kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ বৈশাখ ১৪২৮। ৭ মে ২০২১। ২৪ রমজান ১৪৪২

কালের কণ্ঠ ও দারাজের ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে সালমান এফ রহমান

‘ই-কমার্সের প্রসারে ন্যাশনাল টাস্কফোর্স গঠন করা হবে’

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ২১:৩৫ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



‘ই-কমার্সের প্রসারে ন্যাশনাল টাস্কফোর্স গঠন করা হবে’

ই-কমার্স খাতের প্রসারে সহায়তা দিতে একটি ন্যাশনাল টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ও দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। তিনি বলেছেন, এই খাতে কর ও লজিস্টিক নিয়ে যেসব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানে ন্যাশনাল টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।

আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় কালের কণ্ঠ ও দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজের যৌথ আয়োজনে ‘ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের বিকাশ : ই-কমার্সের ভূমিকা’ শীর্ষক ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান এসব কথা বলেন। ভার্চুয়াল বৈঠকে কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলনসহ এই খাতের সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন কালের কণ্ঠের বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমী। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘সমাজের সব ক্ষেত্রেই এখন ডিজিটাইলেজেশনের সুযোগ আছে। সামনে ই-কমার্স খাতের মাধ্যমে ব্যবসা ও সব রকম উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশকে একটি ডিজিটালসমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যা এখন অনেক উন্নতি লাভ করেছে। এরই মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রতিফলিত হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যে নাগরিক সেবা দেওয়া হয়, তা অনলাইনের মাধ্যমে করে দেওয়ার জন্য আরো কাজ করা জরুরি। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ও দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ করছি যে ই-কমার্স ধীরে ধীরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে ই-কমার্স আরো বড় ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশেও কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে এটি বেশ বড় পর্যায়ে যাচ্ছে। যেভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই এই খাতটি আরো অনেক বড় জায়গায় নিয়ে যেতে পারব। কিন্তু তার পেছনে যে কাজগুলো আমাদের করা দরকার সেটি হচ্ছে, বিদেশি সহযোগিতা। বেশি করে বিদেশি ইনভেস্টরদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। তাদের বড় একটি ভূমিকা আমাদের প্রয়োজন।’ 

তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি ই-কর্মাসের ভূমিকা শুধু নগরজীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটাকে গ্রাম বা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটি অত্যন্ত জরুরি।’

বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদির বলেন, ‘ই-কমার্স যদি সামনের দিকে এগিয়ে যায়, সে জন্য আমরা একত্রিত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। ই-কমার্সের সঙ্গে বিভিন্ন রকমের ছোট ও মাঝারি ব্যবসা সম্পৃক্ত হয়েছে। যখন কোনো মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করে তখন তাঁরা সেখানে সফল্য পায়। বিকাশ এই ক্ষেত্রে ভালো কাজ করছে। এই ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ফলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। দেশের মোবাইল কম্পানিগুলো প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক উন্নতি করেছে। তাঁর সুফলও তাঁরা এখন পাচ্ছে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকে নিয়ে আসার জন্য যদি কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে না পড়তে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হয়েছে।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘ডিজিটাল কমার্সের জয়যাত্রা পরিলক্ষিত হয়েছে। লকডাউনের সময় এই যাত্রা বেশি জোরদার হয়েছে। ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে যারা কেনাকাটা করে তাঁর মধ্যে ৭৫ শতাংশই ১৮-৩৪ বছরের মধ্যে। লকডাউনে ক্যাশ টাকা খরচের বদলে ডিজিটাল মাধ্যমে কেনাকাটা ও লেনদেন করেছে। আগে অনলাইনে কেনাকাটা প্রায় ১৫ শতাংশের মতো ছিল। সেটি করোনার মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশের মতো। তবে এটি ধরে রাখা প্রয়োজন। ডিজিটাল লেনদেনে কেনাকাটার জন্য সরকারে থেকে ৫ শতাংশের একটা ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। এই ভর্তুকির আড়াই শতাংশ ক্রেতা ও আড়াই শতাংশ বিক্রেতাকে দিতে হবে। একই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে ইন্টারনেটের ওপর সম্পূর্ণভাবে ভ্যাট মওকুফ করা প্রয়োজন।’ 

গ্রামীণফোনের চিফ ডিজিটাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি অফিসার সোলাইমান আলম বলেন, ‘একটি টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ই-কমার্সের জন্য ফান্ডামেন্টাল রিকয়ারমেন্ট। সর্বশেষ বিটিইআরসির তথ্য অনুযায়ী আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ১১.২৮ কোটি ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার ছিল। যার মধ্যে ১০.৩৪ কোটি মোবাইল ইন্টারনেটে সাবস্ক্রাইবার। মোবাইল কম্পানিগুলো যে ইন্টারনেট সার্ভিস দিচ্ছে তার ওপরই এ দেশের মানুষ তাদের অনলাইন ও বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর জন্য নির্ভর করে আছে। আমরা সরকার ও আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়তায় বেশ কিছু কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের টার্গেট ছিল, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের অপারেটরদের শতভাগ ফোরজির আওতাভুক্ত করব। সেটি আমরা করেছি। আমার মনে হয়, এখন শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি বেশি।’ 

ই-ক্যাবের সভাপতি শমী কায়সার বলেন, ‘আমরা ই-কমার্স সেক্টরের গ্রোথ দেখেছি মূলত করোনাকালে। ২০১৪ সাল থেকেই এই সেক্টরের গ্রোথ বাড়া শুরু হয়। তবে করোনার আগে গ্রোথ ছিল ২০-২৫ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালে এই সেক্টরের গ্রোথ হয়েছে ৭০-৮০ শতাংশ। এই গ্রোথ হওয়ার একটি প্রাথমিক কারণ হচ্ছে, আইসিটির ব্যাকবোন প্রস্তুত ছিল। ই-কমার্স পলিসি তৈরি ছিল, যা আবার পরিবর্তন করা হয়েছে ২০২০ সালে। সবচেয়ে বড় অর্জন যেটি হয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীদেরকে আমরা বিভিন্নভাবে নির্মূল করতে পেরেছি। আমরা যদি গত বছরের ডিজিটাল হার্ট দেখি, আমরা যদি আমচাষিদের কথা বলি, ই-কমার্সগুলোর মাধ্যমে মাত্র তিন সপ্তাহে এক লাখ ৫২ হাজার পরিবারে সরাসরি ফরমালিনমুক্ত আম পৌঁছাতে পেরেছি। ই-কমার্সে রুরাল ই-কমার্স একটি বড় জায়গা। আমরা এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি।’

এটুআইয়ের হেড অব ই-কমার্স রেজওয়ানুল হক জামি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করছে ই-কমার্স খাতকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্যই ২০১৮ সালে একটি ই-কমার্স পলিসি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে এই পলিসিটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। যদিও এটি এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। পলিসিটি আপডেট করার জন্য সব ধরনের কাজ করা হচ্ছে। ইদানীং টিসিবির পণ্যও কিন্তু ই-কমার্সের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে ই-কমার্সের সেবা গ্রামীণ পর্যায় পৌঁছানো জরুরি। কারণ গ্রামীণ পর্যায় এই সেবা পৌঁছানো না গেলে উন্নতি সম্ভব নয়।’ 

দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোস্তাহিদল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে দারাজের যাত্রা সাত বছর। বাংলাদেশে একেবারে ছোট পরিসরে শুরু করে এখন দেশের সর্বত্র পৌঁছাতে পেরেছি। দেশের ৬৪ জেলায়ই দারাজের নিজস্ব অপারেশন রয়েছে। যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব হ্যাবের মাধ্যমে হোম ডেলিভারি করে থাকি। দারাজ  ভালো সার্ভিস দিতে পারায় কাস্টমারদের ধরে রাখতে পারছে। এ ক্ষেত্রে দারাজ কাস্টমারদের আস্থা তৈরির মধ্য দিয়ে ভালো একটি জায়গা করে নিয়েছে। গত বছর করোনা পরিস্থিতির শুরুতে আমরা একটা ধাক্কা খাই। কারণ হঠাৎ করে একটি লকডাউন হয়ে যায়, এ সম্পর্কে আমরা প্রস্তুতও ছিলাম না। গত বছর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের গ্রাহক ব্যাপক বেড়েছে। করোনার আগে আমাদের মূলত সেলস হতো লাক্সারি আইটেমের জিনিসগুলো। করোনা আসার পর থেকে আমাদের বেসিক নিড আইটেমের জিনিসগুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা খুব রেসপন্স পাচ্ছি। আমাদের ডেলিভারি ব্যয় বা রাইডাররা সরকারের কাছ থেকে খুব সাপোর্ট পাচ্ছি, সেই কারণে আমাদের অপারেশনগুলো চালিয়ে যেতে পারছি।’

এসএসবি লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিয়ান আহমেদ বলেন, ‘বাইরের অনেক দেশ থেকে অর্ডার করছে; কিন্তু পেমেন্ট সিস্টেম সমস্যার কারণে তারা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে পেমেন্ট করতে পারছে না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট। আমাদের লজিস্টিকটি আরো স্মার্ট হতে হবে, কাস্টমার যখন অর্ডার করে চার্জ বেশি দেখায়। একদিকে অর্ডার করে পেমেন্ট করতে পারছে না, অন্যদিকে অর্ডার করলে চার্জ বেশি দেখাচ্ছে। এই জায়গাগুলোতে ফোকাস করলে আরো এগিয়ে যাওয়া যেত। আমাদের এখনো ডেলিভারির ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে বেশি সমস্যা হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, ৮-১০ দিনেও ডেলিভারি দিতে পারছে না।’

রিভানা অর্গানিকের প্রতিষ্ঠাতা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘যখন পাঁচ বছর আগে এই ব্যবসা করি। ছাগলের দুধ দিয়ে সাবান তৈরি করে দেশ ও দেশের বাইরে রপ্তানি করি। করোনার মধ্যে আমরা ভীত ছিলাম। এ ছাড়া আমাদের ব্যবসায় দারাজ সাহায্য করেছে। ই-কমার্সের কারণে দ্রুত ব্যবসা এগিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট ভালো করা দরকার। গতি ভালো করা দরকার। নতুবা ই-কমার্স ব্যবসা সামনে এগোবে না। এ ক্ষেত্রে যারা আছে তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে।’ 

প্লানেট টিস্যু পেপার অ্যান্ড ন্যাপকিনের প্রতিষ্ঠাতা রাহাদ হোসেন বলেন, ‘ব্যক্তিপর্যায়ে ওয়েবসাইট বানিয়ে এই রকম কার্যক্রম সামনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার জন্য সেটি কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। তাই পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দারাজ সাহায্য করছে। দারাজ চেষ্টা করছে সব সমস্যা সমাধানের, একটা দেশের মধ্যে না রেখে ব্যবসায়ীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রডাক্ট বাইরে রপ্তানি করতে চাইলে অনেক রকমের সমস্যা হয়। দারাজ এই কাজকে অনেকটা সহজ করেছে।’ 

কালের কণ্ঠের বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমী বলেন, ‘করোনার মাঝে আমরা দেখেছি ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি এই খাতকে আশাবাদী করে তুলেছে। আমরা দেখেছি যে ই-কমার্সের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দিয়েছেন। প্রথম ঢেউয়ে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে ই-কমার্স বড় ভূমিকা রেখেছিল। এখন দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রেও ই-কমার্সের দায়িত্বশীল একটি ভূমিকা আমরা দেখছি। ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষায়ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।’



সাতদিনের সেরা