kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

সরকার ‘সংকট’ সৃষ্টি করে ফায়দা নিচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০২:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকার ‘সংকট’ সৃষ্টি করে ফায়দা নিচ্ছে

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিয়ে সংকট সৃষ্টি করে সরকার ফায়দা নিচ্ছে বলে মনে করেন বিরোধী দলের নেতারা। ‘দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে’ যা হয়, তা-ই হয়েছে এমন মন্তব্য করে তাঁরা বলেছেন, এখন অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

গতকাল সোমবার বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে আমন্ত্রিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচি থেকে তাণ্ডব চালায় কওমি মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সহিংসতার সময় পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৭ জন নিহত হয়। এর পরই সরকার হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। হেফাজতের বেশ কয়েকজন নেতাসহ চার শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হেফাজত সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে এরই মধ্যে এক প্রকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

হেফাজতের পক্ষ নেবে না বিএনপি :  হেফাজতের সঙ্গে সরকারের বিরোধ এবং সংগঠনটির নেতাদের ব্যাপক হারে ধরপাকড়ের এই সময়ে হেফাজতের প্রতি বিএনপির এক ধরনের সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে সরাসরি পক্ষ নেবে না দলটি। তবে কৌশল গ্রহণ করে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা অব্যাহত রাখবে। মামুনুল হকসহ হেফাজতের কয়েকজন নেতার কর্মকাণ্ডও বিএনপি সমর্থন করছে না বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে পুলিশ বলেছে, ২০১৩ সালের মতো এবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করেছে হেফাজত।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাম্প্রতিককালে হেফাজতকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। থাকার প্রশ্নই ওঠে না।’ তিনি বলেন, ‘তবে গণহারে দেশের আলেম-উলামাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আমরা নিন্দা জানাই। এর আগে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, এটারও আমরা নিন্দা জানিয়েছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বিএনপি কৌশলগত কারণে এখন যোগাযোগ রাখছে না। তবে ভেতরে ভেতরে দলটি হেফাজতের ব্যাপারে কিছুটা সহানুভূতিশীল। আবার সরকারের সঙ্গে হেফাজতের বিরোধেও বিএনপি খুশি। কারণ বিএনপি মনে করে, সরকার যতভাবেই সুবিধা দিক বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুক, হেফাজত কখনোই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে না। এমনকি নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও ওপরের কাঠামোর কিছু নেতা ছাড়া মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সরকারের বিরুদ্ধেই থাকবেন। বিশেষ কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলেই তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামবেন বলে বিএনপি বিশ্বাস করে। হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সরকারের সঙ্গে বিরোধে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের সেই ক্ষোভ আরো বাড়বে বলে মনে করে বিএনপি।

গতকাল দুপুরে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা হেফাজতের কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা পুরো বিষয়টাকে মনে করি যে এটা সরকারের সৃষ্টি করা। হেফাজত নিয়ে পুরো ক্রাইসিসটা তৈরি করেছে সরকার, এই ক্রাইসিসটা তৈরি করে তারা ফায়দা নিচ্ছে; যার ফলে আমরা দেখছি, লকডাউনে যেটা করেছে...এর আগেও আমরা বলেছিলাম, ইটস এ ক্র্যাকডাউন অন দি অপজিশন। আপনারা দেখেছেন, আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়েছে, যেখানে বিএনপি কোনোমতেই এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত নয়।’

২৬ মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররমের জাতীয় মসজিদের সামনে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামের নাশকতার ঘটনার প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘আমরা প্রতিবাদ করেছি, সেই প্রতিবাদটা মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে এবং যেটা আমাদের ফান্ডামেন্টাল রাইটস। আজকে মিথ্যাচার করা হচ্ছে, অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহ্মুদ সাহেব অবলীলায় কল্পকাহিনি প্রচার করছেন। বিএনপি কোনোমতেই ওই সব কর্মকাণ্ডে জড়িত না।’

আ. লীগকে দায়ী করল জাপা : বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি কোনো সময়েই কোনো ভায়োলেন্সকে সমর্থন করে না। সে হিসাবে হেফাজতের নাশকতাকেও সমর্থন করার কারণ নেই। একটি কথা স্পষ্ট, আওয়ামী লীগই হেফাজতকে প্রশ্রয় দিয়ে এ পর্যন্ত এনেছে। এর জন্য তারাই দায়ী। লালন-পালন করলে তো মাথায় উঠবেই। এ জন্য অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।’

সরকার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে : ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার ও মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কারণে সংকট চরম আকার ধারণ করছে বলে মনে করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার আন্দোলন শুরু করে। তখন সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজেয়াপ্ত এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবি জানায়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে হেফাজতের মতো সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। ফলে তারা লালনের ভাস্কর্য, হাইকোর্টের ভাস্কর্য, এমনকি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে। দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে যা হয়, তা-ই হয়েছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, সরকার হেফাজতের মাধ্যমে রাজনৈতিক অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সর্বনাশ ডেকে আনা হয়েছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, হেফাজতের মতো অপশক্তিকে সরকার আশকারা ও মদদ দিয়ে মাথায় তোলার আত্মঘাতী পথ অনুসরণ করছে। তাদের আদর্শিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার বদলে দমন-পীড়ন চালিয়ে সরকার প্রকারান্তরে তাদের তৎপরতাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ইন্ধন জোগাচ্ছে।



সাতদিনের সেরা