kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

‘রাইতের খাবারডা জুটলেই অইল’

ফাতিমা তুজ জোহরা    

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৩০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘রাইতের খাবারডা জুটলেই অইল’

রাজধানীর আলিশান এলাকাগুলোর অন্যতম গুলশান। ঝকঝকে টাইলস আর সোনালি আলো ঝলমল করা বড় বড় হোটেল, ভবন, অফিস। বৈভব আর প্রাচুর্যের প্রকাশ চারদিকে। করোনা লকডাউনের স্থবিরতায় রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম। সুনসান সড়কের ফুটপাত ধরে চলাচল করা মানুষের সংখ্যাও বলতে গেলে হাতে গোনা। এমনই বাস্তবতায় দুপুরের তপ্ত রোদে এক কোণে বসে আছেন নাজমা বেগম। জরাজীর্ণ পোশাক আর হুইলচেয়ারে প্রতিবন্ধী ছেলেকে বসিয়ে চেয়ে আছেন পথের দিকে।

‘প্রতিবন্ধী পোলাডারে কেউ দেখতে চায় না। এরে রাইখা কই যামু? বাড়িত হের বাপ অসুস্থ অইয়া পইড়া আছে। করোনায় সব বন্ধ। এক-দুই শ ট্যাহা অইলিও কম কী? এক দিনের খাওনের ব্যবস্থা তো অইব! আর এহন তো রোজা। কোনো রহমে রাইতের (রাতের) খাবারডা জুটলেই অইল। আর প্রতিবন্ধী পোলারে তো রোজা রাহান যায় না। হের খিদা লাগলে খাওন তো দিতে অইব।’

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই নির্বিকার কণ্ঠে নিজের কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন নাজমা বেগম। রাজধানীর কালাচাঁদপুরে স্বামী, বয়স্ক মা আর প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে থাকেন। ছোট টিনশেডের একটি ঘর ভাড়া নিয়েছেন তিন হাজার টাকায়।

নাজমা বলেন, ‘আমার আরো দুইডা সন্তান আছে। দেশে পাঠাইয়া দিছি। এতগুলা মুখ, খাওয়ামু কী? দ্যাশের বাড়ি ময়মনসিংহ। বছর দেড়েক আগে ঢাকা আইছি কাজকামের আশায়। করোনায় সব বন্ধ অইয়া গেল। কাম নাই। স্বামী অসুস্থ, পোলাডা প্রতিবন্ধী। কই যামু! তাই এই রাস্তায় আইয়া বইয়া থাহি। কারো কাছে কিছু চাই না। কেউ মন চাইলে দেয়।’

করোনায় পথে বসা নাজমা প্রতিদিন দুপুরের আগে আগে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বের হন। সঙ্গে ছোট একটি প্যাকেটে ছেলের জন্য ডাল-ভাত নিয়ে আসেন। বিকেল পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করেন। ইফতারের আগেই বাসায় ফিরে যান। চিড়া কিংবা মুড়ি দিয়ে কোনো রকমে ইফতার পর্বটা সেরে নেন। চিন্তা রাতের খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে। সংসারে এতগুলো মুখ চেয়ে থাকে তাঁর দিকে। তাইতো তাঁর প্রতিদিনের চেষ্টা থাকে—রাতে অন্তত প্রিয় মানুষগুলোর পেটটা যেন খালি না থাকে।

নাজমা জানালেন, প্রতিবন্ধী বড় ছেলের নাম রেখেছেন হৃদয়। মাঝেমধ্যে মাকে ডাকেও সে। মানুষ দেখলে হাসে, যেন কথা বলতে চায়। তিনি বলেন, ‘পোলায় একা খাইতেও পারে না, বইতেও পারে না। সব কিছুই আমার কইরা দিতে অয়। আগে মা দেখত হৃদয়রে। মা এহন চোখে দেহে না। বাড়িত ভাইয়ের বউ আছে, কিন্তু প্রতিবন্ধী বইলা আমার পোলাডারে কেউ দেখতে পারে না। বাথরুম করাইতে অয়। মা ছাড়া কেডা করাব? মা ছাড়া অরে দেহার কেউ নাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে নাজমা জানালেন, করোনার এই সময়ে মানবিক সাহায্য-সহায়তা হিসেবে আশপাশের মানুষের কাছ থেকে চাল-ডাল পেয়েছেন। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি।



সাতদিনের সেরা