kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

‘সুবিধা’ বুঝে রং পাল্টায় হেফাজত

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সুবিধা’ বুঝে রং পাল্টায় হেফাজত

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। যাত্রা শুরু করেছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে। কাগজে-কলমে অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন। তবে সংগঠনটির জন্ম থেকে অদ্যাবধি তাদের কর্মকাণ্ড ধর্মীয় চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রং পাল্টিয়েছে বাববার। অভিযোগ রয়েছে, রাজনীতির মাঠে যখন যেদিকে সুবিধা পেয়েছেন তাদের পক্ষেই কাজ করেন সংগঠনটির নেতারা। হেফাজত কখনো কখনো ব্যবহার হয়েছে অন্যের ঘুঁটি হিসেবেও। ফলে ইসলামের রীতিনীতি প্রচার ও প্রসারে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে যে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে দাবি করা হয় তা এখন দ্বিধাবিভক্ত ও বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। তবে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, হেফাজত এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করছে না।

এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ যেদিক থেকে বৃষ্টি আসে সেদিকে ছাতা ঘুরিয়ে ধরে। ঠিক তেমনি হেফাজত যেদিকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা দেখে সেদিকে ঝুঁকে পড়ে। কখনো সরকারের কাছে সুবিধা নিয়ে তাদের পক্ষে থাকে আবার কখনো সরকারবিরোধীদের কাছে সুবিধা পেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নামে।

হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসায় হেফাজতে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। মাদরাসাটির মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফীকে সংগঠনটির আমির করা হয়। সে সময় নারী নীতির বিরোধিতা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পরিবর্তন না করা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন হেফাজতের নেতারা। তাঁরা একই সঙ্গে কওমি মাদরাসাগুলোর সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যও সরকারের কাছে দাবি জানাতে শুরু করেন।

২০১৩ সালে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ তৈরি হলে এর বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপকভাবে মাঠে নেমে সারা দেশে আলোড়ন তোলে হেফাজত। ওই বছরের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে লাখো মানুষের জমায়েত করে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানায়। ওই আন্দোলনের মঞ্চে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারাও যোগ দেন। তবে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের হটিয়ে দেয়। ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডবের অভিযোগে সংগঠনটির বহু নেতাকর্মীর নামে মামলা হয়। সে সময় হেফাজতের নেতাকর্মীরা কিছুটা বেকায়দায় পড়েন।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, শাপলা চত্বরের ঘটনার পর হেফাজতকে বাগে আনার উদ্যোগ নেয় সরকার। চট্টগ্রামে বাড়ি আওয়ামী লীগের এমন একজন কেন্দ্রীয় নেতা ও একজন সরকারী কর্মকর্তা হেফাজতের নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেন। সে সময় হেফাজতের আমিরের হাটহাজারী মাদরাসাকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের রেলের তিন একর জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর মধ্য দিয়ে সরকার ও হেফাজত সমঝোতা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে হেফাজতের সমাবেশে আহমদ শফী বলেন, ‘হাসিনা সরকার, আওয়ামী লীগ বলেন আর ছাত্রলীগ বলেন, সবাই আমাদের বন্ধু। এদের সঙ্গে কোনো আদাওয়াত (শত্রুতা) নাই।’ এর পর থেকে আহমদ শফী আর সরকারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কথা বলেননি।

সূত্র মতে, রেলের জমি দেওয়ার পর হেফাজতের দাবি অনুসারে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার কাজ শুরু করে সরকার। এটি কওমি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহু বছরের দাবি ছিল। সম্প্রতি সমালোচিত হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বাবা আজিজুল হক বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে কওমির স্বীকৃতির জন্য রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে টানা অনশন করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিনের ওই দাবিটি মেনে নিয়ে কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি দেয়। ফলে ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সরকার ও হেফাজতে ইসলামের মধ্যে সম্পর্কের তেমন কোনো অবনতি হয়নি। সংগঠনটির আমির আহমদ শফীও গত বছর মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে আর মাঠে নামেনি হেফাজত।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, গেল কয়েক বছরে হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নানাভাবে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছে সরকার। এরপর সব কিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে আল্লামা শফীর শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হওয়ায় জুনাইদ বাবুনগরী ও তাঁর অনুসারীরা সংগঠনটির দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। হেফাজতের ভেতরে থাকা ২০ দলীয় জোটের নেতারা বাবুনগরীকে সমর্থন দেন। এমন পরিস্থিতিতে গত বছর শফী মারা যান। তাঁকে বাবুনগরীপন্থীরা হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরই মধ্যে গত বছরের নভেম্বরে হেফাজতের নতুন কমিটি গঠিত হয়। জুনাইদ বাবুনগরী সংগঠনটির আমির হন। আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী ও তাঁর সমর্থকদের সবাইকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর পরই মূলত হেফাজত তীব্র সরকারবিরোধী ভূমিকায় মাঠে নামে।

জানা যায়, জুনাইদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের ১৫১ সদস্যের কমিটিতে বেশির ভাগই ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরীক ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতা। তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থীও ছিলেন। ফলে তাঁরা হেফাজতকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁরা বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা ও ভাস্কর্য ভাঙচুর, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর বাতিলের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেন। এসব রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সেগুলোতে সহিংসতার ফলে সংগঠনটির মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত রবিবার রাতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে ভোরে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করা হয়।

হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের কমিটিতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তারা আলেম-উলামাদের সরকার ও সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটা আল্লামা শফীর আদর্শচ্যুতি এবং তাঁর সঙ্গে গাদ্দারি। হেফাজতের বর্তমান কমিটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র মেনে হয়নি। এটি করা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য।’

হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলেন, ‘আমাদের যাত্রার শুরুতেও কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না, এখনো নেই। ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আল্লাহ ও রসুলকে নিয়ে যেভাবে কটূক্তি চলছিল তখন ঈমানি দায়িত্ব রক্ষায় প্রথম আমরা মাঠে নামি। ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম হলেও বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত—এমন অনেকেই হেফাজতের কমিটিতে ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় পরের কমিটিতেও দলের নেতারা যুক্ত হন। তবে এখন যে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হয়েছে সেখানে তো রাজনৈতিক দলের কাউকে দেখছি না।’



সাতদিনের সেরা