাসরি যশোরের বাস চলাচল করছে।’

সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী : দুপুর ১টা। যাত্রাবাড়ী মোড়ে গ্রামে ফিরতে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছে কয়েক শ মানুষ। পাশের চেকপোস্টেই দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। হঠাৎই চোখে পড়ে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি। এগিয়ে যেতেই দেখা গেল, এক শ্রমিক ডাকছেন, ‘ফেনীতে যাবেন কারা কারা।’ এ সময় এক যুবক দৌড়ে এসে জানতে চান, ‘ভাড়া কত?’ ওই ব্যক্তির উত্তর, ‘বারো শ টাকা।’ যুবক প্রশ্ন ছোড়েন, ‘কী দিয়ে নেবেন?’ ওই ব্যক্তি বললেন, ‘ওই যে সামনে ট্রাকটা দেখতে পাইতাছেন, উইঠা পড়েন গিয়া।’ যুবক দৌড়ে উঠে যান ট্রাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ট্রাক ভরে যায় যাত্রীতে। ট্রাকটিও দ্রুত চলে যায় যাত্রাবাড়ী এলাকা ছেড়ে।

এদিকে গতকালও শত শত নারী-পুরুষকে সায়েদাবাবাদ টার্মিনালে আসতে দেখা গেছে। কুমিল্লা যাওয়ার জন্য মিরপুর থেকে সায়েম ও নায়েম নামের দুই ভাই আসেন টার্মিনালে। তাঁরা এসে মাইক্রোবাস খুঁজছিলেন। কিন্তু কোথাও মাইক্রোবাস পাননি। সায়েম বললেন, ‘আমার এক আত্মীয় পরশু দিন ভেঙে ভেঙে কুমিল্লা যেতে পেরেছেন। এ কারণে ভেঙে ভেঙে যাওয়ার জন্য আমরাও এসেছি। ভেবেছিলাম মাইক্রোবাস পেলে সহজে চলে যেতে পারব। এখন যাত্রাবাড়ী গিয়ে বাসে করে কাঁচপুর পর্যন্ত যাব। এরপর সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে আর কিছুদূর এগুব। এভাবে চলে যাব ইনশাআল্লাহ।’

অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে গতকাল বিকেল পর্যন্ত দেখা গেছে, ফরিদপুর, মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা মাওয়া ঘাটে যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছে। কিন্তু বাস না চলায় তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যাচ্ছে। মাওয়া পর্যন্ত একেকজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। অটোরিকশার পেছনে তিনজনের জায়গায় চারজনকেও বসিয়ে নিতে দেখা যায়। জানতে চাইলে এক অটোরিকশাচালক জানান, ঈদের মধ্যে সব সময়ই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া একটু বেশি নেওয়া হয়। এবার বাস না থাকায় তাঁদের ওপর চাপ পড়েছে বেশি। এ কারণে বেশি ভাড়া নিয়েই চালাতে হচ্ছে।

যে লেগুনাগুলো যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত চলত, সেগুলোকে গতকাল মাওয়া পর্যন্ত চলতে দেখা গেছে। এক চালক জানান, পুলিশকে ম্যানেজ করে তাঁরা পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়ে মাওয়া পর্যন্ত যেতে পারছেন। এ কারণে তাঁরা পোস্তগোলা পর্যন্ত লেগুনা চালাচ্ছেন না। 

শিমুলিয়া ঘাট : শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে এখন সব ফেরি চলাচল করছে। গতকাল সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ১৫টি ফেরি যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করছে। তবে এতে যাত্রী পারাপার সহজ হলেও হেঁটে ঘাটে পৌঁছতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সরজমিনে ঘাট ও মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে দেখা যায়, গতকালও ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। ঘাটে যাত্রীদের আনাগোনা থাকলেও আগের কয়েক দিনের মতো যাত্রীদের ফেরির জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। পর্যাপ্ত ফেরি চলাচল করায় কিছুক্ষণ পরপরই মিলছে ফেরি। এতে ফেরিঘাটে যাত্রী ভোগান্তি কমেছে। পাশাপাশি জরুরি পরিষেবার অ্যাম্বুল্যান্স ও পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপার করা হচ্ছে। তবে প্রাইভেট কার ও যাত্রীবাহী বাস ঘাট এলাকায় ঢুকতে না দেওয়ায় ফেরিতেও এ রকম যানবাহন পার হতে দেখা যায়নি। ঘাটের কাছে হাসিনার মোড়ে বিজিবি ও পুলিশের চেকপোস্টে এসব প্রাইভেট কার আটকে দেওয়া হচ্ছে। তাই যেসব যাত্রী বিভিন্ন পরিবহনে করে দক্ষিণবঙ্গ যেতে শিমুলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে, তাদের সর্বশেষ এই চেকপোস্টে নেমে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ফেরিঘাটে পৌঁছতে হচ্ছে।

তবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ঘুরে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা ও বাবুবাজার ব্রিজ পার হওয়ার পর প্রথম চেকপোস্টটি রয়েছে ধলেশ্বরী ব্রিজের টোল প্লাজার মুখে। এখানে বিজিবি ও পুলিশকে দেখা গেছে পোকপোস্টে বিভিন্ন পরিবহনে আসা যাত্রীদের নামিয়ে দিতে। কিন্তু একটু দূরেই ব্রিজের গোড়া থেকে আবারও যাত্রীরা অন্য পরিবহনে করে ছুটছে শিমুলিয়া ঘাটের দিকে। এরপর আরেকটি চেকপোস্ট দেখা গেছে দোগাছির পরে ডলফিন ফ্যাক্টরির সামনে। সেখান থেকে বিভিন্ন প্রাইভেট কারে আসা যাত্রীদের ঢাকার দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

বিআইডাব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বহরে থাকা ১৭টি ফেরির মধ্যে বর্তমানে ১৫টি চলাচল করছে। যাত্রী ভোগান্তি লাঘব ও পণ্যবাহী যানবাহন পারাপারে গতকাল সকাল থেকে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে সব কয়টি ফেরি চলাচল করছে।

পাটুরিয়া ঘাট : মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যও ঘরমুখো ঈদ যাত্রীদের চাপ অব্যাহত ছিল।  বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে নৌপথের বহরে ফেরির সংখ্যা বাড়িয়েছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। গতকাল পাটুরিয়া ঘাটের প্রবেশপথ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শিবালয়ের টেপড়া এলাকায় বিজিবি চেকপোস্ট বসিয়ে ঘাটমুখী প্রাইভেট কার ঢাকার দিকে ঘুরিয়ে দেয়। যাত্রীরা বাধ্য হয়ে হেঁটে বা রিকশা ভ্যানে ঘাটে পৌঁছে। এ সময় বৃষ্টির মধ্যে তাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

চন্দ্রা মোড়ে গাড়ির চাপ : রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের প্রবেশদ্বার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড় ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকার নন্দন পার্কের সামনে বসানো হয়েছে পুলিশের তল্লাশিচৌকি। পুলিশ ওই স্থানে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ফিরিয়ে দিলেও ফিরছে না তারা, ছুটছে গ্রামের বাড়ি। যাত্রীরা কিছুদূর হেঁটে গিয়ে নানাভাবে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে তারা দুর্ভোগে পড়ে। এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার প্রবেশদ্বার চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। দূরপাল্লার যানবাহন না থাকায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারে করে ছুটছে। এ সুযোগে চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের কালিয়াকৈর সীমানা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে, যাতে অন্য জেলার পরিবহন আমাদের এলাকায় ঢুকতে না পারে।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা।]



সাতদিনের সেরা