kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

খেলা শেষ নয়, খেলা শুরু

জয়ন্ত ঘোষাল   

৪ মে, ২০২১ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



খেলা শেষ নয়, খেলা শুরু

এর চেয়ে বড় ব্রেকিং নিউজ আর কী হতে পারে! পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন, যাকে বিজেপি বলেছিল ‘আসল পরিবর্তন’ সেটা হলো না। হলো প্রত্যাবর্তন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আবার ফিরে এলো পশ্চিমবঙ্গের সিংহাসনে। কিন্তু এই ভোটের বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথম যে কথাটা বলতে হবে—বিজেপি পরাস্ত হয়েছে, ক্ষমতায় আসতে পারল না এটা যেমন সত্য; কিন্তু এ কথাও সত্য যে বিজেপির ২০১৬-তে বিধানসভায় ছিল মাত্র তিনজন বিধায়ক। সেই তিনজন বিধায়কের জায়গায় ৭৭ হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল আগেই বিজেপি হয়ে গেছে। এবারে বিধানসভায় এত আসন নিয়ে বিজেপি আসবে এবং বিজেপি রাজনীতিতে এই মুহূর্তে পূর্ণচ্ছেদ তো নেই, বরং নতুন উদ্যমে বিজেপি মমতাবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিজেপি হারল কেন? আসুন, আমরা এক এক করে আলোচনা করি। বিজেপির পরাজিত হওয়ার পেছনে আমি ১০টি কারণ তুলে ধরতে চাই।

প্রথম কারণ : এই নির্বাচনে খুব বড় হয়ে উঠল বাঙালি জাতিসত্তার রাজনৈতিক তাস, যেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সুচতুরভাবে ব্যবহার করলেন। তিনি মোদি-অমিত শাহকে ‘বহিরাগত’ বলে আখ্যা দিলেন। এটাতে খুব সূক্ষ্মভাবে বাঙালি ও অবাঙালির প্রাদেশিকতার রাজনীতি প্রচ্ছন্নভাবে আছে বলে অনেকে মনে করলেন। কিন্তু তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস সেটাকে বারবার ক্ল্যারিফাই করলেন এবং জানালেন যে এটা আসলে বাঙালি-অবাঙালি নয়, আসলে বঙ্গ সংস্কৃতির নিজস্বতাকে আক্রমণকারী মোদি-অমিত শাহরা অনেকটা নাদির শাহের মতো আক্রমণ করতে আসছে এবং বঙ্গ সংস্কৃতিকে তছনছ করে দিতে চাইছে। বাঙালির গর্ব যে রেনেসাঁ শহর কলকাতা, উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক শহর। ১৯১১ সালে রাজধানী স্থানান্তর করে ব্রিটিশরা নিয়ে গিয়েছিল। বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে গেল মুম্বাইয়ে। দিল্লি রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে গেল। আর পশ্চিমবঙ্গ লবডঙ্কা। ঠিক একটা সময়ে সিপিএম যে রকমভাবে বঞ্চনার রাজনীতি করত যে পশ্চিমবঙ্গকে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিপিএম ‘মাসুল সমীকরণ নীতি’ থেকে শুরু করে রাজস্ব পর্যন্ত সব ব্যাপারে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের তর্জনী তুলত আর বলত ‘বিমাতাসুলভ মনোভাব’। সেই একই রাজনীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করলেন এবং দেখিয়ে দিলেন যে কিভাবে এই ‘বেঙ্গলি আইডেনটিটি’ ব্যবহার করা যায়। বেঙ্গলি আইডেনটিটি ব্যবহার করা মানেই হিন্দু ভোটকে বিজেপি ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে সুসংহত করতে চেয়েছিল। সেটা সম্ভব হলো না। কেননা বাঙালি তো হিন্দু এবং মুসলমান দুই পক্ষই আছে। মুসলমান সমাজ যে রকম আরো বেশি করে মমতার দিকে কনসলিডেটেড হয়েছেন সেটা পরে আলোচনায় আসছি। কিন্তু বাঙালি, সে বাঙালি হলেও তার যে হিন্দু সমাজ তারা কিন্তু বিজেপিকে ভোট না দিয়ে বাঙালিত্বের কারণে তারা মমতার পক্ষে ভোট দিল। ২০১৯-এ বিজেপি ১৮টা আসন পেয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে অমিত শাহ যখন রোড শো করেছিলেন, তখন কলেজ স্ট্রিটে বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল। সেটার জন্য বিজেপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কলকাতার মূল শহরের প্রায় ৯টা আসন বিজেপি কিন্তু পায়নি, তৃণমূল পেয়েছিল। সেই সময় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছেন যে বাঙালির জাতিসত্তার রাজনীতিটা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমবেতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তার ফলে তিনি একটা ভিকটিম স্ট্যাটাস পেয়েছেন। এত বড় একটা শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘন ঘন কলকাতায় আসছেন। এত ঘন ঘন জনসভা করছেন। দেশের একটা বিধানসভা নির্বাচনের জন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী এতবার আগে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কখনো আসেননি। এই যে প্রধানমন্ত্রীর আসা, অমিত শাহের আসা, নাড্ডার আসা, ডজন ডজন বিজেপির নেতা-সংসদ সদস্যদের আসা, যেটাকে বলে ‘ওভার ডু’। এটাও অনেক সময় কেন্দ্রের অতি হস্তক্ষেপ বাঙালির বোধ হয় পছন্দ হয়নি। রান্নার অনেক উপাদান ছিল। অনেক রকমের শাক-সবজি, সুন্দরভাবে কাটাকুটি করা হয়েছিল, মসলাটসলা সবই ছিল। কিন্তু নুন অনেক বেশি পড়ে গেল। ওই অতিসক্রিয়তা কেন্দ্রের। এই যে এনফরসমেন্ট, সিবিআই অভিষেকের বাড়িতে যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সুনিপুণভাবে, তাঁর কমিউনিকেশন স্কিলকেও মারত্মক রকমের বলতে হবে। তিনি তাঁর মতো করে মেঠো স্টাইলে, তাঁকে যতই নিন্দা করা হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছে, এটা তাঁর বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তিনি ভিকটিম স্ট্যাটাস হয়েছেন। একটা সময়ে কংগ্রেস যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে নানা রকমভাবে আক্রমণ করত এবং শয়তান পর্যন্ত বলেছিল, সেগুলো কিন্তু সবই মোদির পক্ষে গিয়েছিল। সুতরাং এই একই রকম ভিকটিম স্ট্যাটাসের কার্ডটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খেলতে সক্ষম হয়েছেন।

তৃতীয় কারণ : মেরুকরণ যেটা বিজেপি ভেবেছিল হবে, সেটা শতকরা ৩০ ভাগ মুসলমান সমাজ আছে আসামে এই ফলটা হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব বুঝতে পারলেন না, যে আসাম আর পশ্চিমবঙ্গ দুটি আলাদা রাজ্য, আলাদা মানসিকতা। বাঙালি মানসিকতা আলাদা। কলকাতার বাঙালি এবং আসামের অহমিয়া মানসিকতার অনেক তফাত আছে। অনেক স্তর আছে। এগুলো কিন্তু একই রকম নয়। একটা অখণ্ড ভারত যদিও আমরা বলি। কিন্তু ভারতের মধ্যে অনেক ভারত আছে। একেকটা রাজ্যের প্রকৃতি একেক রকমের, তার মানসিকতা একেক রকমের। সেগুলোকে না বুঝতে পেরে গড়পড়তা উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের স্টাইলে হিন্দু-মুসলমান রাজনীতির মেরুকরণ করাটা এখানে সম্ভব হলো না। কেননা বাঙালি হিন্দুরা কিন্তু ঠিক উত্তর প্রদেশের বা বিহারের মতো অত রিচুয়ালিস্টিক হিন্দু নয়। এখানে আমরা বাঙালি হিন্দুরা মুসলমান রাঁধুনির হাতে খাবার খাই। বরং খানসামা এবং বিভিন্ন মুসলমানের মনে হয় যে তাদের হাতের রান্না অনেক সুস্বাদু। এমনকি মুসলিম দোকানে ঘন ঘন বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য বাঙালি হিন্দুদের প্রায়ই উইকএন্ডে যেতে দেখা যায়। এই বাঙালি হিন্দু কিন্তু অনেক কসমোপলিটন হিন্দু। অনেক প্লুরালিস্টিক বহুত্ববাদী হিন্দু। এই বাঙালি সমাজে যেটা অমর্ত্য সেন বারবার বলেন যে বৌদ্ধদের প্রভাব ৬০০ বছরের, মুসলমানদের প্রভাব ৪০০ বছরের, ব্রিটিশদের শাসন ২০০ বছরের। এসব প্রভাব মিলে বাঙালি নামের যে মণ্ডটি তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু একটা বহুত্ববাদী একটা মণ্ড। সেটাকে কিন্তু স্টিমরোলার চালিয়ে হিন্দু-মুসলমান করা যায় না। এর পাশাপাশি মুসলমান সমাজ কিন্তু আরো অনেক বেশি কনসলিটেড হয়ে মমতার দিকে চলে গেছে। বিজেপি যত আক্রমণকারী হয়েছে, ততই মুসলমান সমাজ ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে। যেখানে ওয়েসি এবং সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট কার্যকর হতে পারেনি। কারণ মমতা কিন্তু সুনিপুণভাবে প্রচার করেছে ওরা বিজেপির টিম, ওদের ভোট দেওয়া মানে বিজেপির বাক্সে ভোটটা পড়বে।

ভারতের স্বাধীনতার আগে একসময় মুসলিম লীগ পশ্চিমবঙ্গ তখনো হয়নি মানে বঙ্গদেশে সব থেকে বেশি ভোট পেয়েছিল। কিন্তু তারপর কখনো মুসলমানদের জন্য পার্টি হয়নি। এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে হলো। তারা কিন্তু কিছু করতে পারল না। বাঙালি মুসলমান, উর্দুভাষী মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিল যে এ রকম আলাদাভাবে যদি মুসলমান ভোট দেওয়া হয় এবং মুসলমান ভোট যদি ভেঙে যায় তাতে লাভ হবে বিজেপির। সুতরাং সেটাও কিন্তু হলো না। তার ফলে মেরুকরণের তত্ত্ব হিন্দু সমাজে সুসংহত হয়ে বিজেপির পাশে এসে দাঁঁড়াল না।

চতুর্থ কারণ : আমি বলব, প্রশান্ত কিশোরের ম্যানেজমেন্টকে নিশ্চয়ই কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। তার কারণ পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিরুদ্ধে যে একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, জেলায় জেলায় তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজের মতো অভিযোগ উঠেছিল, একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছিল এবং বিজেপি প্রচার করছিল। তার বদলে অনেক দিন আগে থাকতেই, বছরখানেক ধরে মমতার সঙ্গে কথা বলুন, বাংলার কন্যা, তারপর স্বাস্থ্যসাথি কার্ড, ছোট ছেলে-ময়েদের জন্য সব ব্যবস্থা, বিনা পয়সায়, অল্প পয়সায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। নানা রকমের পপুলিস্ট মেজারস যাকে বলা হয়, সেগুলো মমতা নিয়েছিলেন। সেখানে পি কের একটা বুদ্ধি কাজ করেছিল। সেটা একটা মস্ত বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

পঞ্চম কারণ : তৃণমূলকে ভাঙিয়ে আনার যে রণকৌশল সেটাও মমতার পক্ষেই গেছে। বাঙালি বোধ হয় সেটা ভালো চোখে দেখেনি। বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই তাদের মনে করা হয়েছিল। তৃণমূল ভেঙেও বিজেপি খুব একটা লাভ পেল না। বিজেপি যত বেশি করে বলেছে, আমরা ২০০ পার করব, মাইন্ডগেম খেলতে গিয়েছিল। সেগুলো সবই তাদের বিরুদ্ধে গেছে।

ষষ্ঠ কারণ : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাইক্রো-ম্যানেজমেন্টটাও অসাড় করেছেন। কোথায় রাজবংশীদের একজন স্বঘোষিত মহারাজা অনন্ত মহারাজ, একটা সময় তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূল মামলাপত্র রুজু করেছিল। তিনি পালিয়ে চলে যান আসামের জঙ্গলে। অমিত শাহ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। রাজবংশীদের ওপরে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমিসারি পাঠিয়ে তাঁকে টেনে নিয়ে চলে এলো তৃণমূল কংগ্রেসে। যে রকম গুরুংয়ের ব্যাপারটা। তার ব্যাপারটা ন্যায়-নীতির কথা যা-ই বলা হোক, যদি অমিত শাহের কথা বলি সাম, দাম, দণ্ড, ভেদে-র চাণক্য নীতি। তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেই বা কেন বলা হবে না? সুতরাং ঝাড়গ্রামে কোথায় মাওবাদীদের প্রভাব আছে, কোথায় নকশালদের প্রভাব আছে। যাকে যেভাবে ব্যবহার করা, সেটাই তিনি করেছেন এবং সেখানে তিনি সফল হয়েছেন। এমনকি যারা অতি বামপন্থীরা, যারা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ঘোষণা করেছিল। তাদের সম্পর্কে প্রশংসা করা। দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো নকশাল নেতার প্রশংসা করা। এগুলো সবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করেছেন।

সপ্তম কারণ : অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভাইপো বলে বলে ‘ভাইপো’ শব্দটাই অবাঙালিরা জেনে ফেললেন। ভাতিজা মানে হলো ভাইপো। সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে যখন সিআইবি বা এনফরসমেন্ট পাঠানো হলো, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিলেন। তিনি রক্ষণাত্মক ব্যাটে খেললেন না। তিনি অভিষেকের বাড়িতে চলে গেলেন। তার বাচ্চা কন্যাকে কোলে তুলে নিলেন। বিভিন্ন ইন্টারভিউতে বললেন, অভিষেককে ভয় পেতে বারণ করলেন। উল্টো অভিষেককে স্টার ক্যাম্পেনার করে দিলেন। বিজেপি তাঁকে নেতা বানিয়ে ফেলল। এই আক্রমণাত্মক রণকৌশল মমতার পক্ষে গেছে। সেখানে তিনি কোনো রেয়াত করেননি। বিজেপি যা যা করেছে প্রত্যেকটার মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছে। যে রকম বিজেপি মমতার মতুয়া ভোট থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে হাত দিতে গেছে। তেমনি মমতাও কিন্তু বিজেপির সেই সব খেলাগুলোতে উল্টো খেলা খেলেছেন।

অষ্টম কারণ : ‘খেলা হবে’ গান যিনি তৈরি করলেন, আমি জানি না তিনি এখন তৃণমূলে আছেন কি না? কিন্তু তাঁর গানটা শুনে মমতার যেটা মনে হয়েছিল খুব জনপ্রিয় হয়েছে। সেটা জনসমাজে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে মমতা ও পি কেরা গানটাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের হাতিয়ার করলেন। সেই ‘খেলা হবে’ গানটা বিভিন্ন প্রচারের জনসভায় গাওয়া হতে লাগল। এটা একটা কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক। সেটাকে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, বিভিন্ন ইভেন্টে সোপঅপেরায় ‘খেলা হবে’ ‘খেলা হবে’—এটাকে এত জনপ্রিয় করে তোলা হলো। আর বিজেপি যত এর বিরোধিতা করতে লাগল। নরেন্দ্র মোদি এসে বলল, ‘খেলা নয় খেলা হবে না বিকাশ হবে।’ তাতে কিন্তু পরিস্থিতির কোনো তফাত হলো না। ‘খেলা হবে’ কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। রবীন্দ্রনাথও ‘খেলা ভাঙার খেলা’ থেকে শুরু করে নানা শব্দ বলেছেন। বাঙালির বোধ হয় অবচেতন মনে খেলা শব্দটার প্রতি প্রেম আছে। নতুন প্রজন্মেরও ভালো লাগল। কেননা ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, ক্রিকেট সব খেলার সঙ্গেই বাঙালির কোথাও একটা সংযোগ আছে। সেই জন্য মমতা ‘খেলা হবে’ শব্দটাকে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।

নবম কারণ : জাতির ভোট অর্থাৎ শিডিউল কাস্ট ভোট, ওবিসি ভোট, এই জাতির ভিত্তিতে ভোট সিপিএম কখনোই করত না। শ্রেণির ভিত্তিতে করত। মতুয়া ভোট মমতার নিজের হাতে লালিত-পালিত। মতুয়া মাকে সব থেকে বেশি যত্ন করে হাসপাতালে নিয়ে আসা সব কিছু মমতা করেছিলেন। বিজেপি সেখানে খাবলা বসাতে চেয়েছিল। শান্তনু ঠাকুর বিজেপির লোকসভায় জিতেছিলেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতপাতের ভোটব্যাংককে সুসংহত রাখতে সক্ষম হলেন।

দশম কারণ : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা মুখ। অভিষেককেও একটা লক্ষ্মণ রেখার মধ্যে রাখা হয়েছিল। তিনি হয়তো দ্বিতীয় স্টার ক্যাম্পেইনার হয়েছিলেন। সব জায়গায় যেতেন। লোকজনও হতো। কিন্তু মমতাই হচ্ছেন প্রধান ক্যাম্পেইনার। আহত অবস্থায় হুইলচেয়ারেও কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা সেন্টিমেন্ট দিয়েছেন। সবটা মমতাকেন্দ্রিক করে তোলা। তাঁর বিরুদ্ধে সমবেতভাবে লড়াই হচ্ছে একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, যাকে এভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। তার ফলে মহিলা ভোটব্যাংককে মমতা আরো সুসংহত করতে পেরেছিলেন। মমতা নিজের মতো করে মহিলা ভোটব্যাংকটাকে গড়ে তুলেছিলেন। আমার মনে আছে, তিনি যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন পরিচারিকা যাঁরা দূর থেকে শিয়ালদহ রেলস্টেশন বা অন্যান্য জায়গায় আসতেন, তাঁদের ফ্রি মান্থলি পাসের ব্যবস্থা করা। এসব মমতা করেছিলেন। এই জন্য সেই ভোটব্যাংকটা কিন্তু এখনো মফস্বলে খুব শক্তিশালী আছে। সেটাও কিন্তু মমতার পক্ষে কাজ করেছে। সব মিলিয়ে বিজেপির প্লট বানচাল করে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ফিরে এলেন। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরোধী দল হিসেবে একটা দক্ষিণপন্থী শক্তি বিরোধী দলের ভূমিকায় এসে গেল। সুতরাং আগামী দিনে মমতাকে অনেক সচেতনভাবে এগোতে হবে। সেখানে লড়াইটা আরো জমবে। এই যে পরিস্থিতিটা উদ্ভূত হলো, সেখানে মমতা এখন কলেবরে নতুন সরকার গঠন করবেন, নতুন মুখ নিয়ে আসবেন। কিন্তু খেলা শেষ হলো না। এখনো নব নবরূপে খেলা হবে।

সবশেষে বলা যায়, কংগ্রেস এবং সিপিএমের ভোটব্যাংক সেটা যে ফেরত পাওয়ার একটা আশা ছিল, সেটাও যে হলো না। সেটা বিজেপির দিকে গেল, সেটা যেমন মমতার জন্য খারাপ হয়েছে। কিন্তু সিপিএমের যে মুসলমান ভোটটা ছিল, সেটাও কিন্তু সিদ্দিকীর সঙ্গে জোট বাঁধায় উল্টো হিতে বিপরীত হলো। সিপিএম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। মুসলিম ভোট যদি সিপিএম কিছুটা কাটত, নবীন প্রজন্মের বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা যারা দাঁঁড়িয়েছে, তারা যদি ভোট কাটত, তাহলেও মমতার বিপদ হতো। সুতরাং না কংগ্রেস না সিপিএম কারো সঙ্গেই বোঝাপড়ায় মমতা যাননি। সুযোগ ছিল, ভয় পেয়ে গিয়ে যদি কোয়ালিশনের কথা ভেবে কংগ্রেস বা সিপিএমের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পারতেন, তিনি কিন্তু সেটা করেননি। ঝুঁকি নিয়েছেন। যার জন্য কংগ্রেসের অসুবিধা হয়েছিল এবং অধীর চৌধুরী, আব্দুল মান্নানরা ভুল প্রমাণিত হলেন। সেখানে সোনিয়া গান্ধী-রাহুল গান্ধী উভয়সংকটে এখন পড়ে গেলেন। আগামী দিনে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন আরো ইন্টারেস্টিং হয়ে গেল। কেননা তৃণমূল যদি হেরে যেত বিজেপি যদি জিতত, তাহলে ২০২৪-এ নরেন্দ্র মোদির পথনির্দেশিকা আরো স্পষ্ট হতো। মমতা তথা বিরোধীদের ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে করোনার এই মিস-ম্যানেজমেন্টের মধ্যে নরেন্দ্র মোদি আরো হৈহৈ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজয়টাকে মূলধন করে এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সেটা যখন হলো না, তার উল্টোটা কী হবে? উল্টোটা হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদের ঐক্যের একটা কেন্দ্রে পরিণত হবেন। মমতার নেতৃত্বে আগামী দিনে বিরোধী ঐক্যের প্রতিষ্ঠা হবে। ইউপিএ আবার পুনরুজ্জীবিত হবে।

এখন করোনা মোকাবেলা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কাজ। দ্বিতীয় কাজ হলো নতুন সরকার গড়ে এখন খোলনলচে বদলানো। নন্দীগ্রামের বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করা। করোনার এই পর্ব অতিবাহিত হলে সব শেষে আমার মনে হয়, আপাতত যোগাযোগ থাকলেও ছয় মাস পর বিরোধী নেতৃত্বের কাজকর্ম শুরু হবে। উত্তর প্রদেশের নির্বাচন এসে যাবে। উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে অখিলেশ কী করেন সেটা দেখার বিষয়। তারপর উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির যদি বিপর্যয় হয়, তাহলে বিরোধীরা আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেবে। তবে বিজেপি উত্তর প্রদেশে কী রণকৌশল নেবে সেটাও এখন দেখার বিষয়।

সুতরাং এখন জাতীয় রাজনীতিতে সলতে পাকানোর সময়। এখনই চূড়ান্ত কিছু হচ্ছে না। তবে এখন আরম্ভের আগের আরম্ভ শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং খেলা শেষ নয়, খেলা শুরু।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র
বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা