kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

বিএনপি থেকে বহিষ্কার ও পদত্যাগ

কার লাভ কার ক্ষতি

এনাম আবেদীন   

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কার লাভ কার ক্ষতি

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই অতীতে দল ছেড়ে গেছেন। আবার কোনো ঘটনার সূত্র ধরে অনেককে বহিষ্কারও করা হয়েছে। কিন্তু এতে কার লাভ হয়েছে—বিএনপির, নাকি ওই নেতাদের? বিস্ফোরক মন্তব্য করে আলোচনায় আসা মির্জা আব্বাসকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিককালে এমন প্রশ্ন আবার নতুন করে সামনে এসেছে। কারণ আব্বাসের বক্তব্যের জন্য ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। দলের সঙ্গে তাঁর কিছুটা সংঘাত তৈরি হয়েছে। যদিও তিনি জবাব দিয়েছেন এবং তাঁকে বহিষ্কারের আশঙ্কাও কম বলেই মনে করা হচ্ছে। এ সত্ত্বেও আব্বাসের সমর্থকরা চেষ্টা করছেন, ঘটনা যাতে আরো সংঘাতের দিকে না যায় এবং তিনি যাতে নমনীয় থাকেন। কেউ কেউ উদাহরণ দিয়ে এমনটাও বলছেন যে ঘটনা যাতে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বা অন্য অনেকের মতো না হয়।

বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা হলো—বি. চৌধুরী চলে যাওয়ায় তাঁর নিজেরও লাভ হয়নি, বিএনপিরও লাভ হয়নি। বরং আজকে নেতৃত্বের যে অবস্থা, তাতে তিনি থাকলে বিএনপিরই লাভ হতো। একইভাবে মির্জা আব্বাস দল ছেড়ে চলে গেলে না লাভ হবে তাঁর নিজের, না বিএনপির। কারণ আর্থিকভাবে ধনী হলেও বিএনপির পতাকাতলে না থাকলে সমাজে আব্বাসের প্রভাব যেমন কমে যাবে, তেমনি বিএনপিও একজন ত্যাগী ও বড় নেতাকে হারাবে বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘বিএনপি ছেড়ে আমার কোনো লোকসান নয়, বরং লাভ হয়েছে। কারণ আমার নীতি ঠিক আছে। মানুষ এখনো আমাকে ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে।’ বিকল্পধারার এই সভাপতি বলেন, ‘আমার দল বড় কি ছোট সেটি বড় কথা নয়। নীতি হচ্ছে বড় এবং আমি জিয়াউর রহমানের নীতি থেকে দূরে সরে যাইনি। বরং বিএনপি জিয়ার নীতিতে আছে কি না সেটি নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য মনে করেন, ‘বিএনপি হচ্ছে বিশাল এক বহতা নদী। জিয়াউর রহমানের পরিবার এবং দেশের জনগণই হচ্ছে এর শক্তি। ফলে এই দলে অন্য কেউ অনিবার্য নয়।’ তিনি বলেন, বিএনপি নেতানির্ভর দল নয়। তা ছাড়া বিএনপি সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে না। আবার ধর্মীয় মূল্যবোধকে মূল্য দেয়। ফলে ব্যাপক জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করেই এই দল টিকে আছে এবং থাকবে।’

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বি চৌধুরী, অলি আহমদ ও মান্নান ভূঁইয়ারা বিএনপিতে না থাকায় তাঁদের নিজেদেরও ক্ষতি হয়েছে, বিএনপিরও ক্ষতি হয়েছে। কারণ তাঁরা তিনজনই বিএনপিতে ভাঙন ধরিয়েছেন কিংবা বিএনপিকে দুর্বল করেছেন।’

‘জাতীয়তাবাদী শক্তির লোক হওয়ার কারণে এই নেতাদের অন্য দল বিশ্বাস করেনি। ফলে ওই নেতারাও ভালো কিছু না করতে পারলেও বিএনপির অহংকার কিছুটা চূর্ণ করতে পেরেছেন। কারণ বিএনপিকে তাঁরা কিছুটা হলেও বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পেরেছেন’—বলেন বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি।

বিএনপির একাংশের চাপের মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন অধ্যাপক বি চৌধুরী। দলের প্রতিষ্ঠাতা এই মহাসচিবকে চারদলীয় জোট সরকারের ওই সময়ে অপমান-অপদস্থ করা হয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে না পারা, রাষ্ট্রপতির বাণীতে জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ না করাসহ আরো দু-একটি ঘটনায় রাষ্ট্রপতি পদে থাকার ওই সময়ে বি চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়। ওই দূরত্ব আজ পর্যন্ত দূর হয়নি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতা ওই দূরত্ব কমিয়ে তাঁকে বিএনপির কাছাকাছি আনার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। বি চৌধুরীর দল বিকল্পধারা সংসদে তিনটি আসন নিয়ে এখন সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও মাহী বি চৌধুরীকে দুদক নোটিশ দেওয়ায় ভেতরে ভেতরে সরকারের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়।

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ বেশির ভাগ নেতা মারা যাওয়ায় বিএনপিও এখন এক ধরনের নেতৃত্বের সংকটে পড়েছে। তাই বি চৌধুরী ছাড়াও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ দলত্যাগী এবং দলের বহিষ্কৃত নেতাদের কথা বিএনপি নতুন করে স্মরণ করছে। বলা হচ্ছে, ওই নেতারা চলে যাওয়ায় উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা ছাড়ার এক দিন আগে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর ২৪ জন মন্ত্রী-এমপিকে নিয়ে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন অলি আহমদ। সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী, জাহানারা বেগম, আনোয়ারুল কবীর তালুকদার, রেদোয়ান আহমেদসহ অনেকে ওই সময় অলির সঙ্গে ছিলেন। অলির সঙ্গে বিএনপির দূরত্বের মূল কারণ ছিল স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে মন্ত্রী করা হয়নি। অন্যদের কাউকে কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা হলেও পরে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। সে কারণে একযোগে তাঁরা পদত্যাগ করেন। বস্তুত ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে বিদ্রোহের ওই ঘটনায় বিএনপি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

বিএনপি এরপর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়ে মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ২০০৭ সালের ২৫ জুন সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে। কারণ ১০৪ জন এমপি তখন মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে ছিলেন। ১৫ দফা ওই সংস্কার প্রস্তাব কার্যত তখন খালেদা জিয়াকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার কৌশল ছিল। ওই ঘটনার সূত্র ধরে বিএনপির পঞ্চম মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। বেশির ভাগ বিশ্লেষকই মনে করেন, ওই দুই ঘটনায় গত দেড় দশকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিএনপিতে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বীজ রোপিত হয়, যার রেশ এখনো চলছে। মান্নান ভূঁইয়া এবং এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেনের অবস্থা পরবর্তীকালে খুবই বিপর্যয়কর হয়। ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগে জীবনের শেষ দিকে দলের কোনো নেতাকর্মী তাঁর বাসায় যেতেন না। মৃত্যুর পরে তাঁর মরদেহ বিএনপি অফিসে নেওয়ার অনুমতিও দেননি খালেদা জিয়া।

অন্যদিকে অলি আহমদ পরে বি চৌধুরীর সঙ্গে মিলে এলডিপি গঠন করলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিরোধের পর পৃথক হয়ে বিকল্পধারা গঠন করেন বি চৌধুরী। ২০০৯ সালের নির্বাচনে অলি আহমদ এমপি নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাঁর হিসাব-নিকাশ না মেলায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি আবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে যোগদান করেন। জানা যায়, উভয় পক্ষের চেষ্টা ও তৎপরতা সত্ত্বেও ‘বিশ্বাসের’ হিসাব না মেলায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিতে ফেরা হয়নি অলি আহমদের। পৃথক দল এবং পরে জাতীয় মুক্তমঞ্চ গঠন করলেও দেশের রাজনীতিতে এর খুব বেশি গুরুত্ব আছে বলে কেউ মনে করে না। তবে অলি আহমদ থাকলে ভালো হতো—এমন আলোচনা বিএনপিতে এখনো আছে।

অবশ্য এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ মনে করেন, বিএনপি ছেড়ে আসায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হননি। সোমবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বিএনপির ক্ষতি হয়েছে কি না সেটা আমি বলতে পারব না।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপিতে থাকলেও আমার কোনো লাভ হতো না। বরং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এখনই ভালো আছি।’

এই নেতাদের বাইরে ‘গোপন আঁতাতের’ খবর পেয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল দলের মহাসচিব কে এম ওবায়েদুর রহমানকে। পরে বিএনপিতে ফিরে এলেও তাঁর গুরুত্ব আগের তুলনায় কিছুটা কমে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রথমে বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে এবং পরে আবার বিএনপিতে ফিরে দলটির স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মওদুদ আহমদকে নিয়ে দলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের আলোচনা ছিল।



সাতদিনের সেরা