kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

শুধু বাইরে নন তিনি সবখানে

সেলিনা হোসেন   

৮ মে, ২০২১ ০৪:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শুধু বাইরে নন তিনি সবখানে

প্রতিবছর রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিক-মৃত্যুবার্ষিক উদযাপনের বাইরেও বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সভা-সমিতির আয়োজন করে। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে আমরা রবীন্দ্র জন্মবার্ষিক, মৃত্যুবার্ষিক বলি না। আমরা বলি পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণ। তারিখ দুটি আমাদের জীবনের এক গভীর প্রত্যয়। শুধু জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় জন্মদিন হলো—‘হে নতুন দেখা দিক আরেকবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ আর মৃত্যু? তিনি বলেছিলেন, ‘মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান।’ জীবন ও মৃত্যুকে আমরা এভাবে দেখি। আমাদের সংগ্রামে, আমাদের অস্তিত্বে জীবন এবং মৃত্যু এভাবে মিলেমিশে থাকে। তাই পঁচিশে বৈশাখ এবং বাইশে শ্রাবণ আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে এক অলৌকিক আহ্বান।

রবীন্দ্রসংগীত আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত ছিল বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তা ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে। যে কারণে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা অনেক বেড়েছে।

ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরের প্রতিটি জেলা শহরে রবীন্দ্রসংগীত শেখার জন্য স্কুল খোলা হয়েছে। প্রতিবছর রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন কমিটি তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সম্মেলন প্রতিবছর এখন আর শুধু ঢাকায়ই হয় না, ঢাকার বাইরে যেকোনো একটি জেলায় অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপকতা ছড়িয়ে দেওয়া। এই সম্মেলন দুভাবে উদযাপন হয়। একদিকে থাকে সেমিনার, নাটক, অন্যদিকে সংগীত। বিভিন্ন বয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে গানের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। গত কয়েক বছর ধরে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ এই সম্মেলনের অপেক্ষায় থাকে। কবি সুফিয়া কামাল একবার এই সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের জীবনের উপাসনার মতো।’

এই উক্তিতে মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। সুফিয়া কামালকে এই উক্তি প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছিল। অবশ্য সুফিয়া কামাল তাদের এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি। তিনি তেমন ব্যক্তিত্ব নন। ষাটের দশকে যখন ‘ছায়ানট’ সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তা-ভাবনা হয়, তখন প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় সুফিয়া কামালের বাসায়।

আমরা অপসংস্কৃতির কথা বলি, বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কথা বলি, কিন্তু না, তার পরও এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে রবীন্দ্রসংগীত বুকের ভেতরের। তুমুল হট্টগোলের ইংরেজি গান শোনা ছেলে-মেয়েদের দেখেছি, দুঃখ পেলে, খারাপ লাগলে রবীন্দ্রসংগীত শুনছে।

ঢাকার মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়। ‘অচলায়তন’, ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘দুই বোন’সহ ‘শ্যামা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’ ইত্যাদি নৃত্যনাটকও হয়। পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণ ঢাকা টেলিভিশন রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ প্রচার করে।

বর্ষবরণের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের গভীর যোগ আছে। বাংলা নববর্ষ এবং রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে এক হয়ে যায়। ষাটের দশকের শুরুতে ‘ছায়ানট’ রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। অবশ্য ১৩৭০ সালে পহেলা বৈশাখে সকাল বেলায় এই সংগীত বিদ্যায়তনের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। প্রথমে ওরা পহেলা বৈশাখ করত এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিক হিসেবে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো ঘরের ভেতরে। কিন্তু আস্তে আস্তে স্কুলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চেয়ে বর্ষবরণের বৃত্তের বোধটি সবার ভেতর সঞ্চারিত হতে থাকে। তাই ঘরের ভেতর নয়, খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠানের আয়োজনের দাবি ওঠে। যত দূর মনে পড়ে ১৯৬৭ সালে প্রথম রমনার বটমূলে নববর্ষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চমৎকার আমন্ত্রণপত্র। বড় মাটির হাঁড়িতে বটপাতা ভিজিয়ে রেখে পচিয়ে পাতার শিরাগুলো চমৎকার কারুকাজ করে আমন্ত্রণপত্রের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেদিনের স্মৃতিচারণা করার সময়ে কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, পহেলা বৈশাখ খোলা আকাশের নিচে রবীন্দ্রনাথের গান যেন ব্যাপ্ত হয়ে গেল চারদিকে। মনে হলো, তিনি শুধু বাইরে নন, বুকের ভেতরও, তিনি সবখানে। বর্ষবরণ এবং রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার আলোকরাজি।

১৮৮৮ সালে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে যে চিঠি লিখেছেন, তা এমন : ‘পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই যে ছোট নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতি রাত্রে শত সহস্র নক্ষত্রের নিঃশব্দ অভ্যুদয় হচ্ছে, জগৎ সংসারে এ যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা, তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়।’

১৮৯৩ সালের ১৬ মে শিলাইদহ থেকে আবার লিখছেন, ‘আমি প্রায় রোজই মনে করি, এই তারাময় আকাশের নিচে আবার কি কখনও জন্মগ্রহণ করব। আর কি কখনও প্রশান্ত সন্ধ্যাবেলায় এই নিস্তব্ধ গোড়াই নদীটির উপর বাংলাদেশের এই সুন্দর একটি কোণে এমন নিশ্চিত মুগ্ধ মনে জলিবোটের উপর বিছানা পেতে পড়ে থাকতে পারব।...আশ্চর্য এই, আমার সবচেয়ে ভয় হয় পাছে আমি য়ুরোপে গিয়ে জন্মগ্রহণ করি।’

এই সব চিঠি আছে ‘ছিন্নপত্র’-এ। ‘ছিন্নপত্র’ অন্তরঙ্গ লেখা, এখানে বানানো কিছু নেই। এমনকি শিল্পের জন্য শিল্পীকে যতটুকু নির্মাণ করতে হয় সেটুকুও মনে হয় নেই। ‘ছিন্নপত্র’ চিঠি হিসেবে লেখা হয়েছিল এবং চিঠিতে মানুষ নিজেকে খোলামেলা তুলে ধরে। রবীন্দ্রনাথের এই কথা তাই তাঁর মনের একান্ত কথা। যদি এমনটি কোনো দিন হয়, রবীন্দ্রনাথ সত্যি সত্যি এই জীবনে আবার ফিরে আসেন এবং তাঁর ইচ্ছামতো বাংলাদেশেই ফিরে আসেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলবে। তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথ সেই মানুষ, যিনি তাঁদের সংস্কৃতি চেতনায় মিশে আছেন—তিনি সেই মানুষ, যার জন্য তারা পাকিস্তানি শাসকের আরোপিত বাধা-নিষেধকে নির্দ্বিধায় বাতিল করে দিয়েছে—অকুতোভয়ে অগ্রাহ্য করেছে।

আবার যদি রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন, তাহলে আমরা তাঁকে সগর্বে বলতে পারতাম, আপনার দ্বিতীয় জন্ম সার্থক হয়েছে। বাংলা ভাষার একটি দেশ হয়েছে—আমরা বাংলাদেশের মানুষ আপনার অপেক্ষায় আছি। আপনার ভয় নেই, আপনাকে ইউরোপে জন্মগ্রহণ করতে হবে না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক



সাতদিনের সেরা