kalerkantho

রবিবার । ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৩ জুন ২০২১। ১ জিলকদ ১৪৪২

করোনাযুদ্ধের প্রধান অস্ত্র সক্রিয় ও দৃশ্যমান সচেতনতা

রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী   

২৬ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনাযুদ্ধের প্রধান অস্ত্র সক্রিয় ও দৃশ্যমান সচেতনতা

অতিমারি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধের প্রধান ও সহজলভ্য অস্ত্র সক্রিয় ও দৃশ্যমান সচেতনতা। তবে হতদরিদ্র ও দিনমজুরদের জন্য তা কোনোমতেই সহজলভ্য নয়, সে কথা অবশ্যই মানতে হবে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের অবশ্যই বড় দায়িত্ব-কর্তব্য আছে, যা সংশ্লিষ্ট সব মহলের ন্যায্যতা ও সততার সঙ্গে পালন করতে হবে, যেন দল-মত-নির্বিশেষে জীবন বাঁচানোর জন্য সরকারের তরফ থেকে দেওয়া যেকোনো দান-সহায়তা থেকে উদ্দিষ্ট হতদরিদ্র মানুষ বঞ্চিত না হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুষ্টিকর ও সুষম খাবারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে। তার সামর্থ্য থাকতে হবে যে! দরিদ্র মানুষের সুরক্ষাকল্পে গৃহীত সরকারের সব পদক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশের অনেক মানবহিতৈষী ব্যক্তিদের সাহায্যের কোনো বিকল্প নেই।

সরকার ও অন্যান্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের প্রচারিত সব বিধি-নিষেধ পালন করা ও অন্যদের পালন করতে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করা সবারই পবিত্র একটা কাজ। ঘরের বাইরে সব সময় নাক ও মুখ ঢাকার জন্য মাস্ক সঠিকভাবে ও নিয়মে ব্যবহার করা, অন্য মানুষের কাছ থেকে তিন ফুট দূরত্বে থাকা, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা ও ২০ মিনিট বাদে বাদে হাত ধোয়ার কাজ, হাঁচি-কাশির সময় রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা, যেখানে-সেখানে ও যখন-তখন কফ বা থুথু না ফেলা ইত্যাদি বিষয় আমাদের জীবন ও আচরণে এখন অতি আবশ্যিক হয়ে থাকতে হবে। নিষ্ক্রিয় সচেতনতা বা উৎকণ্ঠার কী মূল্য আছে? তাই পারতপক্ষে চাই সচেতন ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষেরই সক্রিয় ও দৃশ্যমান সচেতনতা। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের আক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মুখোমুখি আমরা।

এ পর্যন্ত করোনার ছোবলে বাংলাদেশসহ দুই শতাধিক দেশ কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ব্রাজিল, ভারত, বাংলাদেশসহ অন্য অনেক দেশে করোনা দ্বারা আক্রান্ত এবং তার কারণে মৃত মানুষের সংখ্যা অতীতের রেকর্ড বারবার ছাড়িয়ে যায়। নীরব ঘাতক এই যমদূতের হাত থেকে মানুষ কবে মুক্তি পাবে তা আমরা কেউ জানি না। জাতি-ধর্মবিশ্বাস-নির্বিশেষে গত বছরের প্রথম থেকেই সব মানুষেরই একটা প্রার্থনা ছিল বিধাতা যেন এ মারির কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করেন এবং বিশেষজ্ঞরা এ রোগের কোনো প্রতিষেধক বা প্রতিরোধক ওষুধ তৈরি করতে পারেন। ধন্যবাদ ও বাহবার বিষয় যে বিভিন্ন দেশে নামিদামি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে অনেক গবেষণার ফলে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করে পৃথিবীকে অনেক উপহার দিয়েছে। এখন আমরা এর প্রতিষেধক টিকা পাচ্ছি এবং অনেকেই তা গ্রহণ করছি। তবে আরো অনেক গবেষণা দরকার হবে আশানুরূপ কার্যকারিতার জন্য। বড় একটি কারণ এই যে জানা গেছে, করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯-এর আচরণ ও প্রকৃতি বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। এখন পর্যন্ত হয়তো বলা যায় যে এ কীটস্যকীটের বহুরূপী অবস্থাহেতু তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কম করতে হবে না। মানুষের ব্যক্তিসত্তার সব দিককেই—দেহ, মন-প্রাণ ও আত্মার সব কিছুকেই সে নাড়া দিয়েছে। জীবন-জীবিকা, অর্থ-বাণিজ্য, রাজনীতি, শিক্ষা, মনস্তত্ত্ব, মানবিক ও সামাজিক সব সম্পর্কের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব রেখে চলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে শিশু ও গোটা নতুন প্রজন্মের ওপরে, যারা মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। কী এক অনিশ্চিত ও দুর্বিষহ পরিবেশও একটা ‘কালচার’—এর মধ্য দিয়েই না তাদের জন্ম, লালন-পালন ও বেড়ে উঠতে তাদের বাধ্য হতে হচ্ছে! বিশ্বের কোটি কোটি মাসুম শিশুর চিন্তা-ভাবনা ও মনোজগৎ যেভাবে গড়ে উঠছে তা বোধ করি আমাদের সবার কাছে এখন সবচেয়ে বড় এক উৎকণ্ঠার বিষয়।

মানুষ বেঁচে থাকে আশা, আত্মবিশ্বাস ও প্রেমের শক্তিতে। যুগে যুগে মানুষ অনেক অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মারি-মহামারি এবং মানবঘটিত সংঘাত ও ধ্বংসের তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে যে ‘বিউবোনিক প্লেগ’ (যাকে ব্ল্যাক ডেথও বলা হয়েছে) হয়েছিল তার ফলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা গেছে। কোথাও কোথাও অবস্থা এমনই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে কোনো কোনো চার্চের যাজককে দিনে ৪০-৫০ জন মৃত ব্যক্তির জানাজা পরিচালনা করতে হয়েছে কোনো কোনো দিন। আজ করোনার যে দুর্যোগ বা মারি চলছে তা একদিন শেষ হবে। তার জন্য আমাদের সজাগ-সচেতন প্রত্যেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবচেয়ে বড় একটি বিষয় হলো, সব কিছুতে আমাদের সংযমী হতে হবে। আমাদের প্রার্থনার পাশাপাশি কাজও করতে হবে, জীবনাচরণকেও প্রয়োজনানুসারে বদলাতে হবে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের স্বৈরাচারী রাজা প্রথম চার্লস ও তাঁর সমর্থকদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টারি দলের যে প্রচণ্ড গৃহযুদ্ধ হয়েছিল তখন সে পার্লামেন্টারি দলের নেতৃত্বে ছিলেন অলিভার ক্রোমওয়েল। ভয়াবহ যুদ্ধে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছে। মানুষের বাঁচার জন্য ন্যায্য অধিকারের জন্য যুদ্ধে জয় কামনা করে অনেক ‘প্রার্থনা করো, আর দেখো যেন বারুদ শুকনো থাকে।’ করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের চেতনা হয় সক্রিয় ও দৃশ্যমান। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বর্তমান সর্বাত্মক ‘লকডাউন’ সত্যিই যদি সর্বত্র পালিত হয় তার ফল অনেক ভালো হবে।

মনে রাখা দরকার, করোনার আক্রমণ সর্বজনীন, তার কোনো বাছবিচার নেই। তাই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধও হবে সর্বজনীন। যেসব বিধি-নিষেধ আছে তার সবই পালন জরুরি। শিথিলতাও ছোঁয়াচে! আমাকে বিধি-নিষেধ পালন করতে হবে। কারণ আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য শুধু নয়। তার মাধ্যমে আমি অন্যকেও নিরাপদ রাখতে পারি। সবাই যদি এভাবে চিন্তা করে ও চলে, তাহলে তার সুফল কতই না সুদূরপ্রসারী হয়!

লেখক : খ্রিস্টীয় ঈষতত্ত্বের শিক্ষক ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ



সাতদিনের সেরা