kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

আজ মহান মে দিবস

শ্রমজীবীদের দুর্দশার সময়

বেড়েছে বেকারত্ব কমেছে আয়

এম সায়েম টিপু ও তামজিদ হাসান তুরাগ   

১ মে, ২০২১ ০২:৪০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শ্রমজীবীদের দুর্দশার সময়

সাধারণত প্রতিদিন ফজরের আজানের পর ঘুম ভাঙে নির্মাণ শ্রমিক রাহেলা বেগমের। বৃদ্ধ মায়ের কাছে সন্তানকে রেখে কাজের খোঁজে বের হওয়ার আগে খাবার তৈরি করতে হয়। কিন্তু সেদিন একটু দেরি করেই ঘুম ভেঙেছে তাঁর। তাও বাচ্চার কান্নাকাটিতে। কারণ আগের রাতে বাচ্চাকে সামান্য ভাতের সঙ্গে একটা আলু কচলে খাওয়াতে পেরেছেন, মা ও নিজের আহারই জোটেনি। সম্প্রতি যখন রাহেলার সঙ্গে কথা হয়, তখন তিনি বেকার। জানান, প্রায় এক মাস তাঁর কাজ নেই।

দেশের বেশির ভাগ রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মী শেফালী বেগম বলেন, ছয় মাস ধরে তাঁর কাজ নেই। আগে মিরপুরের একটি কারখানায় কাজ করতেন। ছোট বোন শিউলির চাকরিটা আছে। তাঁর আয়েই চলছে দুই বোন ও মায়ের সংসার।

শিউলি বলেন, করোনায় পোশাক খাতে রপ্তানি আদেশ কম হওয়ায় অল্প শ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করাচ্ছেন কারখানার মালিকরা। ফলে কাজ বেশি করলেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা পান না তিনি।

শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করেন—এমন ব্যক্তিরা মনে করেন, করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব তো আছেই, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও পোশাক কিংবা নির্মাণ শ্রমিকই শুধু নয়, বঞ্চিত হচ্ছে গৃহকর্মী, পরিবহন শ্রমিকসহ সব খাতের শ্রমিকরা। ফলে প্রথম দফায় করোনার করুণ অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণের বিস্তারের কারণে জনজীবন এখন রীতিমতো নাস্তানাবুদ।

খেটে খাওয়া মানুষের এমন চরম দুর্দিনে আরেকবার এসেছে মহান মে দিবস। দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদন এবং শ্রমের ন্যায্য মজুরির দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ধর্মঘটের ডাক দেন শ্রমিকরা। শ্রমিকদের আন্দোলন আরো বেগবান হয় ৩ ও ৪ মে। এক পর্যায়ে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হন। আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা সাত শ্রমিকনেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৮৯০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিস কংগ্রেসে বিশ্বব্যাপী মে মাসের ১ তারিখ ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও শ্রমিকরা দিবসটি পালন করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে ‘লকডাউনের’ কারণে গত বছরের মতো এবারও মে দিবসের সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। তবে দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক বাণীতে তাঁরা দেশের শ্রমজীবী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও এ উপলক্ষে শ্রমজীবী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করেছে। কিন্তু গত ৫০ বছরেও মহান মে দিবসের আলোকে দেশের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন শ্রমিকের আদর্শ অধিকার তিনটি। এগুলো হলো কাজের বিনিময়ে উপযুক্ত মজুরি, নিরাপদ কর্মস্থল এবং শ্রমিকের তার ইচ্ছামতো সংগঠিত হওয়া ও দর-কষাকষির ক্ষমতা। সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ৮৭ (শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া) এবং ৯৮ (দর-কষাকষি) চুক্তিতে সই করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। শ্রম আইন সংশোধন করা হলেও এতে মালিকদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে কৌশলে।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে, যা একটানা ৬৬ দিন ছিল। এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া সব কিছুই বন্ধ রাখা হয়। অবশ্য সাধারণ ছুটির এক পর্যায়ে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হলেও বেতন কাটছাঁট করা হয়। চলতি বছরের মার্চে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আবার লকডাউন ঘোষণা করে সরকার, যা এখনো চলছে।

এই লকডাউনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক দুই খাতের শ্রমিকরা দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। এ খাতের শ্রমিকরা সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর মধ্যেও নেই। তাদের কোনো শ্রম অধিকার রাষ্ট্রের শ্রম আইনে স্বীকৃত নয়। করোনাকালে সরকারের দেওয়া নগদ অর্থ খাদ্য সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে এই শ্রমজীবীরা।

চলতি বছর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সর্বশেষ এক জরিপে বলা হয়, করোনার গত এক বছরে দেশের দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার ফলে এ হার আবারও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও শুনিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

সম্প্রতি প্রকাশিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার সংকটকালে দেশের শ্রমিকদের মাত্র ৮ শতাংশ সরকারের দেওয়া খাদ্য ও অর্থ সহায়তা পেয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য মিহবাহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছোট পুঁজির অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। হুটহাট চাকরি যাচ্ছে শ্রমিকদের। এ রকম বেকারত্বের ঘটনা শ্রমজীবী মানুষের জীবনে আগে কখনো হয়নি।’ তিনি বলেন, সরকারের খাদ্য ও অর্থ সহায়তা পায়নি এসব শ্রমিক। রাজনৈতিক বিবেচনায়ই বণ্টন হয়েছে সব সুবিধা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অসংগঠিত শ্রমিকদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছনোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।

আইএলওর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় এবার বৈশ্বিকভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। নির্মাণ খাত, পর্যটন, অতিক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোগে নিয়োজিত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, কঠিন দুর্যোগকাল থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করতে উদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। উদ্যোক্তারা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারেন সে ব্যবস্থা করা এবং সরাসারি শ্রমিকদের হাতে সহায়তা পৌঁছনো। তবে এখানে বড় ধরনের দুর্বলতা আছে সরকারের। পোশাক খাতে উদ্যোক্তাদের কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও অন্যান্য খাতে তেমন কিছু দেওয়া হয়নি।

পোশাক খাতের শ্রমিকদের আয় কমেছে ৩৫ শতাংশ

করোনার কারণে এক পোশাক খাতেই ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। লকডাউনের মাসগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের আয় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তাঁদের কেউ কাজ হারিয়েছেন, কারো কাজের কর্মঘণ্টা কমেছে। কারো মজুরি কমেছে। মজুরি অনিয়মিত হয়েছে অনেকের। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু কারখানা উত্পাদন কার্যক্রম কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বিজনেস পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

নির্মাণ শ্রমিকদের বেকারত্ব বেড়েছে, আয়ও কমেছে

রাজমিস্ত্রি, রড মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, টাইলস, গ্রিল মিস্ত্রি—এ ধরনের ১১টি পেশায় জড়িতদের নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ধরা হয়। বিলসের ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যদিও ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) হিসাবে এই সংখ্যা ৩৫ লাখ। তাদের মধ্যে শুধু রাজ ও রড মিস্ত্রি আছে প্রায় ১৮ লাখ। বিলসের জরিপ প্রায় চার বছর আগের হলেও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্মাণ শ্রমিকদের সংখ্যা খুব বেশি বাড়েনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গত ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর বিধি-নিষেধ ঘোষণা করার আগে-পরে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে বেশির ভাগ শ্রমিক।

রাজমিস্ত্রির সহকারী নুরুজ্জামান মিয়া গাইবান্ধার গ্রামের বাড়ি থেকে সম্প্রতি ঢাকায় ফিরেছেন কাজের জন্য। এখন কাজ করছেন বাড্ডা এলাকায়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকাত কামকাজ নাই। গেল সময় বাড়ি থাকি আসি কামত ধরছি। তা কাম আগের মতো নাই।’ আরেক মিস্ত্রি হাবিবুল বলেন, ‘গরিবের লকডাউন মানে মরণ। কই, এক টেকাও তো পাইলাম না। আমরা সরকারের কাছে সাহায্য চাই।’

ইনসাবের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রায় ৭০ ভাগ শ্রমিক দিনের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি সহায়তা কর্মসূচির বাইরে থাকায় তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে গত বছর। এখন তুলনামূলকভাবে সে অবস্থার উন্নতি হলেও কাজ কমেছে।’

অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে করোনায় দেশে নতুন দরিদ্র বেড়েছে। তবে তাদের মধ্যে কত শতাংশ নির্মাণ শ্রমিক তা বলা কঠিন। তবে আমি মনে করি, আসন্ন বাজেটে এই খাতগুলো ধরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা উচিত। এবং তা যেন সুষ্ঠুভাবে পৌঁছয় সেদিকে নজর রাখা উচিত।’ বিলসের সাবেক সিনিয়র প্রগ্রামার কনসালট্যান্ট খন্দকার আবদুস সালাম বলেন, ‘করোনা নির্মাণ শ্রমিকের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিককে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই বাজেটে সরকারের উচিত তালিকা করে সামাজিক সুরক্ষা খাত থেকে তাদের সহায়তা করা।’

জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, করোনার কারণে বেশির ভাগ নির্মাণ শ্রমিক বেকার। যার কাজ করছে তাদেরও আয় কমেছে ৪০-৪৫ শতাংশ।

গৃহ শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ কাজ হারিয়েছে

গৃহ শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ কাজ হারিয়েছে করোনায়। শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়েছে তারা। গৃহ শ্রমিক হিসেবে সরকারের কোনো ধরনের সেবার আওতায় নেই এসব শ্রমিক। দেশে গৃহ শ্রমিকের মোট সংখ্যা ২৫ লাখ। তাদের ৯৯ শতাংশই নারী। গৃহ শ্রমিকদের ৬০ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজ করে। এই শ্রমিকদের অধিকারভিত্তিক সংগঠন ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস নেটওয়ার্ক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।



সাতদিনের সেরা