kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

মেধাসম্পদ আইন মেনেই কভিড ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা যায়

ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম   

১১ মে, ২০২১ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মেধাসম্পদ আইন মেনেই কভিড ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা যায়

সেদিন একটা টক শো দেখেছিলাম, সেখানে আলোচকদের দুজনই ছিলেন ওষুধ ও ঔষধশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচকদ্বয়ের একজন আরেকজনকে বলতে শুনলাম যে তাঁরা কেন ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য কম্পালসরি লাইসেন্স (বাধ্যতামূলক লাইসেন্স) ইস্যু করছেন না? আমার ধারণা, তাঁদের দুজনই ভেবেছিলেন যে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারীরা বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের জন্য প্রয়োজনীয় পেটেন্ট নিয়েছেন এবং ভ্যাকসিনের যাবতীয় তথ্য যেমন ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক এবং পেটেন্ট আবেদনকারী বা পেটেন্ট ধারক সম্পর্কে গ্রন্থাগারিক তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দাবি উদ্ভাবন ও এসম্পর্কিত অগ্রগতির বিবরণ এবং আবেদনকারীর প্রাপ্ত পেটেন্ট সুরক্ষার পরিধি নির্দেশক দাবির একটি তালিকা, যা সংক্ষেপে তৈরির ফর্মুলা, প্রসেস ও প্রয়োজনীয় বর্ণনা বাংলাদেশের পেটেন্টস, ডিজাইনস ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে (পেটেন্টস অফিস) জমা দিয়েছেন। এখন সরকার পেটেন্টস ও ডিজাইনস আইন ১৯১১-এর ২২ ধারার বিধানবলে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ইস্যু করে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এসেনশিয়াল ড্রাগ কম্পানি লিমিটেড বা অন্য কোনো ওষুধ কম্পানির মাধ্যমে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদন করে বিনা মূল্যে বা মূল্যের বিনিময়ে হাসপাতালে বা বাজারে সরবরাহ করতে পারবে। বিষয়টা কি তাই? আলোচনা করা যাক।

পেটেন্ট হলো পেটেন্ট মালিকের একটি একচেটিয়া অধিকার, যার ভিত্তিতে পেটেন্ট পণ্য বা প্রক্রিয়া পেটেন্ট মালিকের সম্মতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে তৈরি, ব্যবহার, বিতরণ, আমদানি বা অন্যের দ্বারা বিক্রি করা যায় না। এ অধিকারটি পেতে হলে পেটেন্ট মালিককে পেটেন্টস অফিসে পেটেন্ট সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য জমা রাখতে হয়। নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রকাশ্যে তথ্য প্রকাশের এই বাধ্যবাধকতা একটি আবিষ্কারের পেটেন্ট ধারককে দেওয়া একচেটিয়া অধিকারকে সামঞ্জস্য করে। এ ছাড়া এরূপ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অন্যান্য উদ্ভাবকরা নতুন প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে পারেন। আবার প্রকাশনা ছাড়া জনসাধারণের পক্ষে নতুন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার কোনো উপায়ও থাকে না।

পেটেন্ট মালিক পেটেন্ট সম্পর্কিত একচেটিয়া অধিকারটি স্বেচ্ছায় লাইসেন্স চুক্তির মাধ্যমে অন্যের কাছে প্রদান করতে পারেন। এ চুক্তিতে পেটেন্ট মালিক লাইসেন্সদাতা হিসেবে লাইসেন্স গ্রহীতার কাছ থেকে কী পরিমাণ লাইসেন্সিং ফি বাবদ রয়ালটি পাবেন, কী উদ্দেশ্যে যেমন উৎপাদন সুবিধার অভাবে অন্যকে প্রদান, পর্যাপ্ত উৎপাদন না করতে পারার কারণে অন্যকে প্রদান বা একটি ভৌগোলিক বাজারে মনোনিবেশ করা, কত সময়ের জন্য চুক্তিটি বলবৎ থাকবে, উৎপাদিত পণ্য কোন নির্ধারিত অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে ইত্যাদি উল্লেখ থাকে।

তবে পেটেন্ট মালিক এবং তৃতীয় পক্ষ বা জনস্বার্থ বা সমাজের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে একচেটিয়া অপব্যবহার রোধ করতে বা জনস্বার্থকে ব্যাপকভাবে প্রাধান্য দিতে পেটেন্ট মালিকের এই একচেটিয়া অধিকারটি কিছু কিছু সময় আইনগতভাবে খর্ব করা যায়। বাধ্যতামূলক লাইসেন্স সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটির মাধ্যমে সরকার পেটেন্ট মালিকের সম্মতি ব্যতিরেকে অন্য কাউকে পেটেন্টকৃত পণ্য বা প্রক্রিয়া উৎপাদন করার অনুমতি দেয় বা পেটেন্ট সুরক্ষিত উদ্ভাবন নিজেই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করে। এরূপ বিধান ১৮৮৩ সালের প্যারিস কনভেনশন ও ১৯৯৪ সালের ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্টে বর্ণিত আছে এবং এই বিধানের আলোকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য দেশে সরবরাহ করা যায়। তবে ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্টে নতুন যুক্ত ৩১বিআইএস অনুচ্ছেদ পেটেন্টকৃত ওষুধপণ্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে উৎপাদন করে শর্ত সাপেক্ষে তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুযোগ করে দিয়েছে।

বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ন্যায়সংগত করতে যে কারণগুলো ব্যবহৃত হতে পারে সেগুলো ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্ট বিশেষভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তবে ট্রিপস এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক দোহা ঘোষণা ২০০১ নিশ্চিত করেছে যে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি নির্ধারণ করতে এবং কোন কোন অবস্থায় জাতীয় জরুরি অবস্থা হবে, তা নির্ধারণ করতে দেশগুলো স্বাধীন।

সাধারণত স্বেচ্ছায় লাইসেন্সের জন্য কোনো আবেদনকারী ব্যক্তি বা সংস্থাকে যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে পেটেন্ট মালিকের সঙ্গে যুক্তিসংগত বাণিজ্যিক শর্তে আলোচনার চেষ্টা করতে হয়। যদি এটি ব্যর্থ হয়, তবে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা যেতে পারে। এ ছাড়া ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’, ‘অতি জরুরিজনিত অন্যান্য পরিস্থিতি’ বা ‘পাবলিক অবাণিজ্যিক ব্যবহার’ (বা ‘সরকারি ব্যবহার’) বা প্রতিযোগিতাবিরোধী কাজকর্মের বেলায় স্বেচ্ছায় লাইসেন্সের জন্য প্রথমে চেষ্টা করার দরকার নেই। তবে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান করা হলেও ওই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনার নিরিখে পেটেন্ট মালিককে রয়ালটির অর্থ প্রদান করতে হবে।

বাংলাদেশের পেটেন্টস ও ডিজাইনস আইন ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্ট বা দোহা ঘোষণা অনুসরণ না করলেও এর ২২ ধারায় বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের বিধান বর্ণনা করেছে। এই ধারার বিধান মতে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো পেটেন্ট পণ্যের চাহিদা পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং যুক্তিসংগত শর্তে পূরণ হচ্ছে না—এই মর্মে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারকে উদ্দেশ্য করে নির্ধারিত ফিসহ বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আবেদন পেটেন্টস অফিসে দাখিল করতে পারেন। এরপর সরকারপক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় বা হাইকোর্ট ডিভিশন উপর্যুক্ত রেফারেন্স প্রাপ্তির ভিত্তিতে দেশে নিবন্ধিত ওই পেটেন্ট পণ্যের চাহিদা পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং যুক্তিসংগত শর্তে পূরণ হচ্ছে না—এই তথ্য বিবেচনায় নিয়ে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আদেশ দিতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কভিড-১৯ ভ্যাকসিন বাংলাদেশে পেটেন্ট পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত কি না এবং এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে এটিকে সহজলভ্য করা যায় কি না। আমার জানা মতে, কভিড-১৯-এর কোনো ভ্যাকসিনের জন্য বাংলাদেশে পেটেন্ট দরখাস্ত করা হয়নি; আর ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধের পেটেন্ট দিতে বাধ্য নয়। ফলে পেটেন্টকৃত না হলে ভ্যাকসিনগুলোর ফর্মুলা, প্রসেস ও প্রয়োজনীয় বর্ণনা দেশটির কাছে থাকবে না এবং ভ্যাকসিনের চাহিদা পর্যাপ্ত পরিমাণে ও যুক্তিসংগত শর্তে পূরণ হচ্ছে না এ বিবেচনায় বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদান সম্ভব নয়।

কাজেই ভ্যাকসিনগুলোকে দেশে সহজলভ্য করতে হলে স্বেচ্ছায় লাইসেন্সের মাধ্যমে রয়ালটি পরিশোধ করে এগুলোর ফর্মুলা, বাল্ক (এপিআই) ও দেশের সস্তা শ্রম সহযোগে ভ্যাকসিন উৎপাদনে যাওয়া যেতে পারে অথবা ব্রাজিলসহ প্রায় ৬০টি দেশের কোয়ালিশনে যোগ দিয়ে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন সংক্রান্ত পেটেন্টের তথ্য উন্মুক্তের মাধ্যমে সেগুলো দিয়ে কম খরচে ভ্যাকসিন তৈরি করা যেতে পারে। আবার অন্য কোনো দেশ যদি বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উৎপাদন করে এবং বাংলাদেশ যদি তা আমদানি করতে সক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশে সহজলভ্য হবে। এ ছাড়া সময়সাপেক্ষ এবং কাঁচামাল দুষ্প্রাপ্য হলেও দেশীয় ওষুধ কম্পানিগুলো তাদের গবেষণাগারে ভ্যাকসিনগুলোর রেণু (মলিকুল) চিহ্নিত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ত্রুটির নিয়ম অনুসারে জেনেরিক বানিয়ে ভ্যাকসিনগুলো সহজলভ্য করতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, আইন অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা