kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

চক্রের পকেটে ৫ কোটি টাকা, ভিসি ৫০ লাখ!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ

রফিকুল ইসলাম ও রেদওয়ানুল হক    

৮ মে, ২০২১ ০২:৩৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চক্রের পকেটে ৫ কোটি টাকা, ভিসি ৫০ লাখ!

ড. সোবহান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিদায়বেলায় ১৪১ জনকে নিয়োগ দেওয়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। এমন অভিযোগও উঠেছে যে বিদায়ি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্নজনের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এ ছাড়া ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চাকরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।

বলা হচ্ছে, ঘুষের টাকা ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের (একাংশ) চাপের কারণেই এমন জোড়াতালির নিয়োগ দিয়েছেন ড. সোবহান। এমনও বলা হচ্ছে, এই নিয়োগ না দিলে তিনি ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা তাঁকে ক্যাম্পাসের ফটকেই লাঞ্ছিত করতেন। এই ভয়েই তিনি ছাত্রলীগের ২৫-৩০ জনকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেন। এঁদের ১৫ জনই তৃতীয় শ্রেণির। দু-একজন পেয়েছেন প্রথম শ্রেণির চাকরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীও আছেন। এটি করতে গিয়ে একটি চক্র নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকা গেছে ড. সোবহানের পকেটে।

নিয়োগপ্রাপ্ত রাবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির পদে। এই রাগে নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসেছি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ড. সোবহানের কাছ থেকে নিয়োগ আদায় করতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীরা এক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু উপাচার্য গড়িমসি করে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। এরই মধ্যে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ, জেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতারাও চাকরির জন্য উপাচার্যের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এক পর্যায়ে তাঁর মেয়াদ (৬ মে) শেষ হওয়ার চার দিন আগেই উপাচার্যকে তাঁর বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা ৪ মের সিন্ডিকেট সভাও পণ্ড করে দেন। শেষমেশ গত বৃহস্পতিবার ড. সোবহান কোনোমতে ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান।

কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা সামনে আসে উপাচার্য ক্যাম্পাস থেকে চলে যাওয়ার পর। সেই তালিকা দেখার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান অনেকে। কেউ কেউ নিয়োগপত্র ছিঁড়েও ফেলেন।

তালিকায় দেখা গেছে, নিয়োগ পাওয়া ১৪১ জনের মধ্যে ১১ জনকে শিক্ষক, ২৩ জনকে কর্মকর্তা, ৮৮ জনকে উচ্চমান সহকারী ও ৯ জনকে ইমাম হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাবি প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ভিসি নিয়োগের নথিতে সই করতে বললেও রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম তাতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ড. সোবহান একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে দিয়ে নিয়োগপত্রে সই করিয়ে নেন।

তালিকা ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষক পরিবারের তিন সদস্য শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। যে বিভাগগুলোতে তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, সেসব বিভাগের প্ল্যানিং কমিটিও নিয়োগের ব্যাপারে কিছু জানে না।

শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন বাংলা বিভাগের খন্দকার ফরহাদ হোসেনের ছেলে ঋত্বিক মাহমুদ। তিনি সংগীত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ওই বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির সদস্য পদ্মীনি দে বলেন, ‘নিয়োগ নিয়ে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির কোনো সভা হয়নি। উপাচার্য কিভাবে নিয়োগ দিয়ে গেছেন, তা সবাই জানেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য এবং প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম সাউদ বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ লাগে। এই নিয়োগে তা নেওয়া হয়নি। এই নিয়োগ অবৈধভাবে ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়েছে।’

ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ইলিয়াস হোসেন, আতিকুর রহমান সুমন, সাবেক ছাত্রবৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক টগর মো. সালেহ, বর্তমান সহসভাপতি মাহফুজ আলামিন, সুরনজিত প্রসাদ দীপ্ত, ফারুক হোসেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও ছাত্রলীগ নেতা শামীম রেজা, ফিরোজ ও ডিল।

রাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি মাহফুজুর রহমান এহসান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ছাত্রলীগের কিছু জনকে চাকরি দিয়ে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে যদি অন্যগুলো ব্যবসা হয়, তাহলে কী বলব? ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নাকি নিম্নমান সহকারী! জুনিয়ররা বড় পোষ্টে, সিনিয়ররা নিম্নমান! সাংবাদিকরাও ছাত্রলীগ কোঠায়, বাহিরের মেয়েরাও ছাত্রলীগ কোঠায়!’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ড. সোবহান নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্বে এসে তিনি নিয়োগ বাণিজ্য করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদেও তাই করলেন।

অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দুই মানদণ্ডে চাকরি দেওয়া হয়েছে। একটি ঘুষ; আরেকটি উপাচার্যের সঙ্গে সম্পর্ক।

দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের ব্যানারে আন্দোলনকারী অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে যাঁদের নিয়োগ হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেসব শিক্ষকের ছেলেকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার ভিত্তি কী, আমাদের জানা নেই। এসব শিক্ষকের সঙ্গে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠতা আছে।’

সার্বিক বিষয় নিয়ে ড. আব্দুস সোবহানের মোবাইল ফোনে কয়েকবার চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।



সাতদিনের সেরা