kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

কালান্তরের কড়চা

এই ‘চ্যারিয়ট অব ফায়ার’ যেন থেমে না যায়

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী   

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:২৯ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



এই ‘চ্যারিয়ট অব ফায়ার’ যেন থেমে না যায়

বাংলাদেশে হেফাজতিদের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। মামুনুল হককে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁর ‘পূত চরিত্রের’ আরো নানা কাহিনি বেরিয়ে আসছে। আর এই ধরপাকড়ে আরো একটি ব্যাপার স্পষ্ট হয়েছে যে হেফাজতিদের ধরা হলে দেশে আগুন জ্বলবে বলে যে মিথ তৈরি করা হয়েছিল, সেই মিথ মিথ্যা। এই মিথ তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগেরই ডান প্রতিক্রিয়াশীল একটা অংশ। এখন প্রমাণিত হলো তাদের প্রোপাগান্ডা ছিল মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।

এই উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে মিথ্যা ভয় দেখানো এবং ভয় দেখিয়ে হেফাজতিরা বনের বাঘ, তাদের ধরলে দেশের ‘মুমিন মুসলমানরা’ সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাবে—এই মিথ তৈরি করে রাজনীতিতে ধর্মব্যবসায়ীদের অশুভ-আধিপত্য বজায় রাখা। সরকার যখন হেফাজতিদের ধরার সাহস দেখিয়েছে, তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে আশ্রয়গ্রহণকারী এই বর্ণচোরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত দরকার। তাতে দেশের রাজনীতি পরিচ্ছন্ন হবে এবং আওয়ামী লীগের কাঁধ থেকেও সিন্দাবাদের দৈত্য তাড়ানো হবে।

হেফাজতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান যেন শিথিল করা না হয়, এটা সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন। এই অভিযানে দেশের গণতন্ত্র আদৌ ক্ষুণ্ন হবে না; বরং গণতন্ত্র অপদেবতার দখল থেকে মুক্ত হয়ে আরো শক্তিশালী হবে। এই অভিযানে দেশের ‘মুমিন মুসলমানদেরও’ সরকারবিরোধী হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ সরকারের এই অভিযান ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। ইসলামের নাম ভাঙিয়ে যাঁরা লাভজনক ব্যবসা শুরু করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে। এটা জনগণ জেনে গেছে। তাই ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতিদের সন্ত্রাস দমনে সরকার কঠোর হওয়া সত্ত্বেও জনগণ সরকারের ওপর বিরাগ হয়নি, বরং সরকারকে সমর্থন দিয়েছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং তাদের তথাকথিত ‘মুমিন মুসলমান অংশও’ এখন রাজনীতিসচেতন। তারা জানে, হেফাজতে ইসলাম কোনো নতুন রাজনৈতিক দল নয়, বরং সন্ত্রাসী ও দেশদ্রোহী জামায়াতে ইসলামীরই একটি সম্প্রসারিত অংশ মাত্র। জামায়াত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরই আকস্মিকভাবে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি মাদরাসা থেকে ধূমকেতুর মতো হেফাজতের আবির্ভাব।

আমার সহৃদয় পাঠক, আপনারা একবার হেফাজতের আকস্মিক উত্থান এবং রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণের সময়টা বিবেচনা করে দেখুন। তাহলেই থলের বিড়ালের আসল পরিচয় বুঝতে পারবেন। তখন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ট্রাইব্যুনালের বিচারে দণ্ডিত হয়েছে এবং তাদের দণ্ডদানের কাজটি শুরু হতে যাচ্ছে। জামায়াতি ঘাতক ও দালাল কাদের মোল্লাকে আদালত ফাঁসির হুকুম না দেওয়ায় জনগণ বিচলিত ও ক্রুদ্ধ। শাহবাগ চত্বরে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়ে কাদের মোল্লাসহ সব অপরাধীর ফাঁসির দাবি জানাচ্ছে। আদালত তাদের দাবি মেনে কাদের মোল্লাকে পুনর্বিচারে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।

এই শাহবাগ আন্দোলনকে মোকাবেলা করার মতো শক্তি বিএনপি ও জামায়াতের ছিল না। তাদের পেছনে সামান্য জনসমর্থনও ছিল না। কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়ে যায়। শাহবাগ চত্বরের বিশাল জনসমাবেশও শেষ হয়। ঠিক এই সময় হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হেফাজতে ইসলাম সরকারকে ১৩টি রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে চরমপত্র দেয়। হেফাজতকে বলা হতো অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এবার তার রাজনৈতিক চেহারাটা প্রকাশ করা হলো। এই চেহারার অন্তরালে যে আসল চেহারা সেটা জামায়াতিদের। সেটা প্রকাশ পেল শাপলা চত্বরে জমায়েত হয়ে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে। এই সন্ত্রাসে পবিত্র কোরআনসহ কোরআনের দোকানগুলোও ভস্মীভূত হয়।

জামায়াতের দোসর বিএনপি সঙ্গে সঙ্গে শাপলা চত্বরের হেফাজতিদের সমর্থন জানায় এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সরকারকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হবে বলেও তিনি হুমকি দেন। তখন হেফাজত যে আসলে জামায়াতেরই অপর পিঠ, তা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। হেফাজতের ১৩ দফা দাবি যে ছিল জামায়াতেরই দাবি, তা জামায়াতের ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ইশতেহারটির সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলেই বোঝা যায়। জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গণহত্যার দোসর দল হিসেবে ধিক্কৃত দল। জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। এ জন্যই হেফাজতের মুখোশ পরে তাদের সরকারবিরোধী রাজনীতিতে ঢোকার চেষ্টা।

হেফাজত যে নাম বদল করা জামায়াত, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জামায়াত পবিত্র ইসলামের অনুসারী নয় এবং হেফাজতও তাই। ইসলামকে শুদ্ধিকরণের নামে তার বিকৃতি সাধন করে সৌদি আরবে যে ওয়াহাবিজমের আবির্ভাব, তারই কট্টর অনুসারী জামায়াত। ফলে হেফাজতও তাই। এই ওয়াহাবিজম এখন দেশে দেশে সন্ত্রাসী ফ্যাসিবাদী চেহারায় আবির্ভূত হয়ে ইসলামের সুনাম নষ্ট করছে। ইরাকে ও সিরিয়ায় জিহাদিস্ট সেজে দেশ দুটিতে হত্যা ও নির্যাতনের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। আফগানিস্তানে তালেবান সেজে দেশটাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশে এই জিহাদিস্টরা অনুপ্রবেশ করেছিল। নির্মম হত্যা ও সন্ত্রাসও শুরু করেছিল। গুলশানের হলি আর্টিজানে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ। শেখ হাসিনা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে এই সন্ত্রাস দমন করেছেন। আমাদের র‌্যাব ও পুলিশকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাতে হয়। খুবই সাহসের সঙ্গে তারা জিহাদিস্টদের দমন করেছে। এই জিহাদিস্টদের দমনে সরকার যখন কঠোর হতে দ্বিধা করেনি, তখন তাদের দেশি অনুচরদের দমনে এত দিন তারা কেন কুণ্ঠা ও দুর্বলতা দেখাল—এটাই এখানে প্রশ্ন।

হেফাজতিরা যে আসলে জামায়াতি ও জিহাদিস্টদের সমর্থক ও অনুসারী তার প্রমাণের কি দেশে অভাব আছে? হলি আর্টিজানে হামলার ওপর একটি ছবি তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্র পরিচালক। ছবিটি একটি সেরা ছবি হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। তবু চিত্র পরিচালক নিজের দেশে ছবিটি মুক্তি দিতে ভয় পাচ্ছেন। তাঁকে ভয় দেখাচ্ছে উগ্র মৌলবাদীরা। প্রাণনাশের ভয়। সরকারও ছবিটিকে ছাড়পত্র দিচ্ছে না সম্ভবত হেফাজতিদের ভয়ে। হেফাজতিদের ভয়ে দেশে জাতির পিতার ভাস্কর্য তৈরি পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। আমাদের সুধীসমাজ দেশে বাকস্বাধীনতা, কথা বলার অধিকার নেই বলে চেঁচাচ্ছে। সরকারকে দোষারোপ করছে। কিন্তু সমস্যাটির আসল কারণ তলিয়ে দেখছে না। জামায়াতিরা হেফাজতিদের ছদ্মবেশে দেশের শহরে-বন্দরে-গ্রামেগঞ্জে কথা বললেই ধর্মের অবমাননা হয়েছে বলে বক্তাদের গলা কাটার যে হুমকি দেয়, তাতে মানুষ কোনো কিছুতেই স্বাধীনভাবে কথা বলতে ও লিখতে ভয় পায়। দেশে যেন এক ভয়ের রাজত্ব তৈরি হয়েছে। এটা সরকার করেনি। করেছে উগ্র মৌলবাদীরা। যারা ইসলাম নয়, ওয়াহাবিজমের অনুসারী।

ফ্যাসিজমের প্রথম কথাই হলো, ভয় দেখিয়ে শাসন করো (rule by fears)। পাকিস্তানে জামায়াতিরা এই ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে সেই জামায়াতিরাই হেফাজতের ছদ্মবেশে একই ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলামে ভাস্কর্যবিরোধী বিধান নেই। পূজার জন্য দেব-দেবীর মূর্তি বানানোর বিরুদ্ধে বিধান আছে। তবু হেফাজতের মামুনুল হক এই ভাস্কর্য ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা দেশে না রাখার আবেদন জানান। তিনি অবশ্যই সরকারের কাছে তাঁর আবেদনটি জানাতে পারবেন। সে অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু তিনি কী করলেন? চোখ লাল করে বললেন, তিনি সব ভাস্কর্য ভেঙে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবেন। তাঁর হুংকারের সঙ্গে সঙ্গে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা হলো।

নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সবারই আছে। কিন্তু হেফাজতিরা কী করল? প্রতিবাদের নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে নিরীহ হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালাল। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিল। ধ্বংস হলো ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জাদুঘরের দুর্লভ সামগ্রী। এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রতিবাদ নয়। এটা দাঙ্গা। সন্ত্রাস সৃষ্টি। সংখ্যালঘু নির্যাতন। এই সন্ত্রাসীদের কঠোর হাতে দমন করা উচিত। হেফাজতি বলে এদের দয়া দেখানো উচিত নয়।

সরকার শেষ পর্যন্ত হেফাজতি ফ্যাসিস্টদের শক্ত হাতে দমনের জন্য সক্রিয় হয়েছে। দেশের রাজনীতি থেকে এদের সমূলে উত্খাত করা ছাড়া দেশে ভয়ের রাজনীতি উচ্ছেদ করা যাবে না। মানুষের কথা বলার ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ন্যূনতম অধিকার রক্ষা করা যাবে না। ভাস্কর্যসহ দেশের সব নান্দনিক সৌন্দর্য এরা ধ্বংস করতে চায়। শেখ হাসিনা দেশে নারীর ক্ষমতায়ন চান, আর এরা সর্বপ্রকার নারী স্বাধীনতার, এমনকি নারী শিক্ষার বিরোধী। এরা এমনই একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কারে অন্ধ গোষ্ঠী, যারা দেশের কোনো প্রকার আধুনিকতা ও অগ্রগতির বিরোধী। লন্ডন শহর এখন আফগান উদ্বাস্তু নর-নারীতে ভর্তি। যে পুরুষটি আফগানিস্তানে কলেজ শিক্ষক ছিলেন, তিনি লন্ডনে এসে ট্যাক্সি ড্রাইভার। এক আফগান তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হলো, তিনি একজন অভিজ্ঞ গাইনি, লন্ডনে এসে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। তালেবান তাঁকে হাসপাতালে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিল। বোরকা পরতে বাধ্য করেছিল। এক আফগান যুবক, গ্র্যাজুয়েট। তালেবানের নির্দেশে সে দাড়ি রেখেছিল। তারপর তাকে হেরোইন পাচারে বাধ্য করেছিল। তখন সে জার্মানি হয়ে লন্ডনে পালিয়ে আসে। এ রকম অনেক কাহিনি। শুনতে শুনতে মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে যদি একদিন হেফাজতি রাষ্ট্র হয়ে যায়, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে।

হাসিনা সরকার শেষ পর্যন্ত হেফাজতি তথা জামায়াতিদের তোষণের ভ্রান্তি বুঝতে পেরেছে, এটা আশার কথা। হেফাজতিদের বিরুদ্ধে সরকারের এই ক্র্যাকডাউন উদ্দেশ্য সফল না হওয়া পর্যন্ত যেন অব্যাহত থাকে। কয়েকজন নেতাকর্মীকে ধরলেই হেফাজত উচ্ছেদ হবে তা নয়, হেফাজতকে রাজনৈতিকভাবেও মোকাবেলা করতে হবে। হেফাজত তথা জামায়াত নামক বিষবৃক্ষের শিকড় আমাদের সমাজজীবনের একেবারে তলানি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। একে শিকড়সহ উচ্ছেদ করা ছাড়া জাতি ও সমাজকে রক্ষা করা যাবে না। সরকার আরো কঠোর হলে, তাতে গণতন্ত্র ক্ষুণ্ন হবে না। বরং দেশে গণতন্ত্র বিপদমুক্ত হবে।

লেখা শেষ করে এনেছি, এমন সময় খবর পেলাম, বাবুনগরী হেফাজতের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। বুঝতে বাকি থাকে না তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করতে চাইছিলেন। কমিটি এমনিতেই লুপ্ত হতো। বাবুনগরী সেই কমিটির বিলুপ্তি ঘোষণা করে নিজের মান বাঁচালেন। কিন্তু হেফাজতি তথা জামায়াতিদের দমনের জন্য সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হাত যদি আরো প্রসারিত হতে থাকে, তাহলে তিনি নিজেও বাঁচবেন কি? সরকারের এই কঠোর হস্ত আরো প্রসারিত হোক, এটাই আমাদের কামনা।

লন্ডন, সোমবার, ২৬ এপ্রিল ২০২১



সাতদিনের সেরা