kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

কেরানীগঞ্জে বৃহস্পতিবার এলেই বাড়ে চুরি ও প্রতারণার ভয়!

মোবারক আজাদ    

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কেরানীগঞ্জে বৃহস্পতিবার এলেই বাড়ে চুরি ও প্রতারণার ভয়!

শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় অনেকে একটু দেরীতে ঘুম থেকে ওঠেন। কারণ পরদিন অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, টিউশনি চাপ থাকে না। কিছু ব্যবসায়ীদেরও দুপুরে আগ পর্যন্ত তেমন চাপ নেই। ফলে আগের রাতে মেসে থাকা শিক্ষার্থী ও ব্যাচলর চাকরিজীবীসহ অন্যদেরও সারা রাত সজাগ থেকে ভোর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস আছে। আর এ সুযোগে চোর ও প্রতারক চক্রের সদস্যরা বেপোরোয়া হয়ে ওঠেছে।

সম্প্রতি ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানা এলাকাধীন বেশ কয়েকটি চুরি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এসবের বেশিরভাগ ঘটনা শুক্রবার ভোর থেকে সকালের মধ্যে। ফলে এখন বৃহস্পতিবার এলেই ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীসহ এলাকার অন্যান্যরা চুরি ও প্রতারণার ভয়ে আতঙ্কে থাকেন। কিছু কিছু বাসা-বাড়িতে এসব ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। এসব চুরির ঘটনার বেশিরভাগই থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয় না। অনেকে পেরেশনি মনে করে পুলিশের গাফিলতিতে আর থানার দারস্থ হন না বলে জানান। তবে এলাকার মালিক সমিতির কাছে অভিযোগ আসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন বলে জানান একাধিক ভুক্তভোগী।

গত ১৫ জানুয়ারি শুক্রবার। এদিন সকালে সাধারণত লোকজনের আনাগোনা কম থাকে ফলে কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের এ ব্লকের আরিফা কনফেকশনারি মালিক হাবিবুর রহমান (৩৫) তার বাবা রফিকুল ইসলামকে দোকানে পাঠান জিনিসপত্র বিক্রি করতে। আগে থেকে টার্গেট করা চোর চক্রের চার সদস্য প্রায় একই সময়ে সকালে দোকানে আসেন। এসে এটা দেন ,ওঠা দেন, এটার দাম কত? এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধাকে ব্যস্ত করে ফেলেন। একপর্যায়ে ক্যাশের কাছে ছোট বালতিতে রাখা এক লাখ ৪৭ হাজার টাকার বান্ডেল বালতিসহ নিয়ে বের হয়ে পড়েন মুখে মাস্ক পড়া এক যুবক। অন্য তিনজনও নামে নামে মাত্র কিছু জিনিস কিনে তড়িগড়ি করে বের হয়ে পড়েন। পরে রফিকুল ইসলাম টের পান টাকার বান্ডেল রাখা বালতি নেই। পরবর্তীতে দোকানের সামনের রাস্তার সিসি টিভির ফুটেজ দেখে চুরি করে নিয়ে যাওয়া বালতি ও যুবক দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত এ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, চোরকেও শনাক্ত করা যায়নি। বারবার কেরানীগঞ্জ থানায় গিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। এর প্রায় একমাস পরই একইভাবে ৫০ হাজার টাকার নিয়ে যায় চোর চক্রের দল। 

দোকানের স্বত্ত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, শুক্রবার সকালে ভিড় কম থাকায় এতোদিন বাবাকে পাঠাতাম। সে সুযোগে চোররা একমাসের মধ্যেই আমরার দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব ঘটনায় সিসি টিভির ফুটেজে থাকলে পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি।

এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে ভোর রাতে মা মঞ্জিল নামের আটতলা বাসার একটি শিক্ষার্থীদের মেসে সুযোগ বুঝে চোর ঢুকে পড়ে। এদিন সারা রাত মেসে থাকা পাঁচ শিক্ষার্থী ও দুই চাকরিজীবি রাতের খাবার শেষে আড্ডা ও তাস খেলে ভোর রাতে ঘুমান। সে সুযোগে দুইটি আইফেনসহ ৯টি নামী-দামী ব্যান্ডের মোবাইল ও মানি ব্যাগ নিয়ে সটকে পড়ে চোর। এ ঘটনার পেছনে প্রাথমিক তদন্তে বাড়ির মালিক সমিতির কমিটির নেতারা জানান, ওই বাড়ির গেটে কোনো দারোয়ান নেই। সে সুযোগে রাতের কোনো এক সময় চোর ঢুকে বাসার কোনো স্থানে ঘাপটি মেরে ছিল বলে অনুমান করেন। পরে ওই বাড়ির মালিক ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন কেরানীগঞ্জ বাড়ি মালিক সমিতি। এর ছয় মাস আগে অন্য একটি ফ্লোরে এক ব্যাংকারের বাসায় নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা ঘটে।

মেসের ঘটনায় ভুক্তভোগী কামরুল হাসান কিরণ বলেন, ঘটনার দিন আমরার সারা রাত বন্ধু-বান্ধবরা জেগে ছিলাম। ভোরে ঘুমাতে যায়। দুই রুমের এলোমেলো অবস্থায় থাকা ৯টি মোবাইল ফোন ও সামনে পাওয়া তিনটি মানিব্যাগ নিয়ে যায়। পরে অবশ্যই বাড়ির মালিকের গাফিলতিতে চোর বাড়িতে ঢুকেছে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এতে কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন বাড়ির মালিক। সম্প্রতি প্রায় চুরির ঘটনাগুলো ছুটির দিন সকালেই ঘটে। ফলে বৃহস্পতিবার আসলে এখন চুরির ভয় কাজ করে। এমনও আছে একই দিনে চারটি বাড়ি এবং এলাকার দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চোর চক্রের সদস্যরা আগে থেকে টার্গেট করে কোনো বিল্ডিংয়ে চুরি করবেন। সে লক্ষে ওই বাসার বিভিন্ন তলার কাজের মহিলার গতিবিধি, কেয়ার টেকার এবং বাড়ির ছাঁদের পজিশন তা নিয়ে পরিকল্পনা করেই তাদের কাজ শুরু করেন। সুযোগ বুঝে বাসায় ঢুকে মোবাইল, মানিব্যাগসহ সহজে বহনযোগ্য জিনিস এক নিমিষে লুটে নেয়। 

কিছু চুরির ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু বাড়ির মালিকের গাফিলতির কারণে একবাড়ির ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদে অনায়সে আসা যাওয়া করা যায়। অনেক ছাদে গেটে তালা লাগানো থাকে না। অনেক বাসায় দারোয়ান বা সিকিউরিটি নেই। এছাড়া অনেক রাস্তায় রাতে লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সিসি টিভির থাকলেও অপরাধীদের ধরতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। এসব ব্যাপরে গত সপ্তাহ থেকে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ মসজিদে এবং মহল্লায় সভা করেছেন। যাতে সিসি টিভি স্থাপন, রাতের বেলায় লাইট জ্বালিয়ে রাখা এবং দারোয়ান রাখা হয়। এছাড়া মহল্লা কমিটিকে আরো আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান। 

জানতে চাইলে এলাকার বাসিন্দা ও মডেল ফার্মেসির রাজিব বলেন, প্রায়ই এ এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটে। তবে শুক্রবার ভোর রাত থেকে সকালে বেশি। পাশাপাশি বিল্ডিংয়ে সহজে যাওয়া-আসা করতে পারার সুযোগে এটি হয়। মাদকাসেবীরা এ চুরির ঘটনায় গুলো বেশি ঘটিয়ে থাকে। মাস খানেক আগে এক চোরকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়। 

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউন বাড়ি মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে থানায় জানাই। পুলিশ তাদের মতো করে চেষ্টা করছে। আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি। তবে কিছু চুরির ঘটনায় চোরকে সিসি টিভির ফুটেজে দেখা গেলেও শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাই প্রতিটি বাসা-বাড়িতে কিছু কিছু নির্দেশা দেওয়া হয়েছে। যাতে এগুলো মেনে চলে। তাহলে চুরির ঘটনা কমে আসছে। বড় চুরির ঘটনায় তাদের কাছে অভিযোগ আসে, ছোটো-খাটো ঘটনায় অভিযোগ তেমন আসেন না বলে জানান তিনি।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি গাজী মাইনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ইদানিং পাঁচটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। সবগুলোর ঘটনায় চোরকে মামলা হয়েছে এবং চোরকে শনাক্ত করে ধরা হয়েছে। মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে। দু-একটি ঘটনার বিষয়ে থানা থেকে কোনো প্রতিকার না পাওয়ার বিষয়ে ওসি বলেন, সরাসরি আমার কাছে আসলে সর্বোচ্চ তত্পরতা চালাই প্রতিটি ঘটনায়। কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অধীনস্থ সবাইকে নিরাপদ থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তাদের বুঝাচ্ছি।



সাতদিনের সেরা