kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের জাতীয় রাজনীতি

জয়ন্ত ঘোষাল   

১০ মে, ২০২১ ০৪:১৬ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের জাতীয় রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের বৈদ্যুতিন চ্যানেল নিউজ ২৪-এর একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণই ছিল সেদিনের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের আগ্রহের দুটি জায়গা, নাগরিকত্ব বিল এবং তিস্তাচুক্তি। এ ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনার সুযোগ ছিল। সেদিন যে কথা বলতে চেয়েছিলাম, সেটা হলো—আমাদের সাধারণভাবে একটা ধারণা এমন তৈরি হয়েছিল যে বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকত্ব বিল প্রয়োগ করবে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে ক্ষমতায় এলে ক্যাবিনেটের প্রথম সিদ্ধান্ত সেটাই হবে। বাংলাদেশে এই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। যদি বিজেপি এসে নাগরিকত্ব বিল সত্যি সত্যি প্রয়োগ করে, তবে সেটা হজম করা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন হবে। বিরোধিতার রণকৌশল নিতে হবে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে মর্যাদা দেয় বলে বাংলাদেশ সেটা করতে চায় না। কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা মাথায় রেখে সেটা করতে হতো। সুতরাং বিজেপি ক্ষমতায় না আসায় সেদিক থেকে বাংলাদেশের জনসমাজ মস্তবড় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

এমন ধারণা ছিল যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে হয়তো ডাবল ইঞ্জিনের তত্ত্ব অনুযায়ী তিস্তাচুক্তির দ্রুত রূপায়ণ নিশ্চিতভাবেই হতে পারে। যেভাবে ত্রিপুরায় বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে অনেক প্রকল্প রূপায়িত হচ্ছে। এ ব্যাপারেও কিন্তু আমার বক্তব্যটা একটু ভিন্ন, সে কথা খুব বিনীতভাবে চ্যানেলেও জানিয়েছিলাম। আজও জানাচ্ছি যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলেই যে তিস্তাচুক্তি হতো এটা মনে করাটাও অতি সরলীকরণ। তার কারণ সব সময় ঢাকায় বসে হয়তো অনেকে বুঝতে পারেন না বা দিল্লিতে বসেও বুঝতে পারেন না, পশ্চিমবঙ্গে এখন যা পরিস্থিতি তাতে বিজেপি উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে চাইছে এবং সেখানে দখল করতে চেয়েছিল। সেখানে বিজেপি এলে তিস্তাচুক্তি রূপায়িত হতে পারে, সেই প্রচারও কিন্তু উত্তরবঙ্গে বিজেপিকে এবারে ভোটদান থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। ২০১৯-এ যে বিজেপির ফলাফল হয়েছিল, তা কিন্তু এবার হয়নি। উল্টো সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস আবার তা হৃত মর্যাদা অনেকটাই ফিরে পেয়েছে। কাজেই বিজেপি ক্ষমতায় এলেই সেখানে দিল্লির পক্ষেও তিস্তাটা বাস্তবায়িত করাটা কতটা সহজ হতো সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। কেননা এখানে একটা স্থানীয় রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এলে, এবারে তৃতীয় ইনিংসে আগামী পাঁচ বছরেরও তিস্তাচুক্তি হবে না এমনটা কিন্তু আমি মনে করি না। বরং আমার মনে হয় জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা উৎসাহ তৈরি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সব বিরোধী দল মিলে একটা ঐকমত্য গড়ে তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটা নতুন অভিযানের প্রচেষ্টা আছে। সেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে, বিশেষত বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা, বোঝাপড়া তৈরি করা আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি জরুরি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনো চিড় ধরেনি। সেই সম্পর্কটা ভালোবাসার। শেখ হাসিনা যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেছেন তখনই তিনি অভিভূত হয়ে গেছেন। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। যখন শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন, সেই সময় যখন দিল্লি এসেছিলেন অশোকা হোটেলে ছিলেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর বোন শেখ রেহানাও ছিলেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক এবং লেখিকা বেবী মওদুদও ছিলেন। গভীর রাত পর্যন্ত সেদিন আড্ডা হয়েছিল। তিস্তাচুক্তির রূপায়ণ করতে বাধা দেওয়া হয়তো সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বার্থে কিছুটা ‘কমিউনিকেশন এরর’ তৈরি হয়েছিল। দিল্লি যদি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো মেনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ককে সংঘাতের থেকে একটু বেশি সৌহার্দপূর্ণ পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো এখন তাঁর এই তৃতীয় ইনিংসের প্রথমার্ধেই ইতিবাচকভাবে সাড়া দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যদি সরাসরি না হলেও একটা ট্র্যাক-২ কূটনীতি বিভিন্ন সঠিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে করা হয়, তাহলে সেটার সম্ভাবনা আছে।

আমি এই কারণে একটা ইতিবাচক কথা বলছি। তার একটাই কারণ যে কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে তিস্তার ব্যাপারে যে কমিটি তৈরি করা হয়েছিল, সেই কমিটির রিপোর্টে কিন্তু পরিষ্কার বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকার যদি একটা বিপুল অর্থ পশ্চিমবঙ্গকে দেয়, উত্তরবঙ্গে বেশ কিছু জলাধার তৈরি করা যায়। সেই জলাধারগুলো সুষ্ঠুভাবে নির্মাণ করলে এটা গ্যারান্টি করা যায় যে তিস্তার জলে শুকনা মৌসুমেও উত্তরবঙ্গে কোনো জল সংকট হবে না। আবার বাংলাদেশেরও পানি সংকটও ঘুচে যাবে। সেটার জন্য সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীকেও এ ব্যাপারে ইনভলভ করে একটা বৈঠক করা, আলোচনা করার প্রস্তাব ছিল। নানা কারণে সেটাও প্রধানমন্ত্রী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরের পরও কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকাতে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসঙ্গে গিয়েছিলেন, আমি তখন সফরসঙ্গী ছিলাম। সেই সময়ে আমি দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে বেশ একটা ঐকমত্যের আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আবার বিজেপি এবং তৃণমূলের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির আবহে সেই পরিস্থিতিটাও বিগড়ে গিয়েছিল।

এবারে আসি এই নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে একটা প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠল—একটা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গে প্রথম এত বড় একটা আকার নিল। ৭৭টি আসন দখল করল, যেখানে তাদের তিনটি আসন ছিল। আগামী পাঁচ বছর বিজেপি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিশ্চয়ই নেবে। কংগ্রেস এবং সিপিএম এই দুটি দলকেই কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে এই ভোট। স্বাধীনতার পর সম্ভবত প্রথম এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে বিধানসভায় একটিও বাম সদস্য থাকল না। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে আক্রমণাত্মক রাজ্য বিজেপিকে প্রতিহত করাটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। আবার অন্যদিকে কেন্দ্রের সঙ্গে এখনই সংঘাতের পথে গিয়ে মোদিবিরোধী রাজনীতিতে অংশ নেওয়াটাও কিন্তু মমতার লক্ষ্য নয়। ২০২৪ আসতে এখনো বেশ কিছুটা দেরি আছে। করোনা আক্রান্ত সময়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতি, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার গ্রামে গ্রামে। তার মধ্যে রাজনৈতিক হিংসা যেকোনো মূল্যে থামাতে হবে। সেটা যদি না থামানো হয়, যদি কোনো কারণে এটা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের চেহারা নেয়, তাহলে সেটাতে কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শাসকদল। সেই কারণে এই ব্যাপারে সচেতন মমতা। এই বিষয়গুলোকে আগে নিষ্পত্তি না করে এখনই বিরোধী রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়া মমতার রাজনৈতিক কৌশল নয়।

বিজেপি রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে এত সোচ্চার কেন? তার পেছনেও একটা জাতীয় রাজনীতির তত্ত্ব লুকিয়ে রয়েছে। নরেন্দ্র মোদির দুটি লক্ষ্য—এক. ২০২৪-এর আগে মমতার নেতৃত্বে বিরোধী দল যাতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটা বিকল্পের চেহারা ধারণ করতে না পারে, তার জন্য প্রথম দিনেই বিল্লিকে মেরে ফেলা। দুই. রক্তরঞ্জিত বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ নিয়েছেন, এই বার্তাটাকে যদি জাতীয় প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত করা, তাহলে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী, শারদ পাওয়ার, স্ট্যালিন, কেজরিওয়াল কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে এসে দাঁড়াতে পারবেন না। রাজনৈতিক হিংসা ইস্যুতে মমতাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে।

আপাতত এটাই হচ্ছে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল। আর এই পরিস্থিতিতে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর সাবেক ওএসডি সুধীর কুলকার্নি লেখেন, ‘যে মমতা প্রধানমন্ত্রী পদের একজন যোগ্য দাবিদার।’ তখন এই বিজেপির রাজনীতিটাও আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে মমতা ধীরপায়ে এগোতে চাইছেন। উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন সামনের বছর। শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, গুজরাট থেকে শুরু করে জম্মু কাশ্মীরসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোট আছে। দেখার বিষয়, এসব নির্বাচনে বিজেপি কী ফলাফল করে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ বিজেপি যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে টিকে থাকে, নাকি সেখানে বিরোধী নেতা অখিলেশ অথবা মায়াবতী এই রাজনৈতিক পরিসর দখল করে। এসব আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখতে চাইবেন। এটা ঠিক যে একটা বিরোধী ঐক্য রচনা করে রাখতে চাইবেন মমতা। যোগাযোগ রাখতে চাইবেন। ইউপিএর চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী অসুস্থ। সুতরাং ইউপিএ নতুন করে আবার পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন কনভেনর তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন। কিন্তু তার বেশি নয়। এখনই দিল্লিতে এসে দাপাদাপি করাটা মমতার লক্ষ্য নয়। তার চেয়ে অনেক বড় জরুরি কাজ হলো, কেন্দ্রের সঙ্গে এখনই সংঘাতে না গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে একটা বোঝাপড়ার রাজনৈতিক রণকৌশল নেওয়া। এই বোঝাপড়ার আবহটা প্রশাসনিক স্বার্থেও জরুরি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও জরুরি। তিস্তাচুক্তি রূপায়িত করার জন্যও জরুরি। সেই কারণে এই মুহূর্তে ঢাকার দিক থেকেও একটা ইতিবাচক সাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন। শেখ হাসিনা নিজে চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে ভারত-বাংলাদেশের মৈত্রীর প্রাসঙ্গিকতা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানিয়ে প্রেস বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনে জনগণের সমর্থন (mandate) লাভ করেছে, যা আপনার নেতৃত্বের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের জনগণের অব্যাহত আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ আপনি বাঙালির দীর্ঘ লালিত মূল্যবোধ ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ’ ধারণ করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সারা জীবন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ড. মোমেন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান এবং সাম্প্রতিক বছরে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো আরো প্রসারিত হয়েছে। অবিভক্ত ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, মূল্যবোধ এবং বংশানুক্রমিক সংযোগ দুই দেশের জনগণের সম্পর্ককে অনন্য ও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ বাংলাদেশিদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, মুজিববর্ষ এবং বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপনের এই বিশেষ বছরে আমি পশ্চিমবঙ্গের জনগণসহ ভারতের জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন ও আত্মত্যাগকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আপনার অঙ্গীকার ও সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে এবং অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর সমাধান হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

২০১৪ সালে মোদি জিতেছিলেন, ঠিক সেই দিনই দিল্লিতে জনপথ হোটেলে বাংলাদেশের একটি চ্যানেলে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল এবং সেই দিনই আমি বলেছিলাম, অনুপ্রবেশ নিয়ে আপনাদের অযথা ভীতি ছড়ানোর দরকার নেই। নরেন্দ্র মোদি ঠিক ভোটের আগে কলকাতায় গিয়ে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কটাকে আরো অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অনুপ্রবেশটা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু কথা বলতে পারেন। যেমন—আদভানি বলতেন। রাজনাথ সিং বলতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু বাজপেয়ী কখনো বলতেন না।

অনুপ্রবেশের থেকেও অনেক বেশি জরুরি ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমরা এই গত সাত-আট বছরে নরেন্দ্র মোদির শাসনে দেখলাম যে তিনি ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ককে দ্রুতবেগে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেহেতু জাতীয় নেত্রী হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এগোচ্ছেন। সেই কারণেই এই পরিস্থিতিটা নরেন্দ্র মোদি ব্যবহার করতে চাইবেন। তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর, পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, বাংলাদেশের কর্মরত হাইকমিশনার সমবেতভাবে মোদি-মমতার সম্পর্ককে যদি বাংলাদেশের ব্যাপারে ইতিবাচক পথে নিয়ে যাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা যদি সক্রিয় হন, তাহলে আমরা হয়তো একটা সফলতার পথে এগোতে পারি। ‘আশায় মরে চাষা’—এ কথাও যেমন অনেকে বলেন। আমি বলি, ‘আশায় বাঁচে চাষা’। আমরা যে তত্ত্বে বিশ্বাস করি, ইংরেজিতে তাকে বলে, Hope against hope. কেননা আলোচনা ছাড়া সংঘাতের পথে গিয়ে এ পৃথিবীতে কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। এ পদ্ধতিকেই তো বলা হয়, Dialogueism.সেই কথোপকথনের আবহকে তৈরি করতে হবে। আমাদের ভারত এবং বাংলাদেশের মৈত্রীর পক্ষে যাঁরা, যাঁরা এই সম্পর্কে বানচাল করতে চান না। আমরা সবাই সক্রিয়ভাবে এই কাজে নিযুক্ত হব বলেই আশা করি।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা