kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

লকডাউনেও লাগামছাড়া কিশোর গ্যাং

জহিরুল ইসলাম   

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লকডাউনেও লাগামছাড়া কিশোর গ্যাং

প্রতীকী ছবি

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার অংশ হিসেবে দেশে চলছে লকডাউন। আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা মানুষের মনে শঙ্কা ধরিয়েছে। এ পরিস্থিতিতেও থেমে নেই বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের উত্পাত। রাজধানীর ফাঁকা রাস্তায় ইট-পাথর দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, জোটবদ্ধভাবে মাদক সেবন, দিনদুপুরে পথচারীদের হেনস্তা, পাড়া-মহল্লায় আড্ডার ছলে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানাভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা।

ডিএমপি সূত্র বলছে, এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিয়মিত এলাকাকেন্দ্রিক উত্পাত চালালেও নজরে আসে বড় ঘটনা ঘটলে। এর আগে তাদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। বড়জোর থানায় অভিভাবকসহ ডেকে হুঁশিয়ার করা যায়। অভিভাবকদের জিম্মায় ছাড়ার পর একই কাজ করে তারা।

গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে পুলিশের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা চোখে পড়ে। তবে পুলিশের টহল গাড়ি যেহেতু সব সময় একই জায়গায় থাকে না, সেহেতু কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ঠিক এ সুযোগটাই নিচ্ছে।

গত ১৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টার দিকে রামপুরা ব্রিজের পাশে পুলিশের টহল গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। এর শখানেক গজ সামনে সড়কের পাশে সাত-আটজন যুবককে আড্ডা দিতে দেখা যায়। এত রাতে এখানে কী করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে দুজন এই প্রতিবেদকের দিকে তেড়ে আসেন। পুলিশ আসছে জানালে তাঁদের একজন বলেন, ‘আসুক! আসলে চইলা যামু, হেরপর আবার আমু। মজা-মাস্তি তো করতেই পারতাছি না; একটু বইসা আড্ডা দিমু, এইটাতে কী সমস্যা?’

পরে গত ২১ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে লালবাগ শহীদনগর ৬ নম্বর গলিতে গিয়ে কয়েক ভাগে কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, এদের জন্য বাচ্চারা (মেয়ে) বাসা থেকে বের হতে পারে না। লকডাউনের মধ্যেও তারা গলিতে আড্ডা দেয়। আগে তো দিন-রাতের কোনো ঠিক ছিল না। তার পরও এখন পুলিশের টহলে কিছুটা কমছে, তবে বন্ধ হয়নি।

সম্প্রতি ডাকাতির প্রস্তুতির সময় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার মনির গ্রুপের পাঁচ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব-২। এই কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানের বয়স ১৫ বছর। তার দুই সঙ্গীর বয়স ১৩ ও ১৪ বছর। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি চাকু ও সুইচ গিয়ার জব্দ করা হয়। পরে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে তাদের কোর্টে চালান করা হয়। সূত্র জানায়, তারা এখন কারাগারে। তবে মনির গ্রুপের বাকি সদস্যদের যন্ত্রণায় এখনো এলাকাবাসী অতিষ্ঠ।

অভিযোগ আছে, ছোট-বড় চুরি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, মুরব্বিদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করা, সাধারণ মানুষকে দেশি অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া ছিল তাদের কাজ। কারাগারের বাইরে থাকা মনির গ্রুপের অন্য সদস্যরা এলাকায় বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এ নিয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার বিপ্লব কিশোর শীল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে কিশোর গ্যাংয়ের মনির হোসেনসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে মামলা দিয়ে তাদের কোর্টেও পাঠানো হয়েছে। তাদের কোনো সদস্য এলাকায় সমস্যা করছে কি না, খোঁজ নেব।’ সাধারণ মানুষকে যতটা পারা যায় স্বস্তিতে রাখতে পুলিশ চেষ্টা করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বউবাজার, রানার গ্রুপ ও বেগুনবাড়ী, তেজকুনিপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় গ্রুপের সদস্যদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনেও তাদের মাদকের আসর জমে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের উত্পাত এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) ইফতেখারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ কাজ করছে। আমাদের জায়গা থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখানে এসব গ্রুপ রয়েছে, সেখানে বিট পুলিশের অফিসাররা তথ্য সংগ্রহ করছেন। এরপর অভিভাবকদের জানানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে যদি কোনো পরিবর্তন না আসে এবং আমলে নেওয়ার মতো কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আসলে আমলযোগ্য কোনো অপরাধ না করলে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’

তিনি আরো বলেন, তালিকা নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কিশোরদের ও তাদের অভিভাবকদের বোঝানো হচ্ছে। যদি কাজ না হয় তখন লোকাল প্রতিনিধিদের নিয়ে বিট পুলিশের অফিসাররা সভা করেন। এর পরও যদি বড় কোনো ঘটনা ঘটে তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



সাতদিনের সেরা