kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রলীগের সংঘর্ষের মধ্যেই ১৪১ নিয়োগ বিদায়ি ভিসির

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি    

৭ মে, ২০২১ ০২:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছাত্রলীগের সংঘর্ষের মধ্যেই ১৪১ নিয়োগ বিদায়ি ভিসির

নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতিসহ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বছরজুড়েই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহান। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের শেষ কর্মদিবসে ছাত্রলীগ, চাকরিপ্রত্যাশী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের সংঘর্ষের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৪১ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। পরে তিনি পুলিশ প্রহরায় ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছেন। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

বিদায়ি উপাচার্য ড. সোবহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জনবল নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে আবারও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহাকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ক্যাম্পাসে হুলুস্থুল, সংঘর্ষ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল ছিল উপাচার্য ড. সোবহানের শেষ কর্মদিবস। এর আগের দিন রাতেই ক্যাম্পাসে প্রচার হয় যে যাওয়ার আগে উপাচার্য শতাধিক নিয়োগ সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। এ খবর পেয়ে গতকাল সকাল ৯টার দিকে রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের চাকরিপ্রত্যাশীরা ক্যাম্পাসে এসে অবস্থান নেন। অন্যদিকে সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান করছিলেন।

দুপুর ১২টার দিকে মহানগর ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী শেখ রাসেল স্কুলের মাঠ থেকে প্যারিস রোড হয়ে প্রশাসন ভবনের সামনে আসেন। এরপর তাঁরা প্রশাসন ভবনের পাশে শহীদ শামসুজ্জোহা চত্বরে অবস্থান নেন। এ সময় সেখানে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিপ্রত্যাশী সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মাস্টাররোলের কর্মচারীদের সামনে পড়েন। তখন একদল যুবক সদস্য নিয়োগপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সেকশন অফিসার মাসুদের ওপর হামলা চালায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এগিয়ে এলে তাঁদের ওপরও হামলা করা হয়। পরে রাবি ছাত্রলীগ সংগঠিত হয়ে মহানগর ছাত্রলীগকে ধাওয়া করে। এ সময় রাবি ছাত্রলীগ, মহানগর ছাত্রলীগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ লাঠিপেটা করে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘মহানগর ছাত্রলীগের কিছু সদস্য হঠাৎ ক্যাম্পাসে এসে ঝামেলা করে। তারা এখন আর নেই। তাদের প্রতিহত করা হয়েছে।’

অন্যদিকে মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি সিয়াম আহমেদ বলেন, ‘সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছেন, এটা অন্যায়। এর প্রতিবাদ করতে আমরা ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে মারামারি বেধে যায়।’

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘উপাচার্যের বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগের আগে মহানগর ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।’

নিষেধাজ্ঞার পরও ১৪১ জনকে নিয়োগ

২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্বে এসে ড. সোবহান নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালের ৭ মে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য নিয়োগ পান তিনি। দ্বিতীয় মেয়াদেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব নিয়োগ স্থগিত করে দেয়। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই অ্যাডহকে ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে বিদায় নিলেন উপাচার্য। নিয়োগপ্রাপ্তরা গতকাল দুপুরে প্রশাসন ভবনে নিয়োগসংক্রান্ত ফরম পূরণ করেন। উপাচার্যের এভাবে নিয়োগ দেওয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি জড়িত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রভাষক পদে ৯ জন, সেকশন অফিসার পদে ২৩ জন, সহায়ক কর্মচারী পদে ২৪ জন এবং উচ্চ ও নিম্ন সহকারী পদে ৮৫ জন রয়েছেন। সহকারী রেজিস্ট্রার মোখলেসুর রহমান অ্যাডহকে ১৪১ জনকে নিয়োগের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে অধ্যাপক ড. সোবহান উপাচার্য ভবন ত্যাগ করেন। এ সময় তাঁর গাড়ির সামনে ও পেছনে তিনটি পুলিশের গাড়ি ছিল। তিনি নগরীর চৌদ্দপায় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হাউজিং সোসাইটিতে নিজের বাসায় উঠেছেন। 

কী বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা

এদিকে নিয়োগ নিয়ে উপাচার্য ভবন, প্রশাসন ভবনে ছাত্রলীগের তালা ঝোলানো, দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের চাকরিপ্রত্যাশী ছাত্রলীগ কর্তৃক গুলি করার হুমকি, উপাচার্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, বর্তমান প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে বলে মনে করছেন শিক্ষকদের অনেকেই। তাঁরা বলছেন, উপাচার্যের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কখনোই সুফল বয়ে আনতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসের এই পরিস্থিতি দেশের সবাই দেখছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শেষ মুহূর্তেও নিয়োগ হলো, সংঘর্ষও ঘটল। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একসময় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং জাতি দীর্ঘমেয়াদি অবনমনের দিকে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম খান বলেন, নিয়োগসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কিছুদিন থেকেই ক্যাম্পাসে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে আসলে নিয়োগই এখানে প্রধান ইস্যু কি না তা নিশ্চিত নই। তবে ক্যাম্পাসের এসব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে নিঃসন্দেহে ক্ষুণ্ন করছে।

জানতে চাইলে গতকাল দুপুরে উপাচার্য আব্দুস সোবহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ (গতকাল) রাত ১২টা পর্যন্ত আমার নিয়োগ আছে। আমি এর আগেই বাড়ি ছেড়েছি।’ তবে শত বিতর্কের পরও নিজেকে সফল দাবি করে উপাচার্য সোবহান বলেন, ‘আমি মনে করি, সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। এই চেয়ারটি অনেক চ্যালেঞ্জের। সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করতে হয়।’ এ সময় ১৪০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।

উপাচার্যের অনিয়ম তদন্তে কমিটি

উপাচার্য ড. সোবহানের বিরুদ্ধে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে আবারও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মো. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. জাকির হোসেন আখন্দ ও ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে অবৈধ নিয়োগ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা