kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

‘সব করোনা কি বাসের ভেতর’

লকডাউনে পরিবহন শ্রমিকদের কষ্ট

লায়েকুজ্জামান   

৩ মে, ২০২১ ০৩:০৬ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘সব করোনা কি বাসের ভেতর’

‘প্রতিদিন বাস থাপড়াই, ডিউটি করি। রাতে রোজগারের টাকা দিয়ে সদাই নিয়ে বাসায় ফিরি। বাসায় না ফেরা পর্যন্ত তিন সন্তান পথ চেয়ে থাকে। হাতে বাজারের ব্যাগ দেখলে ওরা খুশি হয়। রান্না শেষে একসঙ্গে খাই। আমাদের জীবনের আনন্দ বলতে এটুকুই। তবে ১৪ এপ্রিল থেকে বাস চলে না। টাকা পাই না। রাতের বেলা খালি হাতে যখন বাসায় যাই, সন্তানের কালো মুখ দেখে জীবনটাই অর্থহীন মনে হয়। অভুক্ত ছেলে-মেয়েদের কান্না দেখে আর সহ্য হয় না, মনে হয় এমন ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে করোনায় মৃত্যু ঢের ভালো।’ টানা কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের শ্রমিক বিল্লাল। পুরো নাম জানতে চাইলে বললেন, ‘ওইটুকুই লেখেন, গরিবের আবার ভালো নাম!’

বিল্লালের সঙ্গে কথা বলা শেষ না হতেই এগিয়ে এলেন আরেক শ্রমিক মানিক। তিনিও হেলপার। তাঁর চোখে বারুদ, কণ্ঠে ক্ষোভ। নিজেই এসে জানতে চান, ‘আপনি কি সাংবাদিক?’ জবাবে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়তেই শুরু করলেন ঝাঁজালো কথা, ‘আচ্ছা ভাইজান একটু বলেন তো, সব করোনা কি বাসের সিটে আর বাসের ভেতর? দেশের আর কোনোখানে কি করোনা নেই? ট্রাক চলছে, প্রাইভেট কার চলছে, মাইক্রোবাসে যাত্রী বহন করছে, সিএনজি অটোরিকশায় গাদাগাদি করে যাত্রী নিচ্ছে, এক রিকশায় তিনজন চেপে বাজারে যাচ্ছে। মার্কেটগুলোতে শুধু লোক আর লোক, পা ফেলার জায়গা নেই। সরকারের এটা কেমন বিচার বুঝলাম না। তিন দিন ধরে তিনটি ছেলে-মেয়ে নিয়ে মাত্র এক বেলা খাই। মালিকেরা আগের বছর ত্রাণ দিয়েছিলেন বেশি, এবার তাঁদেরও অবস্থা খারাপ। তবু কিছু দিয়েছেন, তা দিয়ে এক বেলা খাই। আমাদের ঈদের দরকার নাই, যাতে শুধু খেয়ে বাঁচতে পারি সে জন্য দয়া করে সরকারকে বাসটা চালু করতে বলেন।’

করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে গত ১৪ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন বন্ধ করে সরকার। ওই দিন থেকেই শ্রমিকদের আয় বন্ধ। দেশের ৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিক এখন বেকার। গতকাল রবিবার সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে কথা হয় একাধিক শ্রমিকের সঙ্গে। সবারই অভিন্ন কথা, অর্ধাহার-অনাহারে জীবন কাটানোর গল্প। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পরিবহন পেশায় কোনো নির্ধারিত বেতনের চাকরি নেই। পরিবহনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দিনের পারিশ্রমিক দিনে দেওয়া হয়। গাড়ির চাকা বন্ধ থাকলে এদের আয়-রোজগারও থাকে বন্ধ।

গাবতলী বাস টার্মিনালের পরিবহন শ্রমিক আসাদ বলেন, ‘দেশের ৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললেও অনাহারের করুণ কাহিনিই বেরিয়ে আসবে।’ মহাখালীর পরিবহন শ্রমিক আলাউদ্দিন বলেন, ‘এর মাঝে একবার খন্দকার এনায়েতউল্লাহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু চাল-ডাল দিয়েছেন। ওই খাবার দিয়েই দিনে এক বেলা খেয়ে জীবন চলছে।’ সায়েদাবাদের পরিবহন শ্রমিক সজল বলেন, ‘সেহরি খেয়েছি দুই মুঠো পানতা ভাত, কাঁচা মরিচ দিয়ে। ইফতার করি মসজিদে। টার্মিনালের বাস পাহারা দিই, ১০০ করে টাকা পাই, সে টাকা দিয়েই চারজনের সংসার চলে। দুঃখের কথা আর জানিয়ে লাভ কি ভাই! এটা অবিচার ভাই, এটা অবিচার।’

সায়েদাবাদের বাস শ্রমিক শাহিন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে একটু ক্ষেপে উঠলেন। বললেন, ‘হ্যারা তো আমাগো কথা ল্যাখে না, আমরা শুধু মানুষ মারি হেইডা ল্যাখে। নাইলে দ্যাশের সব খোলা, দোষ শুধু বাসের।’ মিনিট ১৫ বলার পর শাহিন থামেন, কাছে এসে বলেন, ‘ভাইজান, রাগ কইরেন না। মুনের দুঃখে বললাম। নিজের ক্ষুধার জ্বালা সহ্য হয়, কিন্তু অনাহারে সন্তানের কান্না সহ্য করা যায় না।’



সাতদিনের সেরা